ঝুঁকি নিয়ে কর্মরত কর্মীদের তালিকা হচ্ছে

ঝুঁকি নিয়ে কর্মরত কর্মীদের তালিকা হচ্ছে

সুজিত সাহা : দেশে নভেল করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি চলছে। রেলপথে যাত্রী পরিবহন বন্ধ থাকলেও খাদ্যপণ্য, আমদানি-রফতানির কনটেইনার ও জ্বালানি পরিবহনের স্বার্থে খোলা রয়েছে অপারেশনাল সব ধরনের কার্যক্রম। যানবাহন সুবিধা না থাকায় ঝুঁকি নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে কর্মস্থলে যেতে হচ্ছে এসব বিভাগের কর্মীদের। দেশের দুর্যোগপূর্ণ এ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি নিয়ে কর্মরত রেলকর্মীদের প্রণোদনা ও ঝুঁকি ভাতা প্রদানে তালিকা তৈরি করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে রেলের দুই অঞ্চলের সব বিভাগ থেকে তালিকা নিয়ে শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে রেল কর্তৃপক্ষ।

জানা গেছে, মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোয় তালিকা চেয়ে কন্ট্রোল অর্ডার পাঠিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে রেলওয়ের পরিবহন, বাণিজ্যিক, প্রকৌশল ও নিরাপত্তা বাহিনীর কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। এ নিয়ে বিভাগওয়ারি তালিকা এরই মধ্যে দুটি বিভাগের প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে। সংস্থাপন বিভাগ থেকে তালিকাটি রেলওয়ে মহাপরিচালকের কার্যালয়ে পাঠানো হবে। তবে রেলের সংশ্লিষ্ট কিছু অফিসের দাপ্তরিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তালিকা তৈরি করতে বেগ পেতে হচ্ছে। এতে তালিকা তৈরি করে পাঠানোর কাজ বিলম্বিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মিহির কান্তি গুহ বণিক বার্তাকে বলেন, সরকারি ছুটির কারণে অফিস বন্ধ রয়েছে। তবে খাদ্যপণ্য পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত ট্রেনগুলো পরিচালনায় নিযুক্ত কর্মীরা দিন-রাত কাজ করে এ পরিস্থিতিতেও সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। মন্ত্রণালয় থেকে ঝুঁকি নিয়ে কর্মরত কর্মীদের তালিকা চাওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকায় সব বিভাগ থেকে তালিকা এখনো হাতে এসে পৌঁছেনি। তবে পশ্চিমাঞ্চল রেলে প্রায় এক হাজার কর্মীর তালিকা তৈরি হতে পারে।

রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের দপ্তর থেকে সম্প্রতি একটি কন্ট্রোল অর্ডার দেয়া হয় পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপককে (ডিআরএম)। ওই আদেশে বলা হয়, চলমান নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতিতে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটি চলাকালে যেসব রেলকর্মী মাঠ পর্যায়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন, তাদের নামের তালিকা দ্রুততম সময়ের মধ্যে প্রধান সংস্থাপন কর্মকর্তার কাছে পাঠাতে হবে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে কাজে যুক্ত থাকা অবস্থায় কোনো রেলকর্মী কভিড-১৯-এ আক্রান্ত হলে বা রোগটির উপসর্গ দেখা দিলে অথবা অন্য যেকোনো রোগে আক্রান্ত হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে রেলের সংশ্লিষ্ট দপ্তর মারফত উচ্চ পর্যায়ে অবহিত করতে হবে।

২৫ মার্চ সন্ধ্যা থেকেই সারা দেশে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। কিন্তু নিত্যপণ্যসামগ্রীর সরবরাহ নিশ্চিত করতে মালবাহী ট্রেনের চলাচল স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। ট্রেনের সংখ্যা ৯৫ শতাংশ কমলেও ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক রাখতে দেশের প্রায় সব স্টেশনই খোলা রাখতে হচ্ছে। প্রকৌশলগত পরিবহন মাধ্যম হওয়ার পাশাপাশি দেশের অধিকাংশ রেলপথ ও স্টেশনের কার্যক্রম ডিজিটাল না হওয়ায় পরিবহন বিভাগের বিভিন্ন কর্মীকে কর্মস্থলে শতভাগ উপস্থিত থাকতে হচ্ছে। কিন্তু স্টেশন বা কর্মস্থল এলাকা থেকে দূরে থাকার কারণে তাদের অনেককে প্রতিদিনই হেঁটে কাজে যেতে হচ্ছে।

রেলের পরিবহন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি), স্টেশন মাস্টার, ওয়েম্যান, পয়েন্টসম্যানসহ কয়েক হাজার কর্মী বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন। কভিড-১৯-এর প্রকোপ বাড়ার পর এসব কর্মীর মধ্যে সীমিত আকারে নিরাপত্তা সরঞ্জাম দেয়া হয়েছে, যা ছিল খুবই অপ্রতুল। যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় তাদের অনেককেই স্টেশনে যেতে হয় হেঁটে। অনেকে প্রান্তিক স্টেশনের কর্মীদের এমনকি ৮-১০ কিলোমিটার পথও হেঁটে অফিস করতে যাচ্ছেন। নিম্নপর্যায়ের এসব কর্মীর জন্য এতটা দূরত্বের পথ পাড়ি দিয়ে কাজ করা বেশ কষ্টকর। চলমান দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে এসব কর্মীর জন্য রেলের পক্ষ থেকে যানবাহন সুবিধা দেয়ার দাবি তুলেছে রেলসংশ্লিষ্ট বেশ কয়েকটি সংগঠন।

রেলওয়ের পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ট্রেন চলাচল বন্ধের মধ্যেও ঝুঁকিতে দায়িত্ব পালন করছেন রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি), ইয়ার্ড মাস্টার, লোকো মাস্টার, খালাসি, ট্রাফিক ইন্সপেক্টর, মেইনলাইনের বিভিন্ন স্টেশন ম্যানেজার, স্টেশন মাস্টার, গার্ড, ওয়েম্যান, টালি ক্লার্ক, ফিলম্যান, পোর্টার, স্টেশন পেশকার, হেড বুকিং ক্লার্ক, পয়েন্টসম্যান, টিএনএল, টিএক্সআর, ডিএসটিই, সান্টিং জমাদার, সান্টিং পোর্টার, লোকো মাস্টারসহ অনেকেই। রেলওয়ের পূর্ব ও পশ্চিম অঞ্চলের মাঠ পর্যায়ে কর্মরত এ ধরনের কর্মীর সংখ্যা কয়েক হাজার। যাতায়াতের পাশাপাশি আরো নানা সংকটের মধ্য দিয়ে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন তারা। এসব কর্মী নির্ধারিত স্টেশনে কাজ করলেও সেখানে খাবারের সুবিধা না থাকায় কেউ কেউ অসুস্থ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটছে।

রেলওয়েসংশ্লিষ্টরা জানান, সারা দেশের রেলপথগুলো শতভাগ কম্পিউটার বেইজড ইন্টারলকিং (সিবিএ) পদ্ধতিতে আসেনি। ফলে একটি ট্রেন চলাচল করলেও সংশ্লিষ্ট রেলপথের সব স্টেশন খোলা রাখতে হয়। কাজে যুক্ত থাকতে হয় পয়েন্টসম্যান, স্টেশন মাস্টারসহ একাধিক কর্মীকে। তাছাড়া আসন্ন রোজার ঈদের আগে রেলের পুরনো ইঞ্জিন, কোচ মেরামতকাজ চলমান রয়েছে। নিয়মিত তদারকির জন্য স্টেশন খোলা রাখা এবং সরকারি সম্পদ রক্ষার স্বার্থে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা নিয়মিত কাজে যুক্ত রয়েছেন। ঝুঁকি নিয়ে কর্মরত এ কর্মীদের প্রণোদনা দিতে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে দাবি জানাবে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বণিক বার্তাকে বলেন, চিকিৎসা ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মীরা ছাড়াও নির্দিষ্টসংখ্যক রেলকর্মী দেশের এ ক্রান্তিকালে মাঠ পর্যায়ে কাজ করে যাচ্ছেন। খাদ্যশস্য, জরুরি আমদানি-রফতানি পণ্য, জ্বালানি পরিবহনের কাজে নিযুক্ত এসব কর্মী নভেল করোনাভাইরাসের ঝুঁকি সত্ত্বেও দেশের জন্য কাজ করছেন। সরকারিভাবে যাতে তাদের মূল্যায়ন করা হয়, সে বিষয়ে আমরা মাঠ পর্যায় থেকে তালিকা চেয়েছি। তালিকা হাতে পেলে রেলকর্মীদের প্রণোদনার বিষয়ে শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। 

সুত্র:বণিক বার্তা, এপ্রিল ২৩, ২০২০


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।