উন্নয়ন প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ নিয়ে বিপাকে রেলওয়ে

উন্নয়ন প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ নিয়ে বিপাকে রেলওয়ে

ইসমাইল আলী:
বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিচালনায় একসময় ছিল স্বাধীন বোর্ড। রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান হলেও তখন রেলওয়ের ওপর সরকারের একক নিয়ন্ত্রণ ছিল না। ফলে নিজস্ব আয়-ব্যয়ের জন্য পৃথক রেল বাজেটও প্রণয়ন করা হতো। সে সময় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে নিজেরাই ঋণ গ্রহণ ও পরিশোধ করত রেলওয়ে। ১৯৭৩ সালে রেলওয়ে বোর্ড বিলুপ্ত করা হলেও এখনও আগের নিয়মেই নিজস্ব ঋণ পরিশোধ করতে হয় রেলওয়েকে। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত এ প্রতিষ্ঠানটির লোকসানের পাল্লা ভারী হচ্ছে।

সম্প্রতি এ বিষয়ে জরুরি বৈঠক আহ্বান করে রেলওয়ে। এতে জানানো হয়, বর্তমানে সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হচ্ছে রেলওয়ে। আয়-ব্যয়ে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ বা পৃথক রেল বাজেট এখন নেই, তবু নিজস্ব আয় থেকে রেলওয়েকে উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য গৃহীত ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করতে হচ্ছে। অথচ রাষ্ট্রায়ত্ত অন্যান্য সংস্থার পক্ষে ঋণ পরিশোধের দায়িত্ব পালন করছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি)। রেলওয়ের ক্ষেত্রেও এমনটি অনুসরণ করা না হলে সংস্থাটির পরিচালন (আয়-ব্যয়) অনুপাত আরও খারাপ হবে, তথা লোকসান অনেক বেড়ে যাবে।

রেলওয়ের তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রেলের আয় হয় এক হাজার ৩০৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা। আর ওই সময়ে সংস্থাটির ব্যয় দাঁড়ায় দুই হাজার ৫৩২ কোটি ৪২ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রেলের লোকসান হয় এক হাজার ২২৫ কোটি ৯২ লাখ টাকা, যা সংস্থাটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর আগের অর্থবছর রেলের আয় ছিল এক হাজার ২৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। আর ওই সময়ে সংস্থাটির ব্যয় দাঁড়ায় দুই হাজার ২২৯ কোটি ২২ লাখ টাকা। অর্থাৎ ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রেলের লোকসান হয় এক হাজার ২০৫ কোটি ৪৩ লাখ টাকা। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রেলের লোকসান হয় ৮৭১ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

এদিকে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রেলওয়ের লোকসান ছিল ৮০৩ কোটি টাকা। ২০১২-১৩ অর্থবছরে সংস্থাটির লোকসান হয় ৮৮১ কোটি ও ২০১১-১২ অর্থবছরে এক হাজার ৫০ কোটি টাকা। অর্থাৎ কয়েক বছর ধরে রেলওয়েকে বড় অঙ্কের লোকসান গুনতে হচ্ছে।
সূত্র জানায়, বর্তমানে রেলওয়ের ৪৫টি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। এগুলো বাস্তবায়নে ব্যয় হবে ৯৪ হাজার ৮১৭ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ৬৩ হাজার ৬২৪ কোটি ৯৮ লাখ টাকা। এছাড়া গত ৯ বছরে আরও প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর মধ্যে বৈদেশিক ঋণ ছিল প্রায় অর্ধেক।

গ্রেস পিরিয়ড থাকায় এসব ঋণের সুদ এখন পরিশোধ করতে হচ্ছে। তবে দু-এক বছরের মধ্যে সুদের পাশাপাশি এসব ঋণের আসলও পরিশোধ শুরু হবে। এতে আগামীতে রেলের ঋণ পরিশোধের পরিমাণ অনেক বেড়ে যাবে। তখন এক লাফে রেলের লোকসান তিন থেকে চারগুণ হয়ে যাবে।
সূত্র আরও জানায়, ২০০৯ থেকে রেলওয়ের উন্নয়নে সরকার বেশি জোর দিচ্ছে। এতে বিগত বছরগুলোতে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেওয়া হতো। এছাড়া ভারতের ঋণেও বেশকিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। সহজ শর্তের এসব ঋণের সুদের হার সর্বোচ্চ এক শতাংশ। তবে রেলের প্রকল্প সংখ্যা ও আকার বাড়ায় এখন কঠিন শর্তের ঋণের দিকেও ঝুঁকতে হচ্ছে রেলওয়েকে। বায়ার্স ক্রেডিটের আওতায় এসব ঋণের সুদের হারও বেশি এবং পরিশোধের সময়ও কম। এতে আগামীতে রেলওয়েকে সুদ ও আসল বাবদ বড় অঙ্কের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে রেলভবনে জরুরি বৈঠক আহ্বান করা হয়।

বৈঠকে জানানো হয়, সব সরকারি সংস্থার অনুকূলে বৈদেশিক ঋণ চুক্তি সরকারের পক্ষে ইআরডি স্বাক্ষর করে। আবার সরকারের পক্ষে ইআরডি ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ করে। এজন্য সরকারের পক্ষ থেকে ইআরডিকে বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্যও গৃহীত ঋণের জন্য চুক্তি সই করে সরকারের পক্ষে ইআরডি। অথচ রেল বাজেট এ ঋণ রেলওয়েকে পরিশোধ করতে হয়। এক্ষেত্রে রেলওয়ের বাজেট থেকে বাদ দিয়ে ইআরডির বাজেট থেকে ঋণ পরিশোধ করা হলে রেলওয়ের পরিচালন অনুপাত উন্নত হবে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. আমজাদ হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, রেলওয়ের জন্য গৃহীত ঋণ পরিশোধের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাতে হবে। এজন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক আহ্বানে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সুত্র:শেয়ার বিজ, আগস্ট ৪, ২০১৮

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।