রেলপথের উন্নয়ন কবে হবে?

রেলপথের উন্নয়ন কবে হবে?

রংপুর-কুড়িগ্রামে রেলের উন্নতি কেউ দেখেনি। শুধু অবনতিই দেখেছে। সরকার যায় সরকার আসে। কখনো কখনো প্রতিশ্রুতিও পাওয়া যায়। কিন্তু রংপুরের রেলে উন্নতির হাওয়া লাগে না। ২০১৬ সালে বাংলাদেশ সরকার ভারত ও ইন্দোনেশিয়া থেকে ২৭০টি লাল-সবুজ বগি কিনেছিল। তখন রংপুরবাসীর মনে আশা জেগেছিল, বিভাগীয় শহরের জেলা হিসেবে রংপুরও নিশ্চয়ই লাল-সবুজ বগি পাবে। আবার এই আশঙ্কাও ছিল, রংপুর লাল-সবুজ বগি না–ও পেতে পারে। আর এই আশঙ্কা থেকে ওই সময়ে প্রথম আলোয় ‘লাল-সবুজ বগি কি রংপুর পাবে?’ শিরোনামে একটি নিবন্ধ লিখেছিলাম। রংপুরবাসীকে আশাহত করে আশঙ্কাই সত্যি হয়েছিল। রংপুরকে লাল-সবুজ বগি দেওয়া হয়নি।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে রংপুর-কুড়িগ্রাম কখনোই নতুন ট্রেন পায়নি, এ রকম কথা প্রচলিত আছে। কখনো নতুন ট্রেন এই পথে চলেছে, এমন কথা কেউই স্মরণ করতে পারেন না। চারণ সাংবাদিক মোনাজাতউদ্দিন চিলমারীর এক যুগ গ্রন্থে ১৯৮২-৮৩ সালের রেল যোগাযোগ সম্পর্কে অনেক ঘটনা লিখেছেন। রংপুর-চিলমারী রেলপথে কী রকম ট্রেন দেওয়া হতো ওই সময়, সে সম্পর্কে তিনি লিখেছেন, ওয়ার্কশপে নেওয়ার মতো অবস্থাও অবশিষ্ট নেই, এমন গাড়িগুলো দেওয়া হয় এই লাইনে। এখনো সেই অবস্থার কোনো পরিবর্তন হয়নি।

রংপুর থেকে ঢাকা যাওয়ার দুটি ট্রেন ছিল। চারদলীয় জোট সরকারের সময় সেগুলো বন্ধ করা হয়েছে। মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে রংপুর এক্সপ্রেস চালু হয়। শোনা যায়, তখন রংপুরের জন্য বিদেশ থেকে একটি নতুন ইঞ্জিনও নিয়ে আসা হয়েছিল। সেটি অন্য রুটে দিয়ে অচল একটি ট্রেন রংপুরের জন্য দেওয়া হয়েছে। সেই ইঞ্জিন মাঝেমধ্যে এতটাই ধীরে চলে যে যথাসময়ে ঢাকায় পৌঁছাতে পারে না। কখনো কখনো দুটি অচল ট্রেন দিয়ে একটির কাজ চালাতে হয়।

দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে চিলমারী একটি ট্রেন চলে। ট্রেনটির অবস্থা আজ অবধি ভালো হয়নি। এই ট্রেন সম্পর্কে মোনাজাতউদ্দিন উল্লিখিত গ্রন্থে ওই সময়ের একটি পত্রিকার কার্টুনের কথা উল্লেখ করেছেন। কার্টুনটি হচ্ছে, ট্রেন থেকে এক যাত্রী বলছেন, ‘বুড়িমা, হেঁটে যাচ্ছ কেন? ট্রেনে উঠে এসো।’ বুড়ি বলছেন, ‘আমার সময় কম বাবা, তোমাদের আগেই আমাকে চিলমারীতে যেতে হবে।’ প্রায় চার দশকে বাংলাদেশের উন্নতি হয়েছে ব্যাপক। কিন্তু এই রেলপথের তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। ‘কাঞ্চন মেইল’ নামে একটি ট্রেন রংপুর থেকে কুড়িগ্রামে চলত। সেটিও বন্ধ করা হয়েছে। রংপুর থেকে সোজা বগুড়া পর্যন্ত একটি রেললাইন অত্যন্ত জরুরি। কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি। ফলে দীর্ঘ পথ ঘুরে বগুড়া-ঢাকা যেতে হয়।

শুধু যে পুরোনো আর অচল ট্রেন দেওয়া হয় এসব অঞ্চলে তা নয়। ট্রেনের ব্যবস্থাপনার দশাও করুণ। সম্প্রতি ট্রেনে রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলায় গিয়েছিলাম। আমার সঙ্গে দুজন শিক্ষার্থী ছিল। আমরা রংপুর রেলস্টেশনে ট্রেনে ওঠার জন্য টিকিট করি। আমাদের কাছে টিকিট কাউন্টারেই ভাড়া বেশি নিয়েছিল। স্টেশনমাস্টার সেই টাকা ফেরত দেওয়ার ব্যবস্থা করেন। ট্রেনে ওঠার পরই লক্ষ করলাম ইউনিফর্ম ছাড়া একজন টিকিট চেক
করছেন। যাদের টিকিট নেই, তাদের কাছ থেকে টাকা নিচ্ছেন। তিনি নিজেকে রেলের ইলেকট্রিশিয়ান বলে পরিচয় দেন। কেন তিনি টিকিট পরীক্ষা করছেন আর কেনই–বা রসিদ ছাড়া টাকা নিচ্ছেন, এসব কথা জিজ্ঞাসা করতেই তিনি দ্রুত আমাদের কাছ থেকে সটকে পড়েন।

রংপুরে শুধু মিটারগেজ লাইন আছে। সরকার এই লাইন পার্বতীপুর থেকে রংপুরের কাউনিয়া পর্যন্ত ডুয়েলগেজে সম্প্রসারিত করার প্রকল্প গ্রহণ করেছে অনেক দিন আগে। সেই লাইন স্থাপনের জন্য টেন্ডার হয়েছে প্রায় দুই বছর আগে। কিন্তু তার কোনো কাজ আজও দৃশ্যমান হয়নি। রংপুর থেকে ঢাকাগামী একটি দিবাকালীন ট্রেনের দাবি দীর্ঘদিনের। সেই দাবি এখনো সরকার আমলে নেয়নি। রংপুর বিভাগীয় শহর। যাত্রীও অনেক। কিন্তু রংপুর থেকে একটি ট্রেনই চলাচল করছে। অথচ দেশে প্রচুর নতুন ট্রেন চালু হয়েছে। বিভাগীয় শহর এবং যাত্রীর সংখ্যা বিবেচনা করলে বর্তমানে যে স্টেশনটি আছে, তা–ও অনুপযুক্ত।

দীর্ঘদিন ধরে গণকমিটি নামের একটি সংগঠন ‘ভাওয়াইয়া এক্সপ্রেস’ নামে একটি ট্রেন ঢাকা-কুড়িগ্রাম রুটে চালু করার দাবিতে আন্দোলন করে আসছে। সরকারও সম্প্রতি কুড়িগ্রাম-ঢাকা একটি ট্রেন চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম বা দ্বিতীয় সপ্তাহে এই ট্রেন চালু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রেনের নাম যেটাই হোক না কেন, কুড়িগ্রাম থেকে ঢাকাগামী একটি ট্রেন চালু হচ্ছে, এটা আশাজাগানিয়া।

প্রতিশ্রুত ট্রেনটি অবশ্যই কুড়িগ্রামের চিলমারী থেকে চালু হওয়া জরুরি। চিলমারীতে সরকার নৌবন্দরটি পুনরায় চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। চিলমারী বন্দর থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, মেঘালয় খুব কাছে। ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্য এই বন্দর ব্যবহার করতে পারবে। সে জন্য নতুন ট্রেনটি চিলমারী পর্যন্ত চালু হওয়া প্রয়োজন। এই দাবিতে চিলমারীতে গণকমিটি মানববন্ধন করেছে, সরকারের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে গরিব জেলা কুড়িগ্রাম। ফলে ট্রেনটিতে যেন সাধারণেরা যাতায়াত করতে পারে, সেই চিন্তাও রাখা প্রয়োজন। রংপুর এক্সপ্রেসে যখন শোভন শ্রেণি ছিল, তখন গরিব সাধারণেরাও যাতায়াত করতে পারত। এখন আর পারছে না। বর্তমানে যে ট্রেনটি চলছে তাতে শোভন শ্রেণি নেই। ফলে গরিব যাত্রীদের কষ্ট হয়। বাসের চেয়ে এখন ট্রেনে ভাড়া বেশি। রংপুর-কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট থেকে ঢাকাগামী রেলব্যবস্থাকে ধ্বংস করার জন্য এটি অপচেষ্টা। কুড়িগ্রাম থেকে যে ট্রেন চলবে, তাতে গরিব সাধারণেরা যেন উঠতে পারে, সে জন্য তাদের ভাড়া অবশ্যই যাত্রীদের সামর্থ্যের মধ্যে থাকা বাঞ্ছনীয়।

কুড়িগ্রাম থেকে একটি ট্রেন চালু হচ্ছে, এটা সুসংবাদ। কিন্তু সেই ট্রেন কি রংপুর এক্সপ্রেসের মতো হবে কি না, কে জানে। কুড়িগ্রাম বাংলাদেশে রেল যোগাযোগ চালু হওয়ার পর এই প্রথম ঢাকাগামী একটি ট্রেন পাচ্ছে। আমরা চাই সেই ট্রেনটি যেন লক্কড়ঝক্কড় কোনো ট্রেন না হয়। রংপুর বিভাগের কোনো জেলারই রেলব্যবস্থা উন্নত নয়। রংপুরের রেল যোগাযোগ উন্নত করার জন্য সরকারের সদিচ্ছাই যথেষ্ট।

তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক এবং নদীবিষয়ক সংগঠন রিভরাইন পিপলের পরিচালক

wadudtuhin@gmail.com

সুত্র:প্রথম আলো, ৩১ আগস্ট ২০১৯

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।