যোগাযোগ ব্যবস্থায় রেল হোক যথার্থ গণপরিবহন

যোগাযোগ ব্যবস্থায় রেল হোক যথার্থ গণপরিবহন

আকাশপথে দ্রুত গতি পাওয়া যায়, কিন্তু খরচ বেশি; সবচেয়ে কম খরচ জলপথে, কিন্তু স্বল্প গতি। আর সবচেয়ে সহজ সড়কপথ নির্র্মাণ, কিন্তু রয়েছে পরিবহন ঝুঁকি, দূষণ আর অহরহ দুর্ঘটনা। অন্যদিকে গতি, খরচ, আর নিরাপত্তা সব মিলিয়ে রেলওয়ে কার্যকর পরিবহন। এজন্যই সারা বিশ্ব রেলকে প্রধান মাধ্যম হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে গড়ে তুলছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। শুধু দীর্ঘ লাইন নির্মাণই নয়, পাতাল রেল, রোপ ট্রেন, শাটল ট্রেনসহ নানা ধরনের ট্রেন দিয়ে বিশ্বের প্রায় সব দেশই ইন্ট্রাসিটি, ইন্টারপ্রভিন্স ও ইন্টারকান্ট্রি যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলছে। কোনো দেশে আবার বিমানের গতির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চালু করা হয়েছে দ্রুতগামী ট্রেন। পৃথিবীর কোনো দেশেই রেল উপেক্ষিত নয়, বরং রেলের অগ্রগতিতে বেশি মনোনিবেশ করা হয়েছে।

আর আমরা দীর্ঘদিন যোগাযোগ ব্যবস্থায় রেলকে অবেহেলা করেছি। অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা, সুষ্ঠু রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, সরকারিভাবেই বিমাতাসুলভ আচরণের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি নানা ষড়যন্ত্রের বেড়াজালে বন্দি হয়ে সম্ভাবনাময় রেলওয়ে খাতটি বারবার মুখ থুবড়ে পড়ে। সময়ের চাহিদানুযায়ী উন্নয়নের উদ্যোগ না নেয়ায় গৌরবময় রেল রীতিমতো অভিশাপ হয়ে উঠেছিল।

১৮৬২ সালে সোনার চামচ (ব্রডগেজ লাইন) মুখে দিয়ে যাত্রা শুরু করার পর নানা বাঁক পেরিয়ে প্রায় ১৬০ বছরের ইতিহাস আমাদের রেলওয়ের। কখনও আসাম-বাংলা রেলওয়ে, কখনও পূর্ব বাংলা রেলওয়ে হয়ে অবশেষে ১৯৭১ সালের পর বাংলাদেশ রেলওয়ে। রেলকে সুপরিকল্পিতভাবে এদেশের প্রধান যাতায়াত মাধ্যম হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সুস্পষ্ট দিকনির্দেশনা প্রদান করা হয়, যার মধ্যে রোলিং স্টক সমৃদ্ধ করা, রেলের প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা, রোলিং স্টক উৎপাদন, যমুনা নদীর ওপর রেলসেতু, ভৈরব নদীর ওপর রেলসেতু নির্মাণ, ঢাকা-চট্টগ্রাম বৈদ্যুতিক রেল চালু এবং কারখানা আধুনিকায়ন উল্লেখযোগ্য।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় কর্তৃক সড়কপথের প্রতি অতি মনোযোগ রেলব্যবস্থাকে সংকটের দিকে ঠেলে দেয়। আশির দশক থেকে এই বাহন সরকার এবং উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে রূপকথার দুয়োরানির ভূমিকায় চলে যায়। ক্রমাগতভাবে অবহেলা আর ভুল পরিকল্পনায় রেল খাত বহুদিন থেকে যখন মুমূর্ষু দশায় আটকে ছিল, ঠিক সে সময় রেল খাতের সম্ভাবনাকে অঙ্কুরিত করার জন্য পৃথক মন্ত্রণালয়ের দাবি ছিল অনেকের। পরিশেষে ২০১১ সালের ৪ ডিসেম্বর স্বতন্ত্র মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত দেশের প্রথম রেলমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। একদিকে নতুন মন্ত্রণালয়, অন্যদিকে লোকবল সংকট, রেল ইঞ্জিন, কোচ ও সরঞ্জাম সংকটে থাকা রেলওয়ের সমস্যা বুঝতে মোটেও কষ্ট হয়নি প্রবীণ এই রাজনীতিবিদের। নিজেকে শেষ ট্রেনের যাত্রী হিসেবে চিহ্নিত করে নতুন মন্ত্রণালয়ের ‘রোডম্যাপ’ জনগণের সামনে তুলে ধরেন। শুরুতেই তিনি রেলওয়েতে নিয়মানুবর্তিতা প্রতিষ্ঠা অর্থাৎ ট্রেনের সময়সূচির প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বলেছিলেন, ‘গরুর গাড়ির গতিতে নয়, রেল চলবে রেলগাড়ির গতিতে। তার দৃঢ় পদক্ষেপের কারণেই আন্তঃনগর ট্রেনগুলো সময়সূচি মেনেই ছাড়তে শুরু করে। ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা ৪০ থেকে ৮০ শতাংশে উন্নীত হয়।

এরপর রেলপথ মন্ত্রণালয়ে একের পর এক মন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেছেন। প্রধানমন্ত্রী রেলবান্ধব হিসেবে নিজেকে পরিচয় দিয়ে প্রতিবছর রেলে বরাদ্দ বাড়িয়ে দিয়েছেন। ২০০৯ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর রেলের উন্নয়নে বরাদ্দ করেছিল এক হাজার ১০৭ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরের রেল বাজেট ১৭ হাজার ৪৮৬ কোটি টাকা। গত ১৩ বছরে মোট বরাদ্দ প্রায় এক লাখ দুই হাজার কোটি টাকা। কিন্তু বরাদ্দ বৃদ্ধির সঙ্গে তাল রেখে পরিকল্পিতভাবে এগোতে পারেনি রেলওয়ে। রেল বাজেট বৃদ্ধি, রেললাইন, লোকোমোটিভ ও কোচ বৃদ্ধিসহ হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প সম্পন্ন হয়েছে, কিন্তু এর তেমন কোনো সুফল মিলছে না। রেলের দুটি লাইন সমান্তরালভাবে বয়ে গেলেও আয় ও ব্যয়ের হিসাব গানের মতোÑ‘আজ দুজনার দুটি পথ ওগো দুটি দিকে গেছে বেঁকে।’ মেয়াদোত্তীর্ণ রোলিং স্টক, জড়াজীর্ণ রেলকারখানা, লোকবল সংকট, সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারা, টিকিট পেতে ভোগান্তি, অপরিচ্ছন্ন স্টেশন আর ট্রেন এ অবস্থা থেকে বের হতে পারছে না রেলওয়ে।

সঠিক পরিকল্পনার অভাব, ভুলনীতি, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার কারণে মন্ত্রাণালয় প্রতিষ্ঠার যে উদ্দেশ্যে ছিল তা ব্যাহত হচ্ছে। শোনা যায়, ভূত নাকি পেছনে হাঁটে, সামনে চলতে পারে না। বাংলাদেশ রেলওয়ের অবস্থাটা তা-ই। সব রকম উপযোগিতা থাকার পরও বাংলাদেশে রেলওয়ে আর যেন সামনে এগোতে পারছে না।

লোকবল সংকট: বাংলাদেশ রেলওয়ের জনবল সংকট দিন দিন বাড়ছে। দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মী ও কর্মকর্তা নিয়োগ না হওয়ায় এ নাজুক পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে যারা কাজ করে রেল পরিচালনা ব্যবস্থাকে সচল রাখেন, তাদের সংখ্যা খুবই কম। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে ২০২০ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ শ্রেণি পর্যন্ত মঞ্জুর করা জনবল দুই হাজার ৫৩৭ জন। কর্মরত আছেন মাত্র এক হাজার ৩১২ জন। এক হাজার ২২৫ জনের পদ শূন্য। তৃতীয় শ্রেণির মঞ্জুর করা জনবল এক হাজার ২৯৫ জন। কর্মরত আছেন মাত্র ৭৩৯ জন। জনবল সংকটের কারণে রেলের পরিচালন, রক্ষণাবেক্ষণ, মেরামত, দাপ্তরিক কার্যক্রম সবকিছুই ব্যাহত হচ্ছে। অপরদিকে রেলপথ সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত ওয়েম্যান-গেটম্যান-ট্রলিম্যান-গ্যাংম্যানরা যথাযথভাবে কাজ না করায় এবং তাদের মনিটরিং ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় রেলপথ আরও অরক্ষিত হয়ে পড়ছে।

রেলওয়ের জমি: গ্রামাঞ্চলে একটি বহুল প্রচলিত প্রবাদ হলো‘গরিবের সুন্দরী বউ সবার ভাবী।’ আর বাংলাদেশ রেলওয়ের বিশাল ভূ-সম্পত্তি সেই সুন্দরী বউয়ের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের মোট জমির পরিমাণ ৬১ হাজার ৮৬০ একর। অবৈধ দখলে থাকা জমির পরিমাণ প্রায় তিন হাজার ৫৮৩ একর। এর মধ্যে পূর্বাঞ্চলে ৬৭০ ও পশ্চিমাঞ্চলে দুই হাজার ৯১৩ একর জমি অবৈধ দখলে রয়েছে। রেলওয়ের জমি নিয়ে দেশজুড়ে চলছে দখল বাণিজ্য, ইজারা জালিয়াতি, ইজারা নিয়ে লাইসেন্স ফি বা মাশুল না দেয়া, বছরের পর বছর ধরে জমি ফেলে রাখা ও একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারীর অদক্ষতা, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে রাষ্ট্রের এই বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি অবৈধ দখলে যেমন চলে যাচ্ছে, তেমনি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না রেলের প্রায় এক হাজার ৮৭১ একর জমি। অথচ কমলাপুর, বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম ও রাজশাহী স্টেশনগুলো বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহার করা সম্ভব।

রেল কারখানা: রেল কারখানা হচ্ছে রেলের হৃৎপিণ্ড। আজ দেশের কারখানাগুলো বছরের পর বছর জনবল, অর্থ ও প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সংকট এবং যুগোপযোগী পরিকল্পনার অভাবে মৃতপ্রায়। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান তিনটি কারখানা সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, পার্বতীপুর কেন্দ্রীয় লোকোমোটিভ কারখানা এবং পাহাড়তলী ক্যারেজ ও ওয়াগন কারখানায় গড়ে প্রায় ৬০ শতাংশ জনবল ঘাটতি রয়েছে। পাশাপাশি বাজেট ঘাটতি, যন্ত্রাংশের স্বল্পতা, আধুনিক মেশিনের অভাব এবং অনিরাপদ কাজের পরিবেশের কারণে রেল কারখানাগুলোর উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। পাহাড়তলী ক্যারেজ ও ওয়াগন কারখানায় ৪৩১টি মেশিনের মধ্যে ২০০টিরও বেশি মেশিন মেয়াদোত্তীর্ণ এবং সৈয়দপুর কারখানায় ৭৮৭টি মেশিনের মধ্যে ৫০ বছরের ঊর্ধ্বে ব্যবহৃত রয়েছে ৪৪৮টি মেশিন। পার্বতীপুর ডিজেল লোকোমোটিভ করাখানায় একসময় মঞ্জুরীকৃত পদ ছিল ৫৭৫ জন। এখন করা হয়েছে ২৯৯ জন। তার মধ্যে কর্মরত আছেন মাত্র ১২৭ জন। সৈয়দপুর রেলকারখানায় মঞ্জুরীকৃত জনবলের সংখ্যা তিন হাজার ৯০২ জন। কিন্তু কর্মরত আছেন এক হাজার ৬২৩ জন। ২০২১ সালে ১৫০ জন অবসরে যাবে। রেলওয়ের মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ৩০ বছরে যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের জন্য ৪৭৪টি ইঞ্জিন, পাঁচ হাজার ১৪৩টি কোচ ও ছয় হাজার ৪৩৯টি ওয়াগন কিনতে হবে। এজন্য নতুন করে ১০টি ওয়ার্কশপ নির্মাণ করতে হবে। পাশাপাশি বিদ্যমান চারটি ওয়ার্কশপের সংস্কার ও আধুনিকায়ন করতে হবে। পর্যাপ্ত বাজেট, প্রয়োজনীয় জনবল, আধুনিক মেশিনারিজ এবং চাহিদা অনুযায়ী কাঁচামাল সরবরাহ করা গেলে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ লোকোমোটিভ, ক্যারেজ এবং ওয়াগন মেরামত করে ক্রমবর্ধমান চাহিদা মোকাবিলা করা সম্ভব। এমনকি বিদেশে রপ্তানি করার মতো ক্যারেজ, লোকোমোটিভ এবং ওয়াগন তৈরি করা সম্ভব।  কাজেই রেলকারখানার আধুনিকায়ন না করে অন্ধকারে রেখে রেলের উন্নয়ন সম্ভব নয়।

মেয়াদোত্তীর্ণ রেলওয়ের রোলিংস্টক: বাংলাদেশ রেলওয়েতে বর্তমানে ২৬৩টি লোকোমোটিভের মধ্যে ১৭১টি এমজি ও ৯২টি বিজি লোকোমোটিভ। ১৭১টি এমজি লোকোমোটিভের মধ্যে মেয়াদোত্তীর্ণ ১৩২টি, যা মোট এমজি লোকোমোটিভের ৭৭ শতাংশ। অপরদিকে ১৩২টি ইঞ্জিনের মধ্যে ৬১টির বয়স ৫০ বছরের বেশি। ৯২টি বিজি লোকোমোটিভের মধ্যে ৪৩টি মেয়াদোত্তীর্ণ। যাত্রীবাহী এক হাজার ৭৬৪টি কোচের মধ্যে ৫৯২টি মিটারগেজ ও ২৬৬টি ব্রডগেজ বগির আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেছে। অন্যদিকে পণ্যবাহী আট হাজার ৬৮০টি ওয়াগনের মধ্যে তিন হাজার ৯৩৯টির আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। ফলে লোকোমোটিভের যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ট্রেনের সময়সূচি এবং নির্ধারিত গতি প্রায়ই বিঘিœত হওয়ার পাশাপাশি পণ্য ও যাত্রী পরিবহনে লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারছে না রেলওয়ে।

জড়াজীর্ণ রেললাইন: রেলপথে ট্রেন দুর্ঘটনা কয়েক কারণে সংঘটিত হয়ে থাকে। যেমন মুখোমুখি সংঘর্ষ, ট্রেন বিচ্ছিন্ন হওয়া, লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা, সিগন্যাল ত্রুটিজনিত দুর্ঘটনা, লাইনচ্যুত হয়ে দুর্ঘটনা। সারাদেশে ট্রেন লাইনচ্যুতি ঘটনার ৭৫ শতাংশই ঘটে রেললাইনের কারণে। রেললাইনের যন্ত্রাংশের সংকটও চুরি, রেলওয়ের সংশ্লিষ্টদের অবহেলা, লোকবল ঘাটতি, নিয়মিত তদারকি ও মেরামতের অভাব, মানসম্মত পর্যাপ্ত পাথরের স্বল্পতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ সেতুর কারণে ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটছে। এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মোট রেলপথের মধ্যে মানসম্পন্ন রেললাইন মাত্র ২৫ দশমিক ২৩ শতাংশ। সে অনুযায়ী, দেশের ৭৪ দশমিক ৭৭ শতাংশ রেললাইন চলছে নির্ধারিত মান ছাড়াই। এর মধ্যে ১৪টি রুটকে মানসম্পন্ন বলে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু: বর্তমানে রেলপথে ছোট-বড় কালভার্ট ব্রিজ রয়েছে প্রায় তিন হাজার ১৪৩টি। ৩২৬টি বড় সেতু (৬০ ফুট বা তার বেশি) এবং ছোট সেতু রয়েছে দুই হাজার ৮১৭। অধিকাংশেরই নির্মাণ করা হয়েছে ব্রিটিশ আমলে। বছরের পর বছর এ সেতুগুলো সংস্কার না করার কারণে এর মধ্যে ৪০২টি সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। ফলে মাঝেমধ্যে ব্রিজ ভেঙে, কিংবা স্লিপার না থাকায় লাইনচ্যুত হয়ে রেল দুর্ঘটনা হচ্ছে।

প্রকল্পের ধীরগতি ও সুফল কম: বর্তমানে রেলওয়েতে প্রায় ৩৯টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলছে, যার ব্যয় এক লাখ ৪২ হাজার কোটি টাকা। চলমান প্রকল্পের মধ্যে পাঁচটির কাজ ৯ থেকে ১১ বছর ধরে চলছে। আরও সাতটির সময় বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আগে ৭৯ প্রকল্পের মধ্যে ৭৫ শতাংশের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। ২০১০ জুলাই মাসে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু  থেকে মিয়ানমারের কাছে ঘুনধুম পর্যন্ত সিঙ্গেল লাইন ডুয়েলগেজ ট্র্যাক নির্মাণ প্রকল্প অনুমোদিত হয়। ২০১৬ সালের জুন মাসে এই প্রকল্প শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তা ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত ধরা হয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় এক হাজার ৮৫২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা থেকে বেড়ে হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৩৭ লাখ ৫০ টাকা হয়েছে। খুলনা থেকে মংলা বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের অনুমোদন হয় ২০১০ সালের ৩১ ডিসেম্বর। প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৩০ জুন শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময় বাড়ানো হয় ২০২১ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত। প্রকল্প ব্যয় এক হাজার ৭২১ কোটি ৩৯ লাখ ৩৬ হাজার টাকা থেকে বেড়ে হয় তিন হাজার ৮০১ কোটি ৬১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা।

পণ্য পরিবহন ব্যাহত: রেলপথে পণ্য পরিবহনে নেই চাঁদাবাজির ভয়, দুর্ঘটনার আশঙ্কাও কম। ট্রেনে পণ্য পরিবহনে সবচেয়ে বড় সুবিধাটি হলো সড়কপথের চেয়ে খরচ অনেক কম। উল্লেখ্য, ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে কনটেইনারবাহী একটি ট্রেন থেকে আয় হয় যাত্রীবাহী ট্রেনের চারগুণ। একটি কনটেইনারবাহী ট্রেন থেকে রেলওয়ের ছয় লাখ টাকা আয় এবং চার লাখ টাকা মুনাফা হয়। কিন্তু ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের সবচেয়ে জনপ্রিয় ট্রেন সুবর্ণ এক্সপ্রেস থেকে আয় হয় মাত্র দেড় লাখ টাকা। এতসব সুবিধা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন রেলওয়ের পণ্য পরিবহন খাতটি অবহেলিত। যদিও করোনা মহামারির সময় বিভিন্ন পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনার বিষয়টি বেশ সাড়া ফেলেছিল। কিন্তু বর্তমানের পণ্য পরিবহনে অপর্যাপ্ত অবকাঠামো, সময়ক্ষেপণ, পণ্যবাহী ট্রেনের অপ্রতুলতা ও ইঞ্জিন সংকটের কারণে আবারও ব্যাহত হচ্ছে পণ্য পরিবহন।

যে কোনো অপারেশনের জন্য তিনটি উপাদান আবশ্যকীয়। যেমন মেশিন, ম্যান বিহাইন্ড দ্য মেশিন আর এনভায়রনমেন্ট। রেলের এ তিনটি উপাদানই আজ অচল। ইঞ্জিন, জনবল, আর স্টেশন তিনটিই রেলে সংকুচিত। মেশিন, এনভায়রনমেন্ট কার্যোপযোগী থাকলেও লোকবলের অভাব হলে স্টেশনও চলবে না, কোচও নড়বে না। একটি কথা অবশ্যই মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের এক লাখ ৪৭ হাজার ৫৭ বর্গকিলোমিটারের ৭৫ শতাংশ স্থলভাগ; বাকি অংশ জলাশয়, নদীনালা, অরণ্য ও চারণভূমি। এটুকু জায়গায় ১৬ কোটি লোকের বসবাস। প্রতিনিয়ত ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাট নির্মিত হওয়ায় ওই ৭৫ শতাংশ জমিও কমে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। এ বিশাল জনগোষ্ঠীর যাতায়াত ব্যবস্থা শুধু সড়ক ব্যবস্থাপনা দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়। এজন্য সমন্বিত পরিবহন নীতির প্রয়োজন। রেল শুধু একপ্রকার যানবাহন নয়, বাঙালির সংস্কৃতিতে ওতপ্রোতভাবে মিশে থাকা এক ও অদ্বিতীয় আপনজন। আমাদের সেই চিরচেনা আপনজনকে আমাদের নাগালেই রাখতে হবে। এর জন্য প্রয়োজন রেলের আধুনিকায়ন ও সংস্কার।

লেখক: মো. আতিকুর রহমান

রেল গবেষক

[email protected]

সূত্র:শেয়ার বিজ,১৫ নভেম্বর ২০২১


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।