এক দশক ধরে ঝুলছে রেলের ৭০ ইঞ্জিন প্রকল্প

এক দশক ধরে ঝুলছে রেলের ৭০ ইঞ্জিন প্রকল্প

ইসমাইল আলী: বাংলাদেশ রেলওয়ের ইঞ্জিনের বড় অংশের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে বহু আগেই। এজন্য ২০১১ সালে ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনার উদ্যোগ নেয় রেলওয়ে। তবে এক দশকেও ইঞ্জিনগুলো কেনা সম্পন্ন হয়নি। এমনকি ইঞ্জিনগুলো কেনার জন্য বাণিজ্যিক চুক্তি সইয়ের দুই বছর পেরুলেও এখনও ঋণ চুক্তি চূড়ান্ত হয়নি। যদিও বর্তমানে রেলের মিটারগেজ ইঞ্জিনের সংকট নেই। ফলে এ প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।

তথ্যমতে, ৭০টি ইঞ্জিন কেনায় ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর প্রায় ২৩ কোটি ৯৪ লাখ ৫৭ হাজার ডলার বা দুই হাজার ৩৫ কোটি ৩৮ লাখ টাকার বাণিজ্যিক চুক্তি সই করে রেলওয়ে। দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানি এ ইঞ্জিনগুলো সরবরাহ করবে। চুক্তি অনুসারে ১৮ থেকে ৬০ মাসের মধ্যে ইঞ্জিনগুলো সরবরাহ করার কথা ছিল। তবে দুই বছরেও ঋণ চুক্তি না হওয়ায় এ প্রক্রিয়া পিছিয়ে যাচ্ছে।

তথ্যমতে, ২০১৮ সালের ১৬ মে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি (সিসিজিপি) ইঞ্জিনগুলো কেনার প্রস্তাব অনুমোদন করে। আর ইঞ্জিনগুলো কেনায় ঋণ প্রস্তাবটি ২০১৮ সালের ৭ জুন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) পাঠায় রেলপথ মন্ত্রণালয়। প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি নিয়ে সে বছর ৩০ জুলাই অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে দর কষাকষি ও ঋণ চুক্তি কার্যক্রম শুরু করে ইআরডি।

গত বছরের ১৯ নভেম্বর ইআরডি জানায়, ঋণের বিষয়ে এসসিবির সঙ্গে দর কষাকষি সম্পন্ন হয়েছে। তবে তা কঠিন শর্তের হওয়ায় অনমনীয় ঋণবিষয়ক স্থায়ী কমিটির অনুমোদন গ্রহণের অনুরোধ করা হয়। এজন্য চলতি বছর ৫ জানুয়ারি ঋণ প্রস্তাবটি ইআরডিতে পাঠানো হয়। এর ওপর গত ৪ ফেব্রুয়ারি অনমনীয় ঋণবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সভায় আলোচনা হয়। তবে কিছু বিষয় জটিলতা থাকায় তার ব্যাখ্যা চেয়ে প্রস্তাবটি ফেরত পাঠায় কমিটি।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, করোনার কারণে ঋণ প্রস্তাব অনুমোদনের বিষয়টি অনেক দিন ঝুলে ছিল। তবে গত ২৭ আগস্ট অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন অনমনীয় ঋণবিষয়ক স্থায়ী কমিটি প্রস্তাবটি অনুমোদন করেছে। তবে এখনো প্রক্রিয়া শেষ হয়নি। সবকিছু চূড়ান্ত করে ইআরডি ঋণ প্রস্তাবটি পাঠাবে আইন মন্ত্রণালয়ে। তাদের ভেটিংয়ের পর তা অনুমোদনের জন্য যাবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তিনি অনুমোদন করার পর ঋণচুক্তি সই হবে।

এদিকে ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনায় স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (এসসিবি) ও জাপানের সুমিতোমো মিটসুই ব্যাংকিং করপোরেশন (এসএমবিসি) থেকে নেওয়া হচ্ছে কঠিন শর্তের ঋণ। এ ঋণের পরিমাণ প্রায় ২৮ কোটি দুই লাখ ৩২ হাজার ডলার, যা ইঞ্জিনের দামের চেয়ে ১৭ শতাংশ বেশি। এ নিয়ে রয়েছে নানা ধরনের প্রশ্ন। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, মূলত ঋণ সরবরাহকারী ব্যাংক দুটি সুদ ছাড়াও মোটা অঙ্কের প্রিমিয়াম নিচ্ছে। এর পরিমাণ ঋণের প্রায় ১৭ শতাংশ। আর সরকারি তহবিল থেকে এ প্রিমিয়াম পরিশোধের পরিবর্তে ঋণ গ্রহণের পক্ষে মতামত দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়। তাই প্রায় চার কোটি ডলার অতিরিক্ত ঋণ নিতে হচ্ছে।

যদিও এক দশক পরে ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনা প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এক দশকে রেলের রোলিং স্টকের (ইঞ্জিন, কোচ) চিত্রে বেশ পরিবর্তন হয়েছে। বেশকিছু মিটারগেজ ইঞ্জিন কেনার ফলে বর্তমানে এ খাতে আর সংকট নেই। এছাড়া দেশে নতুন করে আর মিটারগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে না। বরং প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুসারে নতুন করে নির্মিত সব রেলপথই হচ্ছে ডুয়েলগেজ বা ব্রডগেজ। যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা বেশি ও গতি বেশি হওয়ায় মিটারগেজ থেকে ক্রমেই ব্রডগেজ বা ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে পুরোনো রেলপথগুলো। এতে মিটারগেজ ইঞ্জিনের চাহিদা আগামীতে আর থাকবে না। তাই প্রকল্পটির প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

এ বিষয়ে সম্প্রতি জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এক্ষেত্রে প্রকল্প পরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগের পরামর্শ দেন তিনি। পরে ৭০ ইঞ্জিন কেনা প্রকল্পের পরিচালক আহমেদ মাহবুব চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, অনেকগুলো ধাপ পেরিয়ে প্রকল্পটি বর্তমান অবস্থায় এসেছে। তাই চাইলেই এটি বাতিল করা সম্ভব নয়। এটি বাতিল করতে হলে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা দরকার। তবে বর্তমান প্রেক্ষাপটে ৭০টির পরিবর্তে ৩০টি ইঞ্জিন কিনলেই চলত।

তিনি আরও বলেন, সংকট না থাকায় রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করেছেন। তাই আগামীতে প্রয়োজন না হলে কিছু মিটারগেজ ইঞ্জিনকে ব্রডগেজে রূপান্তর করা হতে পারে। এক্ষেত্রে হুন্দাই রোটেমের সহায়তা নেওয়া হবে। যদিও এজন্য পৃথক প্রকল্প নিতে হবে।

প্রসঙ্গত, ২০১১ সালের ২৩ আগস্ট ৭০টি ইঞ্জিন কেনার প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। সে সময় প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল এক হাজার ৯৪৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। সরকারের নিজস্ব অর্থায়নে ইঞ্জিনগুলো কেনার কথা ছিল। পরবর্তীকালে সহজ শর্তের ঋণ বা সরবরাহকারীর ঋণে ইঞ্জিনগুলো কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে কঠিন শর্তের ঋণে ইঞ্জিনগুলো কেনা হচ্ছে।

৭০টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৩০টি সম্পূর্ণ অবস্থায় কেনা হচ্ছে। বাকি ইঞ্জিনগুলোর মধ্যে ২৫টি অর্ধ উš§ুক্ত অবস্থায় (হাফ নকডাউন) ও বাকি ১৫টি পুরোপুরি উš§ুক্ত অবস্থায় (ফুল নকডাউন) সরবরাহ করা হবে। এ ইঞ্জিনগুলো দেশে এনে রেলের নিজস্ব ওয়ার্কশপে সংযোজন করা হবে। যদিও অর্ধ উš§ুক্ত ও পুরো উš§ুক্ত ইঞ্জিনের দাম কম পড়বে বলে ধারণা করেছিলেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা। তবে বাস্তব পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে ভিন্ন। ৭০টি ইঞ্জিনের সবগুলো একই দামে কিনতে হচ্ছে।

এদিকে এক দশক ঝুলে থাকায় প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ৬৫৯ কোটি ৩৩ লাখ টাকা। অর্থাৎ এরই মধ্যে ইঞ্জিনগুলো কেনায় ব্যয় বেড়ে গেছে ৭১৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকা বা ৩৬ দশমিক ৬৬ শতাংশ। তবে ঋণ চুক্তি না হওয়ায় প্রকল্পটি আরও বিলম্বিত হচ্ছে। এতে প্রকল্প ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

সূত্র:শেযার বিজ, অক্টোবর ২৬, ২০২০ 

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।