অবশেষে শুরু হল সংস্কার কাজ

‘নাটবল্টু, ক্লিপ-হুক, ফিশপ্লেট খোলা! রেললাইন যেন ‘মৃত্যুফাঁদ’, ‘ঝুঁকিপূর্ণ বেশির ভাগ রেলসেতু’, ‘তদন্ত রিপোর্টেই কঙ্কাল বেরিয়ে এলো রেলের’ এবং ‘সংস্কারহীন ঝুঁকিপূর্ণ লাইনের কারণেই দুর্ঘটনা’- এমন শিরোনামে গত দুই সপ্তাহে পৃথক চারটি প্রতিবেদন যুগান্তরে প্রকাশিত হয়। এরপরই নড়েচড়ে বসেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে মধ্যরাতেও রেলপথ-সেতু সংস্কারে উঠেপড়ে লেগেছে সংশ্লিষ্টরা। আর কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া প্রয়োজনীয় নির্দেশনার পর জরাজীর্ণ রেললাইন-সেতু মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে পুরোদমে। লাইন কিংবা সেতুতে লাগানো বাঁশ তুলে ফেলা হচ্ছে। নাটবল্টু, হুক-ক্লিপ, ফিশপ্লেটসহ রেলওয়ে সরঞ্জাম চুরি রোধে নেয়া হয়েছে বিশেষ পদক্ষেপ। যাতে সহজেই কেউ এগুলো খুলে ফেলতে না পারে। পাশাপাশি রেলওয়ে সরঞ্জাম চুরি করে যারা ক্রয়-বিক্রয় করছে, তাদের পুলিশে সোপর্দ করার আহ্বান জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন শনিবার দুপুরে যুগান্তরকে জানান, রেলপথ ও সেতু সংস্কার করতে মাঠ পর্যায়ে পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে। লাইন ও সেতু নিয়ে দৈনিক যুগান্তরসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসা সংবাদের পর আমরা বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ইতিমধ্যে রেললাইন ও সেতুগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে- এমন লাইন ও সেতুতে রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে মধ্যরাতেও মেরামতের কাজ চলছে। লাইন ও সেতু সংস্কারে আমরা এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। নাটবল্টু, ক্লিপ-হুক, ফিশপ্লেটবিহীন যে স্থানগুলো রেললাইন ও সেতুতে রয়েছে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে মেরামত করা হচ্ছে। রেললাইন ও সেতু ত্রুটির জন্য যারা দায়ী সেসব কর্মচারী-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, সেতু কিংবা লাইনে বাঁশ লাগানো নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যে রিপোর্ট এসেছে তাও আমরা খতিয়ে দেখছি। বিশ্বের কোথাও রেললাইন-সেতুতে বাঁশ লাগানো হয় না। আমি জানতে পেরেছি বাঁশ লাগানো হয়েছিল শুধু স্লিপার যেন না নড়ে। এমন যুক্তি আমি মেনে নেইনি। এখন থেকে লাইন-সেতুতে কোনো অবস্থাতেই বাঁশ লাগানো হবে না। যেসব স্থানে বাঁশ লাগানো আছে, তা তুলে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। লাইন-সেতুর যেখানেই ত্রুটি থাকবে, তা যত দ্রুত সম্ভব মেরামত করার নির্দেশ দেয়া রয়েছে। এ নির্দেশ অমান্য হলেই দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বর্তমান সরকার রেলওয়েকে অত্যাধুনিক করতে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে চলমান প্রকল্পগুলো সমাপ্ত হচ্ছে। অতি দ্রুতগতিসম্পন্ন বুলেট ও বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর প্রাথমিক কাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে যে রেললাইন-সেতু রয়েছে তা স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখতে না পারলে কোনো প্রকল্পেরই সুফল মেলবে না। ফলপ্রসূ হবে না আধুনিকায়নের। সম্প্রতি দুর্ঘটনার পর লাইন-সেতু মেরামত সংস্কারের যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তা যেন দ্রুত হারিয়ে না যায়। লাইন-সেতু প্রতিদিন দেখভালের কথা যাদের, তারা যেন ‘নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে’ না থাকে। এ সংস্কার যেন লোক দেখানো না হয়। যে কোনো দুর্ঘটনার পরই তৎপর হয়ে ওঠে রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা- এ যেন এক রকম স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এ সংস্কৃতি থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। রেলওয়ে মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. শাসছুজ্জামান যুগান্তরকে জানান, রেলপথমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে কোথাও রেললাইন-সেতুতে ত্রুটি থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার। কারও অবহেলা কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণে ট্রেন ঝুঁকি নিয়ে চলতে পারে না। ইতিমধ্যে আখাউড়া-সিলেট রেললাইন-সেতুতে কোন ধরনের ত্রুটি রয়েছে, সেগুলোর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। রেলওয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফাকে প্রধান করে গঠিত কমিটি দু-একদিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবে। এদিকে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কমলাপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেললাইন-সেতু মেরামত-সংস্কার করতে শতাধিক কর্মচারী দিন-রাত কাজ করছে। গত সপ্তাহে কমলাপুর রেলস্টেশনের অদূরে খিলগাঁওস্থ লাইনের একটি পয়েন্ট ৪-৫ ইঞ্চি ফাঁকাসহ নাটবল্টু খোলা ছিল। পাশাপাশি এই লাইনের বিভিন্ন স্থানে শত শত নাটবল্টু, ক্লিপ, হুক খোলা থাকতে দেখা গেছে। এ অবস্থার সচিত্র প্রতিবেদন ২৯ জুন যুগান্তরে প্রকাশিত হয়। কিন্তু শুক্র ও শনিবার ওইসব স্থানে দেখা গেছে, খোলা থাকা অধিকাংশ নাটবল্টু, ক্লিপ ও হুক লাগানো হয়েছে। আর রেললাইনের যে পয়েন্টে ৪-৫ ইঞ্চি ফাঁকা ছিল, সেখানে নতুন লাইন বসিয়ে মেরামত করা হয়েছে। লাইনের বাকি সংস্কার কাজও চলছে দ্রুতগতিতে। কমলাপুর-টঙ্গী রেলপথে কর্মরত ফোরম্যান আমির হোসেন শনিবার যুগান্তরকে জানান, পয়েন্টে ফাঁকা থাকা স্থানটুকু সংস্কার করা হয়েছে শুক্রবার মধ্যরাতে। এছাড়া ফিশপ্লেট কিংবা নাটবল্টু লাগানোর কাজও খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। যে কাজগুলো জটিল তা মধ্যরাতের পর করতে হয়, যখন ট্রেন চলাচল করে না। এসব কাজ ভোররাতের আগেই শেষ করা হয়। ভোররাতের পর ট্রেন চলাচল শুরু হয়, তখন এসব কাজ করা সম্ভব হয় না। কমলাপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত প্রতিদিন শতাধিক কর্মচারী কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, রেলওয়ে কর্মচারীর সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকরাও কাজ করছেন। কিছু কিছু স্থানে ট্রেন দাঁড় করিয়েও কাজ করতে হয়। ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় দ্রুত কাজ করতে হচ্ছে। কিছু কিছু নাটবল্টু, ক্লিপ, হুক কিংবা ফিশপ্লেট লাগাতে খুব একটা সময় লাগে না। আধুনিক মেশিন রয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে দ্রুত নাটবল্টুসহ অন্যান্য কাজ করা যায়। আমরা একই সঙ্গে যেসব স্থানে পাথর কম রয়েছে সেখানে পাথর দিচ্ছি। এদিকে রেলওয়ে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় ও রেল বিভাগ থেকে কঠোর নির্দেশনার পর সংশ্লিষ্টরা মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক হারে কাজ শুরু করেছে। রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আনোয়ারুল হক জানান, ত্রুটিযুক্ত সেতু চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু একেবারেই নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। কিছু সংস্কার করতে হবে। মাঠ পর্যায়ে সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। লাইন ও সেতুর ওপর বিশেষ নজর সব সময়ই থাকে। কিন্তু সম্প্রতি ট্রেন দুর্ঘটনার পর লাইন-সেতুর অবস্থা দেখে আমরা উদ্বিগ্ন। এসব স্থানগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করছি। লাইন-সেতুর কারণেই যে, সব সময় দুর্ঘটনা ঘটে তা নয়, জানিয়ে তিনি বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন-বগিও যথাযথ সংস্কার করা হবে। সবকিছুই যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যেসব স্থানে নাটবল্টু, ক্লিপ, হুক, ফিশপ্লেট প্রায় সময়ই খোলা থাকে সেগুলো হচ্ছে- ঢাকা-সিলেট, সিলেট-চট্টগ্রাম, লাকসাম-চাঁদপুর, ভৈরব-কিশোরগঞ্জ, ঢাকা-ময়মনসিংহ, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী-খুলনা, বঙ্গবন্ধু সেতু-রংপুর-পার্বতীপুর-পঞ্চগড়, রংপুর-লালমনিরহাট, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে প্রকৌশলী বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা নতুন করে এসব সরঞ্জাম লাগিয়েও রাখতে পারছি না। এসব মূল্যবান সরঞ্জাম প্রতিনিয়তই চুরি হচ্ছে। চুরি রোধ তো প্রকৌশলী বিভাগের কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না। তিনি বলেন, নির্জন স্থানগুলোতেই সবচেয়ে বেশি চুরি হয়। এ ক্ষেত্রে ব্রিজগুলোতে থাকা সরঞ্জাম বেশি চুরি হয়। কারণ ব্রিজগুলো খাল-বিল এলাকায় বেশি থাকে। ঢাকা প্রকৌশলী বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-টঙ্গী পর্যন্ত লাইনেও সরঞ্জাম চুরি হয়। মাদকাসক্তরা এসব কাজ বেশি করছে। তাছাড়া লাইনের ওপর বাজার বসায়, বিভিন্ন ময়লা আবর্জনায় লাইনে মরিচা ধরছে। সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে। খুলে যাচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৩ হাজার ৩৩৫ কিলোমিটার রেলপথের অধিকাংশ ব্রিজই জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করে সচল রাখার চেষ্টা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যমান রেলপথ ও রেলসেতু সংস্কারে উৎসাহ কম রেলওয়ের কর্মকর্তাদের। বরং উচ্চ ব্যয়ে রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণেই বেশি উৎসাহী তারা। গত প্রায় সাড়ে ৯ বছরে ৪২টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩শ’ নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব উন্নয়নের সুফল দেখাতে পারছে না রেল। লাইন-সেতু ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা লেগেই আছে। এতে বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে প্রাণহানি ঘটছে। যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কোনো কোনো কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, রেলপথ-সেতু মেরামত, সংস্কারে বরাদ্দ থাকে নামমাত্র। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নতুন প্রকল্প গ্রহণ বাস্তবায়নেই ব্যস্ত থাকেন।

শিপন হাবীব:
‘নাটবল্টু, ক্লিপ-হুক, ফিশপ্লেট খোলা! রেললাইন যেন ‘মৃত্যুফাঁদ’, ‘ঝুঁকিপূর্ণ বেশির ভাগ রেলসেতু’, ‘তদন্ত রিপোর্টেই কঙ্কাল বেরিয়ে এলো রেলের’ এবং ‘সংস্কারহীন ঝুঁকিপূর্ণ লাইনের কারণেই দুর্ঘটনা’- এমন শিরোনামে গত দুই সপ্তাহে পৃথক চারটি প্রতিবেদন যুগান্তরে প্রকাশিত হয়। এরপরই নড়েচড়ে বসেছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে মধ্যরাতেও রেলপথ-সেতু সংস্কারে উঠেপড়ে লেগেছে সংশ্লিষ্টরা।

আর কুলাউড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেয়া প্রয়োজনীয় নির্দেশনার পর জরাজীর্ণ রেললাইন-সেতু মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে পুরোদমে। লাইন কিংবা সেতুতে লাগানো বাঁশ তুলে ফেলা হচ্ছে।

নাটবল্টু, হুক-ক্লিপ, ফিশপ্লেটসহ রেলওয়ে সরঞ্জাম চুরি রোধে নেয়া হয়েছে বিশেষ পদক্ষেপ। যাতে সহজেই কেউ এগুলো খুলে ফেলতে না পারে। পাশাপাশি রেলওয়ে সরঞ্জাম চুরি করে যারা ক্রয়-বিক্রয় করছে, তাদের পুলিশে সোপর্দ করার আহ্বান জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন শনিবার দুপুরে যুগান্তরকে জানান, রেলপথ ও সেতু সংস্কার করতে মাঠ পর্যায়ে পুরোদমে কাজ শুরু হয়েছে। লাইন ও সেতু নিয়ে দৈনিক যুগান্তরসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে আসা সংবাদের পর আমরা বিষয়টি খুব গুরুত্ব দিয়ে দেখছি। আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় ইতিমধ্যে রেললাইন ও সেতুগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।

দ্রুত সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে- এমন লাইন ও সেতুতে রোদ-বৃষ্টি-ঝড় উপেক্ষা করে মধ্যরাতেও মেরামতের কাজ চলছে। লাইন ও সেতু সংস্কারে আমরা এখন সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছি। নাটবল্টু, ক্লিপ-হুক, ফিশপ্লেটবিহীন যে স্থানগুলো রেললাইন ও সেতুতে রয়েছে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে মেরামত করা হচ্ছে।

রেললাইন ও সেতু ত্রুটির জন্য যারা দায়ী সেসব কর্মচারী-কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে জানিয়ে মন্ত্রী আরও বলেন, সেতু কিংবা লাইনে বাঁশ লাগানো নিয়ে সংবাদমাধ্যমে যে রিপোর্ট এসেছে তাও আমরা খতিয়ে দেখছি। বিশ্বের কোথাও রেললাইন-সেতুতে বাঁশ লাগানো হয় না। আমি জানতে পেরেছি বাঁশ লাগানো হয়েছিল শুধু স্লিপার যেন না নড়ে। এমন যুক্তি আমি মেনে নেইনি।

এখন থেকে লাইন-সেতুতে কোনো অবস্থাতেই বাঁশ লাগানো হবে না। যেসব স্থানে বাঁশ লাগানো আছে, তা তুলে ফেলার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। লাইন-সেতুর যেখানেই ত্রুটি থাকবে, তা যত দ্রুত সম্ভব মেরামত করার নির্দেশ দেয়া রয়েছে। এ নির্দেশ অমান্য হলেই দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বর্তমান সরকার রেলওয়েকে অত্যাধুনিক করতে বিভিন্ন প্রকল্প গ্রহণ করেছে। একই সঙ্গে চলমান প্রকল্পগুলো সমাপ্ত হচ্ছে। অতি দ্রুতগতিসম্পন্ন বুলেট ও বৈদ্যুতিক ট্রেন চালুর প্রাথমিক কাজও শুরু হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে যে রেললাইন-সেতু রয়েছে তা স্বয়ংসম্পূর্ণ রাখতে না পারলে কোনো প্রকল্পেরই সুফল মেলবে না। ফলপ্রসূ হবে না আধুনিকায়নের।

সম্প্রতি দুর্ঘটনার পর লাইন-সেতু মেরামত সংস্কারের যে তৎপরতা দেখা যাচ্ছে, তা যেন দ্রুত হারিয়ে না যায়। লাইন-সেতু প্রতিদিন দেখভালের কথা যাদের, তারা যেন ‘নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে’ না থাকে।

এ সংস্কার যেন লোক দেখানো না হয়। যে কোনো দুর্ঘটনার পরই তৎপর হয়ে ওঠে রেলওয়ের সংশ্লিষ্টরা- এ যেন এক রকম স্থায়ী সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। এ সংস্কৃতি থেকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে।

রেলওয়ে মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. শাসছুজ্জামান যুগান্তরকে জানান, রেলপথমন্ত্রীর কঠোর নির্দেশনা রয়েছে কোথাও রেললাইন-সেতুতে ত্রুটি থাকলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার। কারও অবহেলা কিংবা দায়িত্বহীনতার কারণে ট্রেন ঝুঁকি নিয়ে চলতে পারে না।

ইতিমধ্যে আখাউড়া-সিলেট রেললাইন-সেতুতে কোন ধরনের ত্রুটি রয়েছে, সেগুলোর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহের জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেয়া হয়েছে। রেলওয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গোলাম মোস্তফাকে প্রধান করে গঠিত কমিটি দু-একদিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবে।

এদিকে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, কমলাপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত রেললাইন-সেতু মেরামত-সংস্কার করতে শতাধিক কর্মচারী দিন-রাত কাজ করছে। গত সপ্তাহে কমলাপুর

রেলস্টেশনের অদূরে খিলগাঁওস্থ লাইনের একটি পয়েন্ট ৪-৫ ইঞ্চি ফাঁকাসহ নাটবল্টু খোলা ছিল। পাশাপাশি এই লাইনের বিভিন্ন স্থানে শত শত নাটবল্টু, ক্লিপ, হুক খোলা থাকতে দেখা গেছে। এ অবস্থার সচিত্র প্রতিবেদন ২৯ জুন যুগান্তরে প্রকাশিত হয়। কিন্তু শুক্র ও শনিবার ওইসব স্থানে দেখা গেছে, খোলা থাকা অধিকাংশ নাটবল্টু, ক্লিপ ও হুক লাগানো হয়েছে। আর রেললাইনের যে পয়েন্টে ৪-৫ ইঞ্চি ফাঁকা ছিল, সেখানে নতুন লাইন বসিয়ে মেরামত করা হয়েছে। লাইনের বাকি সংস্কার কাজও চলছে দ্রুতগতিতে।

কমলাপুর-টঙ্গী রেলপথে কর্মরত ফোরম্যান আমির হোসেন শনিবার যুগান্তরকে জানান, পয়েন্টে ফাঁকা থাকা স্থানটুকু সংস্কার করা হয়েছে শুক্রবার মধ্যরাতে। এছাড়া ফিশপ্লেট কিংবা নাটবল্টু লাগানোর কাজও খুব সতর্কতার সঙ্গে করতে হয়। যে কাজগুলো জটিল তা মধ্যরাতের পর করতে হয়, যখন ট্রেন চলাচল করে না। এসব কাজ ভোররাতের আগেই শেষ করা হয়।

ভোররাতের পর ট্রেন চলাচল শুরু হয়, তখন এসব কাজ করা সম্ভব হয় না। কমলাপুর থেকে টঙ্গী পর্যন্ত প্রতিদিন শতাধিক কর্মচারী কাজ করছে জানিয়ে তিনি বলেন, রেলওয়ে কর্মচারীর সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক শ্রমিকরাও কাজ করছেন। কিছু কিছু স্থানে ট্রেন দাঁড় করিয়েও কাজ করতে হয়। ঊর্র্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনায় দ্রুত কাজ করতে হচ্ছে। কিছু কিছু নাটবল্টু, ক্লিপ, হুক কিংবা ফিশপ্লেট লাগাতে খুব একটা সময় লাগে না। আধুনিক মেশিন রয়েছে, যেগুলো ব্যবহার করে দ্রুত নাটবল্টুসহ অন্যান্য কাজ করা যায়। আমরা একই সঙ্গে যেসব স্থানে পাথর কম রয়েছে সেখানে পাথর দিচ্ছি।

এদিকে রেলওয়ে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মন্ত্রণালয় ও রেল বিভাগ থেকে কঠোর নির্দেশনার পর সংশ্লিষ্টরা মাঠ পর্যায়ে ব্যাপক হারে কাজ শুরু করেছে। রেলওয়ে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অবকাঠামো) আনোয়ারুল হক জানান, ত্রুটিযুক্ত সেতু চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে কিছু একেবারেই নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। কিছু সংস্কার করতে হবে।

মাঠ পর্যায়ে সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। লাইন ও সেতুর ওপর বিশেষ নজর সব সময়ই থাকে। কিন্তু সম্প্রতি ট্রেন দুর্ঘটনার পর লাইন-সেতুর অবস্থা দেখে আমরা উদ্বিগ্ন। এসব স্থানগুলো জরুরি ভিত্তিতে মেরামত করছি। লাইন-সেতুর কারণেই যে, সব সময় দুর্ঘটনা ঘটে তা নয়, জানিয়ে তিনি বলেন, মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন-বগিও যথাযথ সংস্কার করা হবে। সবকিছুই যত দ্রুত সম্ভব সম্পন্ন করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যেসব স্থানে নাটবল্টু, ক্লিপ, হুক, ফিশপ্লেট প্রায় সময়ই খোলা থাকে সেগুলো হচ্ছে- ঢাকা-সিলেট, সিলেট-চট্টগ্রাম, লাকসাম-চাঁদপুর, ভৈরব-কিশোরগঞ্জ, ঢাকা-ময়মনসিংহ, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী, জয়দেবপুর-ঈশ্বরদী-খুলনা, বঙ্গবন্ধু সেতু-রংপুর-পার্বতীপুর-পঞ্চগড়, রংপুর-লালমনিরহাট, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলপথ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে প্রকৌশলী বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা নতুন করে এসব সরঞ্জাম লাগিয়েও রাখতে পারছি না। এসব মূল্যবান সরঞ্জাম প্রতিনিয়তই চুরি হচ্ছে। চুরি রোধ তো প্রকৌশলী বিভাগের কেউ প্রতিরোধ করতে পারবে না। তিনি বলেন, নির্জন স্থানগুলোতেই সবচেয়ে বেশি চুরি হয়। এ ক্ষেত্রে ব্রিজগুলোতে থাকা সরঞ্জাম বেশি চুরি হয়। কারণ ব্রিজগুলো খাল-বিল এলাকায় বেশি থাকে। ঢাকা প্রকৌশলী বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-টঙ্গী পর্যন্ত লাইনেও সরঞ্জাম চুরি হয়। মাদকাসক্তরা এসব কাজ বেশি করছে। তাছাড়া লাইনের ওপর বাজার বসায়, বিভিন্ন ময়লা আবর্জনায় লাইনে মরিচা ধরছে। সরঞ্জাম নষ্ট হচ্ছে। খুলে যাচ্ছে।

অভিযোগ রয়েছে, প্রায় ৩ হাজার ৩৩৫ কিলোমিটার রেলপথের অধিকাংশ ব্রিজই জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করে সচল রাখার চেষ্টা করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিদ্যমান রেলপথ ও রেলসেতু সংস্কারে উৎসাহ কম রেলওয়ের কর্মকর্তাদের। বরং উচ্চ ব্যয়ে রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প গ্রহণেই বেশি উৎসাহী তারা। গত প্রায় সাড়ে ৯ বছরে ৪২টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ সম্পূর্ণ হয়েছে।

যার মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩শ’ নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হয়েছে। এসব উন্নয়নের সুফল দেখাতে পারছে না রেল। লাইন-সেতু ত্রুটির কারণে দুর্ঘটনা লেগেই আছে। এতে বিপুল পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে প্রাণহানি ঘটছে। যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। কোনো কোনো কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, রেলপথ-সেতু মেরামত, সংস্কারে বরাদ্দ থাকে নামমাত্র। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা নতুন প্রকল্প গ্রহণ বাস্তবায়নেই ব্যস্ত থাকেন।

সুত্র:যুগান্তর, ০৭ জুলাই ২০১৯


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।