নিরাপদ ট্রেন ভ্রমণ কি সম্ভব নয়!

নিরাপদ ট্রেন ভ্রমণ কি সম্ভব নয়!

রাজীব নন্দী :
ভাবুন, আপনি ট্রেনের অপেক্ষায় বসে আছেন স্টেশনে। হঠাত্ স্টেশন-মাস্টার হ্যান্ডমাইক দিয়ে বলতে লাগলেন, ‘আজকে যে ট্রেনে ভ্রমণ করতে যাচ্ছেন সে ট্রেনের কেউ না কেউ পথিমধ্যে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাবে কিংবা মারাত্মকভাবে আহত হবে।’ আপনি জেনেশুনে নিশ্চয়ই সেই মৃত্যুফাঁদে ভ্রমণ করতে চাইবেন না। প্রয়োজনে যাত্রা বিরতি দিবেন কিংবা অন্য কোনো পথ বেছে নিবেন। কিন্তু কোনো স্টেশন-মাস্টার আমাদের হুঁশিয়ারি না দিলেও প্রতিনিয়ত এমন ঘটনাই ঘটে চলেছে আমাদের দেশে। নিরাপদ ট্রেন ভ্রমণের কথা যেন আমরা ভাবতেই পারি না।

উন্নয়নের মহাসড়কে যখন দেশ, যখন দেশের জিডিপি হুহু করে বাড়ছে, শিক্ষার হারও বাড়ছে ক্রমান্বয়ে, দেশের মাটি ছেড়ে আমরা এখন মহাশূন্যে রাজত্ব করতে শিখে গেছি, দেশে বিদেশে আমাদের সুনাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। জাতি হিসেবে আমরা যেখানে দিনদিন সভ্যতার চর্চা করে যাচ্ছি আর সেখানেই উলটো আদিম মানুষের মতো আচরণ করছে এক দল বিকৃত রুচির মানুষ। কুয়োতে ব্যাঙের গায়ে ঢিল নিক্ষেপ করে মজা নেওয়া একদল দুষ্টু ছেলের গল্প আমরা শুনেছি কিন্তু চলন্ত ট্রেনে বিনা কারণে পাথর ছুড়ে মেরে পৈশাচিক আনন্দ পাওয়ার ঘটনা কেবল আমাদের দেশেই ঘটে। এটা যেন সভ্যতার ভেতর এক খণ্ড অসভ্যতা। পৃথিবীর আর কোনো দেশে এরকম বিকৃত রুচির নজির নাই।

৩০ এপ্রিল। বেলা ১১টা। বরাবরের মতো সেদিনও ট্রেনের টিকেট চেক করছিলেন টি আই সিকদার বায়েজিদ। ট্রেনটি খুলনার দৌলতপুর স্টেশনের কাছে এলেই হঠাত্ একটি পাথর ছুটে এসে তার মাথায় আঘাত করলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি জ্ঞান হারান। বর্তমানে তিনি রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছেন। ২০০৪ সালে ৮ অক্টোবর আন্তঃনগর ট্রেনে আখাউড়া থেকে সিলেট যাওয়ার পথে রাধানগর ঘোষপাড়ার সঞ্জিত কুমার বিশ্বাসের পথে ছোড়া পাথরের আঘাতে দুটি চোখই নষ্ট হয়ে যায়। বিনা দোষে তাঁকে বরণ করে নিতে হয় আজীবন অন্ধত্ব। ২০১৩ সালের ১৩ আগস্ট সীতাকুণ্ডে পাথরের আঘাতে মারা যান প্রীতি দাশ নামক এক প্রকৌশলী। নিভে যায় তার জীবন প্রদীপ। একদল অসভ্য মানসিক বিকৃতির জন্য এভাবেই সঞ্জিব-প্রীতিদের স্বপ্নের তরি ডুবে যায়। পরিবারকে বেঁচে থাকতে হয় বুকে কষ্টের পাথর চেপে। শুধু এই সঞ্জিত এবং প্রীতি নন, এক বছরে যাত্রী ও স্টাফসহ প্রায় ২০০ জন আহত হয়েছে বলে জানান রেল সচিব। তিনি আরো ভয়াবহ তথ্য দেন যে, এক বছরে কেবল পাথর নিক্ষেপের ফলে রেলওয়ের ক্ষতির হিসেব গুনতে হয়েছে ১ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

নিরাপদ ট্রেন ভ্রমণ নিশ্চিত করতে এই কালপ্রিটদের খুঁজে বের করে প্রচলিত আইনের আওতায় আনতে না পারলে এই অসভ্যতা সহ্য করেই যেতে হবে। না হয় আনন্দ ভ্রমণ কখন যে আমাদের অশ্রুপাত করায় তার কোনো ঠিক নেই। আর যেন কোনো সঞ্জিত, প্রীতি কিংবা বায়েজিদকে এভাবে নির্মমতার শিকার না হতে হয় সেটাই আমাদের কামনা।

সুত্র:ইত্তেফাক, ৩০ মে, ২০১৮

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।