বেসরকারি খাতে রেল কোচ মেরামতের তোড়জোড়

বেসরকারি খাতে রেল কোচ মেরামতের তোড়জোড়

বিশেষ সংবাদদাতা : বেসরকারি খাতে ১০০টি মিটারগেজ কোচ মেরামতে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) চূড়ান্ত করেছে রেলওয়ে। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৯ কোটি ৫১ লাখ টাকা। ১০০টি কোচের মধ্যে ৫০টি চট্টগ্রামের খুলশী থানা ও ৫০টি ঢাকার শাহজাহানপুর থানা এলাকায় পরিত্যক্ত লাইনে রেখে মেরামত করা হবে। এক্ষেত্রে ব্যয় হবে যথাক্রমে ৪৫ কোটি ৫৮ লাখ ও ৩২ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। কোচগুলো মেরামতে একক দর বিবেচনা করা হয়েছে ৬৮ লাখ টাকা। অথচ কয়েক দিন আগেও সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় পুরাতন কোচ মেরামত করে একেবারে অত্যাধুনিক কোচ তৈরীতে খরচ হয়েছে গড়ে ৫০ লাখ টাকারও কম। এখনও সেই মেরামত প্রক্রিয়া চলছে। গত বছর পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বেসরকারি খাতে রেলওয়ের কোচ মেরামতের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। গুণগত মান বজায় রেখে কীভাবে উম্মুক্ত স্থানে কোচ মেরামত সম্ভব সে প্রশ্নেরও সদুত্তর দিতে পারেনি রেল কর্তৃপক্ষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর রেলওয়ের কারখানা এখনও অবহেলিত। এই কারখানার দিকে একটু নজর দিলে বেসরকারি খাতে কোচ মেরামত করার কোনো প্রয়োজন হতো না। বরং বেসরকারি খাতে কোচ মেরামতের জন্য যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়েছে সেই টাকায় সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার সক্ষমতা অনায়াসে বাড়ানো যায়। গত বছর আইএমইডির প্রতিবেদনেও আগামীতে রাজস্ব খাতে রেলের কোচ মেরামতের সুপারিশ করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, এর আগেও বেসরকারি খাতে কোচ মেরামতে কয়েকটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪ সালেও ৫০টি ব্রডগেজ ও ৫০টি মিটারগেজ কোচ মেরামতে প্রকল্প নেয় রেলওয়ে। কোচগুলো মেরামতে ব্যয় ধরা হয় ৭১ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এছাড়া ২০১২ সালে ২৬০টি কোচ বেসরকারি খাতে মেরামত করে রেলওয়ে। এর মধ্যে ছিল ২০০টি মিটারগেজ ও ৬০টি ব্রডগেজ কোচ। ২০১৫ সালে শেষ হওয়া প্রকল্পটিতে ব্যয় করা হয় ১২১ কোটি ১১ লাখ টাকা। এছাড়া ওভারটাইমের বিনিময়ে ১০০টি মিটারগেজ কোচ মেরামতে প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৬ সালে। ৫৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি শেষ হবে ২০১৯ সালে। এতে কোচ মেরামতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৮ কোটি ৮১ লাখ টাকা। ২০০৭ সালে বেসরকারি খাতে ২৫৮টি মিটারগেজ ও ১১০টি ব্রডগেজ কোচ মেরামত করা হয়। রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্যমতে, বর্তমানে ৪৫০টি মিটারগেজ ও ১২৫টি ব্রডগেজ কোচ মেরামতের অপেক্ষায় আছে। এগুলো মেরামতের সক্ষমতা রেলওয়ের নেই। রেল কোচ মেরামতের জন্য নীলফামারীর সৈয়দপুর ও চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে দুটি ওয়ার্কশপ আছে। ওয়ার্কশপ দুটির যন্ত্রপাতি অনেক পুরোনো হয়ে গেছে। প্রয়োজনীয় লোকবল ও সরকারি বরাদ্দও নেই। সে কারনে সরকারি বরাদ্দে উন্নয়ন প্রকল্প আকারে কোচ মেরামত করা হচ্ছে। বেসরকারি খাতে কোচ মেরামতের প্রকল্প প্র¯াÍবনায় বলা হয়েছে, বর্তমানে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে ৯৩৩টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী কোচ রয়েছে। এর মধ্যে ৪৯২টির আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। বাকি কোচগুলোর মধ্যে ৪৫০টি ওভারডিউ (অতিরিক্ত) শিডিউলে চলাচল করছে। রেলওয়ের সৈয়দপুর ওয়ার্কশপে ৫৬ ও পাহাড়তলীতে ৪০ শতাংশ জনবল ঘাটতি থাকায় কোচগুলো মেরামত করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি ওয়ার্কশপগুলোতে বাজেট বরাদ্দও অপ্রতুল। ফলে কোচগুলো অকেজো বসে আছে।

এদিকে, মাস খানেক আগে সৈয়দপুর ওয়ার্কশপে ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানী করা কোচের মতো প্রায় একই মানের কোচ তৈরী করা হয়েছে। প্রতিটি কোচে খরচ পড়েছে ৫০ লাখ টাকারও কম। ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার কোচের দাম হিসাব করলে প্রতিটি কোচে সাশ্রয় হয়েছে প্রায় চার কোটি টাকা। এখনও কোচ মেরামতের প্রক্রিয়া অব্যাহত আছে। রেলওয়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও স্বীকার করেছেন, স্বল্প সময়ে মানসম্মত কোচগুলো নির্মাণে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, কর্মচারি ও শ্রমিকরা। বিশেষ করে সৈয়দপুর কারখানার বিভাগীয় তত্ত¡াবধায়ক (ডিএস) মুহাম্মদ কুদরত-ই-খুদার কৃতিত্বের প্রশংসা করেছেন সকলেই।

অন্যদিকে, যাত্রী পরিবহনে সক্ষমতা বাড়াতে ২০০৯ সালে ২৬০টি পুরাতন কোচ মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর মধ্যে ২০০টি মিটার গেজ এবং ৬০টি ব্রড গেজ কোচ। রেলওয়ের নিজস্ব ওয়ার্কশপ সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানার সক্ষমতা না থাকায় কিছু কোচ বেসরকারি খাতে মেরামতের উদ্যোগ নেয়া হয়। বাকিগুলো মেরামত করা হয় রেলওয়ের নিজস্ব তত্ত¡াবধানে। সে সময় কোচগুলো মেরামতে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২২ কোটি ২৬ লাখ টাকা। তবে বাস্তবে এ খাতে ব্যয় হয় ১০৫ কোটি ৩৪ লাখ টাকা। ওই প্রকল্প নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডির) প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যয় কম হলেও কোচগুলো মেরামতের মান ছিল খুবই খারাপ। ২০১৪ সালের জুনে প্রকল্পটি সমাপ্ত হয়। আর ২০১৫ সালের ৩০ এপ্রিল ও ১১ মে কোচগুলো পরিদর্শন করে আইএমইডি। প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩০ এপ্রিল রাজশাহী স্টেশনে অপেক্ষমাণ কোচ নং-৫১৪১ ( তেঁতুলিয়া এক্সপ্রেস), কোচ নং- ৫৪২০ (সুন্দরবন এক্সপ্রেস), কোচ নং- ৫৫২২ (সাগরদাঁড়ি এক্সপ্রেস) এবং কোচ নং-৪১১০ সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ৫৫২২ ও ৪১১০ নং কোচ দুটি সৈয়দপুর ওয়ার্কশপে রেলওয়ের নিজস্ব তত্তাবধানে মেরামত করা হয়েছে। আর ৫১৪১ ও ৫৪২০ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে মেরামত করানো হয়। পরিদর্শনকালে ৫৪২০ নং কোচের মেঝে ভাঙা অবস্থায় দেখা যায়। এ সম্পর্কে আইএমইডি পরিদর্শন দলের মন্তব্য- ‘প্রকল্প শেষ হওয়ার বছর না ঘুরতেই নষ্ট হয়ে যাওয়া কাম্য নয়।’ প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০১৫ সলের ১১ মে চট্টগ্রামে স্টেশন ইয়ার্ডে পাঁচটি মিটার গেজ যাত্রীবাহী কোচ সরেজমিন পরিদর্শন করে আইএমইডি প্রতিনিধিদল। এগুলো হলো ৬০২৪, ৩৪৩৮, ২২৫, ২০৭ ও ২৩৪। এর মধ্যে একটি কোচের মেঝে ও সিট নোংরা অবস্থায় পাওয়া যায়। একটি কোচের সিট ছেঁড়া অবস্থায় ছিল। এছাড়া উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুযায়ী কোচগুলোতে অগ্নিনিরোধক যন্ত্র রাখার কথা থাকলেও তা মানা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরিদর্শনকালে বেসরকারি সংস্থার নিজস্ব কোনো ওয়ার্কশপ আছে কি না জানতে চায় আইএমইডি দল। তখন জানানো হয়, বেসরকারি সংস্থার নিজস্ব কোনো ওয়ার্কশপ নেই।

তবে যন্ত্রপাতি ও জনবল নিয়োগ দিয়ে রেলওয়ের বিদ্যমান লাইনের ওপর রেখে কোচগুলো মেরামত করা হয়। এ প্রসঙ্গে আলাপকালে কয়েকজন বলেন, ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানায় কোচ মেরামত কেনো নতুন কোচও তৈরী করা সম্ভব। এই কারখানা রেখে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে কোচ মেরামতের দায়িত্ব দেয়া আত্মঘাতির সমতুল্য উল্লেখ করে একজন প্রকৌশলী বলেন, যে কাজ রেলওয়ের শ্রমিকরা অনায়াসে করতে পারতো সেই কাজ বেসরকারি কোম্পানীকে কেনো বা কার স্বার্থে দেয়া হয়েছিল তা নিয়ে অনেকেরই প্রশ্ন আছে। এক বছর যেতে না যেতেই আবার একই প্রক্রিয়ায় কোচ মেরামতের প্রকল্পের প্রস্তাবে অনেকেই বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

সুত্র:ইনকিলাব, ২৭ মার্চ ২০১৮

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।