অস্বাভাবিক ব্যয়ে ভৈরববাজার বাইপাস নির্মাণের উদ্যোগ

অস্বাভাবিক ব্যয়ে ভৈরববাজার বাইপাস নির্মাণের উদ্যোগ

ইসমাইল আলী: ঢাকা-কিশোরগঞ্জ রুটে আন্তঃনগর ট্রেন রয়েছে মাত্র দুটি। এ ট্রেনগুলোতে কিশোরগঞ্জ ও ভৈরবের কয়েক হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। তবে কিশোরগঞ্জের যাত্রীদের সুবিধার্থে ভৈরববাজার বাইপাস নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। মাত্র তিন কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৭০ কোটি টাকা, যা রেলওয়ের চলমান অন্যান্য প্রকল্পের চেয়ে অনেক বেশি, যদিও এ ব্যয় আরও বাড়তে পারে। ফলে অস্বাভাবিক ব্যয়ে এ রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নতুন এ বাইপাস রেলপথ নির্মাণের ফলে বিপাকে পড়বেন ভৈরববাজারবাসী। এজন্য রেলপথটি নির্মাণে আপত্তি তুলেছেন তারা। ভৈরববাজার রেলপথ অবরোধ করে বিক্ষোভও করেছেন স্থানীয় জনগণ, যদিও নতুন এ বাইপাস রেলপথ নির্মাণের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। ফলে প্রকল্পটি বাতিলও করতে পারছে না রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

সূত্রমতে, ঢাকা-কিশোরগঞ্জ ট্রেনে অন্যতম স্টপেজ ভৈরববাজার। তবে এ জংশনে ট্রেন থামিয়ে ঘোরাতে হয় ইঞ্জিন। এতে যাত্রাপথে কিছুটা সময় বিরতি পড়ে। সে বিরতি বন্ধ করতে এবং ইঞ্জিন ঘোরানো রোধে কিছুদিন আগে এক জনসভায় ভৈরববাজার বাইপাস রেলপথ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। পরে রেলপথমন্ত্রী ও রেলপথ সচিবকে এ বিষয়ে নির্দেশ তিনি। এছাড়া গত ৩০ সেপ্টেম্বর রেলপথ সচিব বরাবর চিঠি পাঠান রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সচিব।
এতে বলা হয়, ‘ঢাকা-কিশোরগঞ্জ ট্রেন রুটে ভৈরব স্টেশনে ইঞ্জিন রিভার্স করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হয়। এতে প্রচুর সময় নষ্ট হয়। এজন্য ভৈরবে একটি স্টেশন নির্মাণসহ বাইপাসের মাধ্যমে সরাসরি লাইন সংযোগ করা যেতে পারে। উল্লেখ্য, মহামান্য রাষ্ট্রপতি বিভিন্ন সময়ে কিশোরগঞ্জ সফরকালে স্থানীয় জনগণ এসব বিষয় তার সামনে উপস্থাপন করলে তিনি একই মত পোষণ করেন।’
চিঠিতে ভৈরবে একটি বাইপাস (স্টেশনসহ) লাইন সংযোগের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাইপাস নির্মাণে সমীক্ষা পরিচালনা শুরু করে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ডুয়েলগেজ ভৈরব বাইপাস নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও বিশদ নকশা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এদিকে রেলওয়ের উদ্যোগের বিরুদ্ধে সম্প্রতি মানববন্ধন করেছেন ভৈরববাসী। তারা এ বাইপাস নির্মাণ বন্ধের দাবি জানান। পাশাপাশি সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের ছেলে ও বর্তমান সংসদ সদস্য নাজমুল হাসানের হস্তক্ষেপ দাবি করেন তারা।
জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, ভৈরববাজার বাইপাস নির্মাণে সমীক্ষা চলছে। তবে এ রেলপথ নির্মাণের ফলে ভৈরববাসীর বঞ্চিত হওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই। তাদের সুবিধার্থে বাইপাসের সুবিধাজনক স্থানে স্টপেজ রাখা হবে। এজন্য নতুন স্টেশন নির্মাণ করা হবে। এর আগে ঈশ্বরদী বাইপাসের ক্ষেত্রে মাঝগ্রামে একটি স্টেশন নির্মাণ করা হয়েছে। বাইপাস নির্মাণের ফলে ভৈরব ও কিশোরগঞ্জ উভয় গন্তব্যের যাত্রীরাই উপকৃত হবেন।
যদিও রেলওয়ের এ বক্তব্যের সঙ্গে একমত নয় ভৈরববাজারের নাগরিক সমাজ। তারা বলছেন, ২০০৯ সালের ১২ অক্টোবর মন্ত্রিপরিষদের এক সভায় ভৈরবকে দেশের ৬৫তম জেলা করার নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ১৫ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। পরবর্তী সময়ে জেলা বাস্তবায়নে নানা কার্যক্রম শুরু হয় স্থানীয়ভাবে। কিন্তু কিশোরগঞ্জ সদরের কিছু লোকের অখণ্ডতার দাবিতে ভৈরব জেলার বিরোধিতার কারণে তা আর এগোয়নি। অথচ শত বছরের পুরোনো দেশের অন্যতম রেলওয়ে জংশনকে বাইপাস করে কিশোরগঞ্জ সদরবাসীর সুবিধার্থে রেলপথ নির্মাণ কার্যক্রম পুরোদমে এগিয়ে যাচ্ছে। স্বপ্নভঙ্গের তাড়নায় থাকা ভৈরববাসীর পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এখন আন্দোলন ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ নেই। দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।

তথ্যমতে, ভৈরববাসীর আপত্তি উপেক্ষা করেই রেলপথ নির্মাণে কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে রেলওয়ে। বাইপাস রেলপথ নির্মাণে এরই মধ্যে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) প্রণয়ন করেছে রেলওয়ে। এতে মাত্র তিন কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৭০ কোটি ৪১ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণে গড়ে ব্যয় পড়ছে ২২৩ কোটি ৪৭ লাখ টাকা।

যদিও রেলওয়ের চলমান প্রকল্পের মধ্যে দোহাজারী-কক্সবাজার-ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১৩৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আর আখাউড়া-লাকসাম ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন প্রকল্পে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় হবে ৪৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা।
রেলওয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে এ প্রসঙ্গে বলেন, ভৈরববাজার বাইপাস রেলপথ নির্মাণে ৯-১০ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। আর সরকারি নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, জমি অধিগ্রহণে তিনগুণ ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। তাই এ খাতেই ব্যয় পড়বে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। এজন্য রেলপথ নির্মাণে ব্যয় অন্যান্য প্রকল্পের চেয়ে বেশি পড়ছে।

এদিকে ভৈরববাজার বাইপাস নির্মাণব্যয় এখনও চূড়ান্ত হয়নি। প্রকল্প প্রস্তাবে বেশকিছু বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সম্প্রতি অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে সুপারিশ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্প ব্যয় আরও বেড়ে যাবে। এছাড়া অত্যধিক ব্যয়ের কারণে প্রকল্পটি গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে নেই। তাই প্রকল্পটির ডিসকাউন্ট ফ্যাক্টর ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ১২ শতাংশ নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছে।

সুত্র:শেয়ার বিজ, ডিসেম্বর ১১, ২০১৮

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।