ডাবল লাইন নির্মাণের দাবিতে চার মন্ত্রীর ডিও

ডাবল লাইন নির্মাণের দাবিতে চার মন্ত্রীর ডিও

ইসমাইল আলী: আখাউড়া-সিলেট মিটারগেজ রেলপথটি ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে। এ জন্য গত আগস্টে একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে সরকার। ডুয়েলগেজ হলেও সিঙ্গেল লাইনের কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়নেও ট্রেন চলাচল সক্ষমতা বাড়বে না। এ অবস্থায় আখাউড়া-সিলেট রেলপথটি ডুয়েলগেজের পাশাপাশি ডাবল লাইনে উন্নীতের দাবিতে আধা-সরকারি পত্র (ডিও লেটার) দিয়েছেন চারজন মন্ত্রী।

সম্প্রতি রেলপথমন্ত্রী বরাবর সিলেট বিভাগের চার মন্ত্রী ডিও লেটার দেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে আখাউড়া-সিলেট ডাবল লাইন নির্মাণের বিষয়ে রেলওয়ের মতামত চেয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

তথ্যমতে, আখাউড়া-সিলেট রেলপথটি ডাবল লাইন উন্নীতে গত আগস্টে ডিও দেন তিন মন্ত্রী। তারা হলেন সিলেট-১ আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেন; মৌলভীবাজার-১ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়কমন্ত্রী মো. শাহাব উদ্দিন এবং সিলেট-৪ আসনের সংসদ সদস্য ও প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান বিষয়কমন্ত্রী ইমরান আহমদ। গত ২৫, ২৬ ও ২৭ আগস্ট ডিও দেন এ তিন মন্ত্রী। একই দাবিতে গত ২৪ অক্টোবর ডিও দেন সুনামগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও পরিকল্পনামন্ত্রী এমএ মান্নান।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা থেকে আখাউড়া পর্যন্ত রেলপথ ডাবল লাইন রয়েছে। তবে আখাউড়া থেকে সিলেট অংশটি সিঙ্গেল লাইন রেলপথ। ফলে ঢাকা বা চট্টগ্রাম থেকে সিলেট রুটে ট্রেন চলাচল বৃদ্ধিতে এ অংশটি বড় প্রতিবন্ধক। এছাড়া রেলপথে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সিঙ্গেল লাইনের কারণে এ রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী দেশের সব রেলপথকে ডুয়েলগেজ ও ডাবল লাইনে উন্নীত করার বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন। তাই আখাউড়া-সিলেট রেলপথ ডুয়েলগেজের পাশাপাশি ডাবল লাইন নির্মাণ জরুরি।

তাদের মতে, সিঙ্গেল লাইন হওয়ায় ডুয়েলগেজে রূপান্তর প্রকল্পের আওতায় বিদ্যমান রেলপথের পাশে অস্থায়ী মিটারগেজ আরেকটি লাইন নির্মাণ করতে হবে। আর বিদ্যমান রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরের পর তা তুলে ফেলা হবে। এতে প্রচুর অর্থের অপচয় হবে প্রকল্পটিতে। অথচ প্রায় একই ব্যয়ে ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণ করা সম্ভব। এতে ভবিষ্যতে ডাবল লাইন নির্মাণ পৃথক কোনো প্রকল্প নিতে হবে না। তাই চার মন্ত্রীর দাবির বিষয়ে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

তথ্যমতে, আখাউড়া-সিলেট রেলপথ ডুয়েলগেজ রূপান্তর প্রকল্পের আওতায় ২৩৯ দশমিক ১৪ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথকে ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হবে। এর মধ্যে ১৭৬ দশমিক ২৪ কিলোমিটার মূল রেলপথ ও ৬২ দশমিক ৯০ কিলোমিটার লুপ লাইন রয়েছে। জিটুজি ভিত্তিতে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন কোম্পানি। দরপত্র ছাড়াই দরকষাকষির মাধ্যমে এ ঠিকাদার চূড়ান্ত করা হয়েছে।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৬ হাজার ১০৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। এতে কিলোমিটারপ্রতি যে ব্যয় পড়ছে, তা অন্যান্য প্রকল্পের কয়েকগুণ বেশি।

আখাউড়া-সিলেট মিটারগেজ রেলপথটি ডুয়েলগেজে রূপান্তরের চুক্তি মূল্য ধরা হয়েছে ১৪৯ কোটি ৭৬ লাখ ডলার। এর মধ্যে ৮৫ শতাংশ তথা ১২৭ কোটি ২৯ লাখ ডলার বা প্রায় ১০ হাজার ৬৫৪ কোটি ৩৬ লাখ টাকা ঋণ দেবে চীন। চুক্তি মূল্যের বাকি অর্থ ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ পাঁচ হাজার ৪৫০ কোটি আট লাখ বাংলাদেশ সরকার সরবরাহ করবে।

প্রকল্পটির ব্যয় বিশ্লেষণে দেখা যায়, রেলপথ নির্মাণে মূল ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ২৮৯ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। এর সঙ্গে দর সমন্বয় যুক্ত হবে ২৭ শতাংশ। আর অনিশ্চিত ব্যয় রয়েছে আরও দুই শতাংশ। রয়েছে অন্যান্য খাতের ব্যয়ও। সব মিলিয়ে নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ১৩ হাজার ৯৬৪ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়বে ৫৮ কোটি ৩৯ লাখ টাকা।

যদিও রেলওয়ের চলমান ও প্রক্রিয়াধীন সমমানের প্রকল্পগুলো ব্যয় অনেক কম। সম্প্রতি এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে শেয়ার বিজ। এতে দেখা যায়, চলমান কুলাউড়া-শাহবাজপুর রেলপথ ডুয়েলগেজ রূপান্তরে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। ৫২ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার এ রেলপথ রূপান্তর প্রকল্পে ব্যয়ে হবে ৫৪৪ কোটি ৮৬ লাখ ৭৭ হাজার ৬৪০ টাকা। ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর এ-সংক্রান্ত চুক্তি সই করা হয়। এ হিসেবে আখাউড়া-সিলেট রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তরে ব্যয় সাড়ে পাঁচগুণ বেশি পড়ছে।

নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ ব্যয়ও আখাউড়া-সিলেটের রূপান্তর ব্যয়ের চেয়ে অনেক কম। এর মধ্যে রয়েছে পার্বতীপুর থেকে কাউনিয়া পর্যন্ত ৬৬ দশমিক ৮৫ কিলোমিটার নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ। এতে ব্যয় হচ্ছে এক হাজার ১২ কোটি ৬২ লাখ টাকা। ফলে কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১৫ কোটি ১৫ লাখ টাকা।

আবার আখাউড়া থেকে লাকসাম পর্যন্ত বিদ্যমান ৯২ দশমিক ৩০ কিলোমিটার রেলপথ ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা হচ্ছে। পাশাপাশি নতুন আরও ৯২ দশমিক ৩০ কিলোমিটার ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ কাজের চুক্তি মূল্য তিন হাজার ৪৯৭ কোটি ৩১ লাখ টাকা। এতে নতুন রেলপথ নির্মাণসহ কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় পড়ছে ১৮ কোটি ৯৫ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আখাউড়া-সিলেট রেলপথ নির্মাণে অর্থের অপচয় করা হবে। কারণ অস্থায়ী রেলপথ নির্মাণ করে পরে তুলে ফেলা কখনোই যৌক্তিক নয়। বরং আখাউড়া-লাকসাম প্রকল্পের মতো প্রথমে নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ করে পরে বিদ্যমান মিটারগেজ রেলপথটি ডুয়েলগেজে রূপান্তর করা যেত। এজন্য প্রকল্পটি ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন নির্মাণে কয়েক দফা প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা মানা হয়নি। বরং জোর করে সিঙ্গেল লাইন প্রকল্পই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

সুত্র:শেয়ার বিজ, ডিসেম্বর ১৩, ২০১৯

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।