বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও বেড়েছে রানিং টাইম

বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও বেড়েছে রানিং টাইম

সুজিত সাহা :গত এক দশকে রেলওয়ে খাতে বিপুল পরিমাণে বিনিয়োগ করেছে সরকার। কিন্তু এর পরও রেলসেবার মান বাড়েনি উপরন্তু রেল দুর্ঘটনার পরিমাণ বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। বেড়েছে শিডিউল বিপর্যয়ের প্রবণতাও। এর সঙ্গে আবার সম্প্রতি রানিং টাইম (প্রারম্ভিক স্টেশন থেকে গন্তব্যে পৌঁছার সময়) বাড়ানো হয়েছে ৫০ শতাংশ ট্রেনের। প্রকল্পের পর প্রকল্প বাস্তবায়নের পরও এভাবে রানিং টাইম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিতে রেলসেবা মানের ক্রমাগত নিম্নমুখিতারই ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেলওয়ের সর্বশেষ প্রকাশিত ওয়ার্কিং টাইম টেবিল (ডব্লিউটিটি) অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের ৪৬টি আন্তঃনগর ট্রেনের মধ্যে ২১টির রানিং টাইম বাড়ানো হয়েছে। সামান্য কমেছে ১৬টি ট্রেনের রানিং টাইম। অপরিবর্তিত রয়েছে আটটির। অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চল রেলের ৪২টি আন্তঃনগর ট্রেনের মধ্যে রানিং টাইম বেড়েছে ১৮টির। কমেছে ১৪টির। অপরিবর্তিত রয়েছে ১০টির।

উভয় অঞ্চলের আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর মধ্যে কোনো কোনো ট্রেনের রানিং টাইম সর্বোচ্চ ২ ঘণ্টা পর্যন্ত বেড়েছে। অন্যদিকে রানিং টাইম কমে যাওয়া ট্রেনগুলোর মধ্যে বেশির ভাগের সময় কমেছে মোটে ৫ থেকে ২০ মিনিট।

দেশের রেল খাতে বিনিয়োগের মাত্রা বরাবরই ঊর্ধ্বমুখী। ২০০৭-১০ সাল পর্যন্ত রেলওয়ের তিন বছর বিনিয়োগ প্রোগ্রামে বিনিয়োগ হয়েছে ২ হাজার ৯৬৯ কোটি টাকা। এরপর ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১১-১৫) খাতটিতে বিনিয়োগের লক্ষ্য রাখা হয় ৪৩ হাজার ৫০৯ কোটি টাকা। চলমান সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১৬-২০) এ লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬৬ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা। বিনিয়োগ ও বিনিয়োগ পরিকল্পনায় বরাদ্দের পরিমাণ ক্রমে বাড়লেও রানিং টাইম বেড়ে যাওয়ার বিষয়টিতে এর কোনো প্রতিফলনই নেই। রেলসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিপুল বিনিয়োগের পরও ব্যবস্থাপনাগত নানা অসংগতি ও দুর্নীতির কারণেই রানিং টাইম বাড়ছে।

অন্যদিকে রেলের পরিকল্পনা ও পরিবহন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বলছেন, রেলের বিভিন্ন ধরনের উন্নয়ন প্রকল্প শেষ হলেও তা সুষম হয়নি। ট্র্যাকের উন্নয়ন করার পাশাপাশি নতুন কোচ আনা হলেও অধিকাংশ ইঞ্জিনই মেয়াদোত্তীর্ণ। এছাড়া সিংহভাগ সেতু, কালভার্ট এখনো জরাজীর্ণ। স্টেশন বন্ধ থাকায় কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না ট্রেনগুলো। এসব কারণে সেকশন অনুযায়ী ট্রেন চালানোর সক্ষমতা কমে যাওয়ায় ট্রেনের রানিং টাইম কমানো সম্ভব হচ্ছে না।

রেলওয়ের সর্বশেষ টাইম টেবিল বাস্তবায়ন হয়েছে চলতি বছরের ১০ জানুয়ারি। এর আগের টাইম টেবিলটি বাস্তবায়ন করা হয়েছিল ২০১৭ সালের ১ মার্চ। প্রতি বছর সময়সূচি পুনর্নির্ধারণ করে নতুন টাইম টেবিল বাস্তবায়নের কথা থাকলেও এবার নতুন টাইম টেবিল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সময় লেগেছে ২ বছর ১০ মাস। এ সময়ে রেলওয়ের একাধিক বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন ছাড়াও নতুন নতুন কোচ সংযোজন, ট্র্যাক সংস্কার, কালভার্ট ও ব্রিজ সংস্কার, নতুন নতুন সেতু নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে। এর ধারাবাহিকতায় রেলের প্রায় প্রতিটি ট্রেনের সময়সূচিতেই রানিং টাইম কমে আসার কথা ছিল।

দেশের জনপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ রেলরুট ঢাকা-চট্টগ্রাম। যাত্রীদের ঘনত্বও অনেক বেশি রুটটিতে। এখানে প্রথম আন্তঃনগর ট্রেন চালু হয় ১৯৮৫ সালের দিকে। সে সময় এ রুটে যাত্রী চলাচলে সময় লাগত খুবই কম। পরবর্তী সময়ে রেলের বিনিয়োগ ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও এ রুটে ট্রেনের রানিং টাইমও বেড়েছে। বিভিন্ন সময় কমিয়ে আনার আশ্বাস দিয়েও রানিং টাইম কমাতে পারেনি রেলওয়ে। যদিও এরই মধ্যে ৩২১ কিলোমিটার দীর্ঘ রেল রুটটিতে দুটি ডাবল ট্র্যাকের সেতু (তিতাস ও ভৈরব) নির্মাণ হয়েছে। ডাবল লাইন হয়েছে লাকসাম থেকে চিনকি আস্তানা পর্যন্ত এবং টঙ্গী থেকে ভৈরব বাজার পর্যন্ত রেলপথ। অন্যদিকে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেলপথ ডাবল লাইন ছিল আগে থেকেই। এছাড়া এ রুটের পুরনো ট্র্যাকগুলোও সংস্কার করা হয়েছে। তার পরও ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে বিরতিহীন ট্রেনের রানিং টাইম ৫ ঘণ্টার নিচে নামিয়ে আনতে পারেনি রেলওয়ে। বরং সর্বশেষ প্রণীত টাইমটেবিলে বিরতিহীন সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনের রানিং সময় ১০ মিনিট করে বাড়িয়ে ৫ ঘণ্টা ২০ মিনিট করা হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক নাসির উদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, রেলের অনেক চলমান প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। ফলে নতুন ট্র্যাক, কোচ ও একাধিক উন্নয়ন হলেও অস্থায়ী গতি নিয়ন্ত্রণাদেশের কারণে ট্রেনের গতি কমে যায়। তাছাড়া ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয়সহ বিভিন্ন কারণে যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতে ট্রেনের রানিং সময় বাড়ানো হয়েছে। ট্র্যাক, সেতু, কালভার্টসহ একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শেষ হলে আগামীতে এসব বর্ধিত রানিং টাইম সমন্বয় করা হবে। 

সুত্র:বণিক বার্তা, জানুয়ারি ৩১, ২০২০

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।