হাইস্পিড ট্রেন চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

হাইস্পিড ট্রেন চালুর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

ইসমাইল আলী: ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত হাইস্পিড ট্রেন চালু করতে চায় রেলওয়ে। এজন্য সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। পাশাপাশি প্রকল্পটির জন্য বিনিয়োগকারীও খোঁজা হচ্ছে। তবে চট্টগ্রামের পরিবর্তে কক্সবাজার পর্যন্ত হাইস্পিড ট্রেন চালুর নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ঢাকা থেকে পায়রা বন্দর পর্যন্তও হাইস্পিড ট্রেন লাইন নির্মাণের নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো এক চিঠিতে সম্প্রতি এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। এতে বলা হয়, গত ৫ মার্চ একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) সভায় প্রধানমন্ত্রী উল্লিখিত অনুশাসন প্রদান করেছেন। অনুশাসনটি হলো‘ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার এবং ঢাকা-পায়রা বন্দর হাইস্পিড ট্রেন লাইন নির্মাণের বিষয়ে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’

জানতে চাইলে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড ট্রেন লাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্পের পরিচালক মো. কামরুল আহসান শেয়ার বিজকে বলেন, বিষয়টি শুনেছি, তবে লিখিত নির্দেশনা পাইনি। ফলে এখনই এ বিষয়ে কিছু বলা যাচ্ছে না।
যদিও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে গত ২৫ মার্চ রেলওয়েকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা দেয় রেলপথ মন্ত্রণালয়। তবে বিষয়টি নিয়ে জটিলতার মুখে পড়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

সংস্থাটির একাধিক কর্মকর্তা এ বিষয়ে বলছেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা নিয়ে কিছুটা জটিলতা সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন লাইন নির্মাণে এরই মধ্যে সম্ভাব্যতা যাচাই সম্পন্ন হয়ে গেছে। এতে চারটি রুট প্রস্তাব করা হয়েছে। এর থেকে চূড়ান্ত রুট নির্ধারণে প্রধানমন্ত্রীর মতামত চেয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে গত ফেব্রুয়ারিতে। এছাড়া রেললাইনটির বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে। এখন কক্সবাজার পর্যন্ত নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই করতে গেলে ঢাকা-চট্টগ্রাম অংশটি ঝুলে যাবে। এক্ষেত্রে প্রথম পর্যায়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার পর্যন্ত হাইস্পিড ট্রেন চালু করা যেতে পারে। বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। তাদের পরামর্শের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে গত জানুয়ারিতে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন জমা দেয় পরামর্শক প্রতিষ্ঠান। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথের জন্য চারটি সম্ভাব্য রুট চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলোর প্রথমটি হলোÑঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও ফেনী হয়ে চট্টগ্রাম। দ্বিতীয় রুটটি ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, লাকসাম ও ফেনী হয়ে চট্টগ্রাম প্রস্তাব করা হয়েছে। তৃতীয় রুটটি ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ, ফেনী হয়ে চট্টগ্রাম এবং চতুর্থটি ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ, লাকসাম ও ফেনী হয়ে চট্টগ্রাম পর্যন্ত নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
হাইস্পিড রেলপথে রুট চূড়ান্ত না হলেও প্রথম দুটিকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে রেলওয়ে। কারণ কুমিল্লায় স্টেশন না থাকায় তৃতীয় ও চতুর্থ রুটে যাত্রী কমে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তবে রুট চূড়ান্তের ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মতামতই চূড়ান্ত বলে জানান সংশ্লিষ্টরা
সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনে চারটি রুটের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে প্রথম রুটের দৈর্ঘ্য হবে ২২৭ দশমিক তিন কিলোমিটার, দ্বিতীয় রুটের ২৩২ দশমিক ৯, তৃতীয় রুটের ২২২ দশমিক আট ও চতুর্থ রুটের ২২০ দশমিক চার কিলোমিটার। প্রথম রুটে সবচেয়ে বেশি জমি প্রয়োজন হবে। আর সবচেয়ে কম জমি লাগবে চতুর্থ রুটে।
চারটি রুটের মধ্যে প্রথম, তৃতীয় ও চতুর্থ রুটে ছয়টি করে স্টেশন নির্মাণ করতে হবে। আর দ্বিতীয় রুটের ক্ষেত্রে স্টেশন হবে সাতটি, যদিও এক্ষেত্রে কুমিল্লা থেকে লাকসাম অংশটিতে কিছুটা জটিলতা রয়েছে। তবে ১০টি সূচকের ভিত্তিতে প্রথম রুটটি তথা ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী হয়ে চট্টগ্রাম করিডোরে হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণের জন্য সুপারিশ করেছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।
এদিকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বর্তমানে চলমান ও সম্প্রতি নির্মিত হাইস্পিড রেলপথের তুলনা দেখানো হয় প্রতিবেদনে। এক্ষেত্রে ঘণ্টায় ২৫০ ও ৩০০ কিলোমিটার গতির রেলপথ নির্মাণব্যয় ও কারিগরি দিকের তুলনা দেখানো হয়েছে। আধুনিক প্রযুক্তি ও ব্যয় তুলনামূলকভাবে খুব বেশি না হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের জন্য ঘণ্টায় ৩০০ কিলোমিটার গতির রেলপথ নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে ট্রেনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যেতে অনেকটা পথ ঘুরতে হয়। এতে ৩২১ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হয়। তবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালুর জন্য প্রস্তাবিত রেলপথের দৈর্ঘ্য হবে সর্বোচ্চ ২৩৩ কিলোমিটার। এতে হাইস্পিড ট্রেনের গতি ৩০০ কিলোমিটার হলে মাত্র ৫৭ মিনিটেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়া যাবে। আর প্রতি স্টেশনে দুই মিনিট করে বিরতি ধরলে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোরে যাতায়াতে সময় লাগবে সর্বোচ্চ ৭৬ মিনিট। যদিও বর্তমানে এ রুটে সাধারণ ট্রেনে যাতায়াতে কমপক্ষে ছয় ঘণ্টা সময় লাগে।

প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আগামী বছর নির্মাণ শুরু করলে ২০২৫ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালু করা যাবে। যাত্রী চাহিদা মেটাতে সে বছর ৪৫ জোড়া ট্রেন পরিচালনা করা যাবে। চাহিদা বাড়লে পর্যায়ক্রমে তা বেড়ে হবে ২০৩০ সালে ৫০ জোড়া, ২০৩৫ সালে ৬০ জোড়া, ২০৪০ সালে ৯৮ জোড়া ও ২০৪৫ সালে ১৪৪ জোড়া।
রুট চূড়ান্ত না হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণের চূড়ান্ত ব্যয় প্রাক্কলন করতে পারেনি পরামর্শকরা। বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের সময় এক্ষেত্রে সম্ভাব্য ব্যয় চূড়ান্ত করা হবে। তবে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত হাইস্পিড ট্রেন নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ৬০ হাজার কোটি টাকা হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আর কক্সবাজার পর্যন্ত নির্মাণ করতে গেলে এ ব্যয় এক লাখ কোটি টাকায় দাঁড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণের পর বিদ্যমান ঢাকা-চট্টগ্রাম লাইনটি কমিউটার ও লোকাল ট্রেন এবং পণ্যবাহী বিভিন্ন ট্রেন পরিচালনার কাজে ব্যবহার করা হবে বলে জানান তারা।
উল্লেখ্য, ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ে যৌথভাবে কাজ করছে চায়না রেলওয়ে ডিজাইন করপোরেশন ও বাংলাদেশের মজুমদার এন্টারপ্রাইজ।

সুত্র:শেয়ার বিজ, এপ্রিল ৫, ২০১৯

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।