ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছে ১৮ ট্রেন

ঝুঁকি নিয়ে পার হচ্ছে ১৮ ট্রেন

গোলাম মোস্তফা আনছারী: রংপুরের তিস্তা সেতুর মেয়াদোত্তীর্ণের ১৮ বছর পর আগামীকাল ১৬ অক্টোবর এর ওপর দিয়ে যাত্রা শুরু করবে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস। এছাড়াও প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে লালমনিরহাট রেল ডিভিশনের তিস্তা রেলসেতু পারাপার হচ্ছে মেইল, লোকাল ও একটি আন্তঃনগরসহ ১৮টি ট্রেন। পাশে আরেকটি সেতু নির্মাণের সরকারি পরিকল্পনা আছে। তবে বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেই। রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, সারাদেশের সঙ্গে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম অঞ্চলের রেল যোগাযোগ সৃষ্টি করতে ১৯০১ সালে তিস্তা নদীর ওপর ২ হাজার ১১০ ফুট লম্বা এই তিস্তা রেলসেতু নির্মাণ করেন তত্কালীন ব্রিটিশ সরকার। সে সময় দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রেলসেতু হিসেবে এটির পরিচিতি ছিল ব্যাপক। সেতুটির উত্তর পাশে লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তা এলাকা এবং দক্ষিণ পাশে রয়েছে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলা। ১১৯ বছর বয়সের এ সেতুটির মেয়াদ ধরা হয়েছিল ১০০ বছর। ১৮ বছর আগে সেতুটি মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও ঝুঁকি নিয়ে দৈনিক পারাপার করছে ১৮টি ট্রেন।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সেতুটির কাউনিয়া প্রান্তের একটি গার্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরবর্তীতে মেরামতের মাধ্যমে ১৯৭২ সালে সেতুটি পুনরায় চালু করা হয়। ১৯৭৭ সালে রেলওয়ে ও সওজ বিভাগ যৌথভাবে রেলসেতুতে মিটারগেজ লাইনের পাশে ২৬০টি স্টিলের টাইফ পে­ট ও কাঠের পাটাতন স্থাপন করে। ১৯৭৮ সালে ট্রেনের পাশাপাশি সড়ক যোগাযোগ শুরু করা হয়। সে থেকেই সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন ও যাত্রীবাহী বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করত। মাত্রাতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক ও পাথরের ট্রাক পারাপারের ফলে সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল।

২০০১ সালে রেলসেতুর পূর্বপাশে তিস্তা সড়ক সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তা সড়ক সেতু উদ্বোধন করেন। সড়ক সেতু চালু হওয়ায় মেয়াদোত্তীর্ণ রেলসেতুর ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল বন্ধ হলেও ট্রেন চলাচল থাকে স্বাভাবিক। সেতুর মেয়াদ শেষ হওয়ার পরেও দীর্ঘদিন থেকে ঝুঁকি নিয়ে ট্রেন চলাচল করছে এই সেতুতে। অযত্ন আর অবহেলায় সেতুটির লাইনে বেশ কিছু স্লিপার নষ্ট হয়েছে। খুলে পড়ে গেছে অনেক স্লিপারের পে­ট ও নাটবল্টু।

তিস্তা পাড়ের বাসিন্দা স্বপন, ভরত সামাদ মিয়া, তোজাম আলী, রহিম মিয়া বলেন, তিস্তা রেলসেতুটির ওপর ট্রেন উঠলে সেতুটি কেঁপে ওঠে। সবসময় আতঙ্কে থাকি। মাঝেমাঝে মেরামতের কাজ হলেও সেতুটির কেঁপে ওঠা থামেনি।

ট্রেনের অনেক যাত্রী বলেন, তিস্তা রেলসেতুতে ট্রেন উঠলে বুকটা কেঁপে ওঠে। সেতুটি অতিক্রম না করা পর্যন্ত বুক কাঁপতে থাকে। দীর্ঘদিন ধরে জোড়াতালি দিয়ে সেতুটিতে ট্রেন চলাচল করছে। কয়েক মাস আগে তিস্তা রেলসেতু পরিদর্শন করে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন সাংবাদিকদের বলেছিলেন, কানেকটিভিটি বাড়াতে তিস্তা রেলসেতুতে ট্রেনের গতি ও সংখ্যা বাড়ানো হবে। তাই তিস্তা নদীর ওপর আরেকটি রেলসেতুর সম্ভাব্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুরোনো সেতুর পশ্চিম পাশেই আরেকটি ডুয়েল গেজ সেতু নির্মাণের কাজে খুব দ্রুত হাত দেওয়া হবে।

রেলওয়ের পশ্চিম অঞ্চল জোনের প্রধান প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার আল-ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, বিভাগের ছোটো বড়ো ৪০৮টি সেতুর খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। কিছু-কিছু সেতুতে এর আগে মেরামত কাজ করা হয়েছে। তবে তিস্তা সেতু মেরামত করা হয়েছে। এখন এই সেতু ট্রেন চলাচলে সহনশীল। আমরা একে ঝুঁকিপূর্ণ সেতু বলতে পারি না। মেরামতের মাধ্যমে এ সেতুকে মজবুত করে তোলা হয়েছে। তিস্তা রেলসেতুতে ট্রেন উঠলে বুকটা কেঁপে ওঠে। সেতুটি অতিক্রম না করা পর্যন্ত বুক কাঁপতে থাকে যাত্রীদের এমন মন্তব্য প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমি সরেজমিনে গিয়ে ব্যাপারটি প্রত্যক্ষ করব।

রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগীয় ম্যানেজার মুহাম্মদ শফিকুর রহমান ইত্তেফাককে বলেন, গত ২৫ জুন একনেকের বৈঠকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী এ বিভাগের ছোটো-বড়ো ৪০৮টি সেতুর খোঁজখবর নেওয়া হয়েছে। কিছু কিছু সেতুতে এর আগে মেরামত কাজ শুরু হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কোনো সেতু নেই। তিস্তা রেলসেতু ঝুঁকিপূর্ণ নয়। তবুও তিস্তা রেলসেতুর পশ্চিম পাশে নতুন করে আরো একটি ডাবল ব্রডগেজ সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

সুত্র:ইত্তেফাক, ১৫ অক্টোবর, ২০১৯


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।