বুলেট ট্রেনের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

বুলেট ট্রেনের স্বপ্ন ও বাস্তবতা

নাজমুস সালেহী:

স্বপ্ন দেখার শুরুতেই ১১০ কোটি টাকা শেষ। উপলক্ষ্য প্রাথমিক সমীক্ষা যাচাই। এই স্বপ্নযাত্রায় ঢাকার সঙ্গে যুক্ত হবে চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারও। যাতে খরচ হবে ১৫০ হাজার কোটি টাকা। পুরো প্রকল্প শেষে ঢাকা থেকে পর্যটন নগরী কক্সবাজার যাওয়া যাবে মাত্র ৭৩ মিনিটে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের প্রাথমিক সমীক্ষা শেষ করার পর থেকেই সরব রেলপথ মন্ত্রণালয়। রেল কর্মকর্তারা প্রতিদিনই বেশ গর্বের সাথে চাউর করছেন বুলেট ট্রেনের কথা। বিভিন্ন সভা সেমিনার কিংবা আলোচনা সভায় বুক টান করে মন্ত্রীও বার বার বলছেন, এমন উদ্যোগ বাংলাদেশের উন্নয়নের মাইলফলক। বুলেট ট্রেনের যুগে প্রবেশ করতে চায় বাংলাদেশ কম কথা না!

আমরা গণমাধ্যম কর্মীরা নিউজও করেছি বুলেট ট্রেনের সেই প্রকল্প নিয়ে। প্রকল্প অনুযায়ী কী কী করা হবে, কত টাকা খরচ হবে, বাস্তবায়ন হলে যোগাযোগ ব্যবস্থায় কতটা পরিবর্তন আসবে? জাতীয় প্রবৃদ্ধিতে কত শতাংশ আয় বৃদ্ধি পাবে এসব হিসাব গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সেসব নিউজ বিভিন্নভাবে প্রচারের ব্যবস্থা করা হয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন মাধ্যমে। সরকারের বড় বড় এমপি মন্ত্রীদের অনেকেই তা শেয়ার দিয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন স্বাচ্ছন্দ্যে। শুধুমাত্র সমীক্ষার কাজ শেষ হয়েই যেন চীন, জাপান কিংবা বৃটেনের কাতারে চলে গেছে আমাদের রেল ব্যবস্থা। এমন আধুনিক রেল ব্যবস্থা বাংলাদেশের জন্য কতটা বাস্তবসম্মত এমন আলোচনা করে শুধু এর সুফল তুলে ধরে তা প্রচার করতেই ব্যস্ত সবাই। এই প্রকল্প কতটা বাস্তব এদিকে খুবই কম নজর দেওয়া হচ্ছে। এই প্রকল্পের বাস্তবতা এবং লাভ লোকসানের বিষয়টিও দেখতে হবে। এসবের কিছুটা বিশ্লেষণ করা হবে এই লেখায়।

এর ট্র্যাক হবে ব্যালাস্টলেস (পাথরবিহীন)। তেল বা কয়লা নয় চলবে বিদ্যুতে। এজন্য সম্ভাব্যতা সমীক্ষা এবং বিশদ ডিজাইন তৈরি শেষ পর্যায়ে। এ প্রকল্পে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রামের পাহাড়তলীতে ইউরোপের আদলে ৫টি স্টেশন নির্মাণ হবে। প্রতিটি স্টেশন ঘিরেই থাকবে এক একটি মাল্টি মোডাল ট্রানজিট হাব। পাহাড়তলী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত মাঝপথে কোনো স্টেশন থাকবে না। কক্সবাজারে নির্মাণ হবে এ প্রকল্পের সবচেয়ে অত্যাধুনিক স্টেশনটি।

উচ্চগতির এ রেলসেবা চালু হলে ৬ ঘণ্টা নয়, ননস্টপে মাত্র ৫৫ মিনিটে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকা যাওয়া যাবে। ট্রেনটি দিনে প্রায় ৫০ হাজার যাত্রী পরিবহন করবে। এর জন্য একজন যাত্রীর ২ হাজার টাকার মতো ভাড়া গুনতে হবে। এসব ‍শুনতে বেশ চমকপ্রদ মনে হলেও বাস্তবতার আলোকে এর নিরীক্ষা দরকার। বর্তমানে বাংলাদেশের যে রেল ব্যবস্থা প্রচলিত আছে ডিজেল চালিত ইঞ্জিনের রেল। পৃথিবীর অন্যান্য দেশে এখন আর এমন রেল ব্যবস্থা বিদ্যমান নাই। সবই ইলেকট্রিন রেল ব্যবস্থায় চলে গেছে।

বাংলাদেশে স্বাধীনতার সময় রেলে ইঞ্জিন ছিল ৪৮৬টি। বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২৬৩ টিতে। যার অন্তত ৭৬ শতাংশের মেয়াদ পেরিয়ে গেছে কয়েক দশক আগেই। বাংলাদেশে এখন যে সমস্ত ইঞ্জিন চলাচল করে তা বিশ্বের কোথাও নেই। এদের যন্ত্রপাতিও আর পাওয়া যায় না ফলে মেরামতও সম্ভব হচ্ছে না। ব্রিটিশ কিংবা আমেরিকায় এসব মডেলের ইঞ্জিন এখন যাদুঘরে রাখা আছে। তার মানে আমাদের রেল ব্যবস্থা পুরোটাই একটা নাজুক আর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। পাশ্ববর্তী দেশ ভারত বহুকাল আগেই এসব ইঞ্জিন বাদ দিয়ে ইলেকট্রিকের যুগে প্রবেশ করেছে। আমরা ভারতের ফেলে দেওয়া পুরানো ইঞ্জিন উপহার হিসেবে নিয়ে আমাদের ট্রেনের চাকা সচল রাখার চেষ্টা করছি। এইতো ক’দিন আগেই ভারতে অব্যবহৃত ২০ ইঞ্জিন দেশে এনে আমাদের সংকট কাটানোর চেষ্টা করা হয়েছে।

আমাদের দেশের ৮০ শতাংশ রেল লাইন সেই ব্রিটিশ আমলের তৈরি করা। এখনও লোহার স্লিপার আর জং ধরা জরাজীর্ণ লাইন দিয়েই চলছে ট্রেন। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের হিসাব বলছে বর্তমানে প্রায় ৬৩ শতাংশ রেলপথই ঝুঁকিপূর্ণ। পুরানো লাইনে প্রতিদিনই কমছে ট্রেনের গতি। রেলওয়ে প্রতিদিনই কমিয়ে দিচ্ছে ট্রেনের গতি। সর্বশেষ টাইম টেবিলে (৫২তম) রেল কর্মকর্তারা নিজেরাই যাত্রার সময় বাড়িয়েছেন প্রায় প্রতিটি ট্রেনের এক থেকে দেড় ঘন্টা পর্যন্ত। চালকদের নির্দেশ দিয়েছেন গতি কমিয়ে ট্রেন চালানোর। কারণ হিসেবে তারা ব্যাখ্যা দিয়েছেন ঝুঁকিপূর্ণ রেল লাইন আর বিপদাসঙ্কুল রেলসেতু। তাছাড়া বুড়ো ইঞ্জিনও আর চলে না আগের গতিতে। ফলে গতি কমানো ছাড়া গতি নেই রেলের।

যারা ৫/৬ বছর ধরে নিয়মিত ময়মনসিংহ কিংবা উত্তরবঙ্গে ট্রেনে ভ্রমণ করেন তাদের কাছে জিজ্ঞেস করলেই উত্তর পেয়ে যাবেন, কত ঘণ্টা লাগে এখন গন্তব্যে পৌঁছাতে। এসব অঞ্চলে প্রতিটি ট্রেনের যাত্রা সময় বেড়েছে ২/৩ ঘণ্টা পর্যন্ত। ৫ বছর আগে ঢাকা থেকে জামালপুর যেতে যা সময় লাগতো বর্তমানে তার চেয়ে ২ ঘণ্টা সময় বেশি লাগে। ভাবা যায়! এত বছর পরে এসেও কমছে ট্রেনের গতি! যেখানে বুলেট ট্রেন চালানোর কথা ভাবছে রেলওয়ে, সেখানে নিজেরাই গতি কমিয়ে চালাচ্ছে ট্রেন। কোথাও কোথাও ট্রেনের গতি মাত্র ২০ কিলোমিটার করে চালাতে নোটিশ দেওয়া হয়েছে চালকদের। এমন বাস্তবতায় বুলেট ট্রেন!

বর্তমানে দেশে এখনও এক ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থায় আসতে পারেনি রেলওয়ে। ৪/৫ ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থায় চলছে ট্রেন। একই রেল ব্যবস্থায় ৫ ধরনের সিগন্যাল ব্যবস্থা ভাবা যায়! এযুগে এসেও কোথাও কোথাও মাটির কুপি দিয়ে পথ দেখানো হয় ট্রেনকে! শীতের সময় কুয়াশার কারণে দুর্ঘটনা থেকে বাঁচতে এখনও ব্যবহার করা হয় ব্রিটিশ আমলের পটকা সিগন্যাল নামের মান্ধাতা পদ্ধতি। রেল ব্যবস্থার কত উন্নয়ন ঘটে গেল সারা দুনিয়ায় আর আমরা এখনও পড়ে আছি কেরোসিনের কুপি আর পটকা ব্যবস্থায়।  এখনও দেশের ৯০ শতাংশ স্টেশনেই নাই ইন্টারলকড সিগন্যাল ব্যবস্থা। এখনও হাত দিয়ে নামানো হয় লেভেল ক্রসিং। হাত দিয়ে বাঁশ কিংবা লোহার ব্যারিকেড নামিয়ে এখন চলছে প্রায় অবৈধ লেভেল ক্রসিং। অথচ সিগন্যাল ব্যবস্থায় সব দেশই চলে গেছে অটোমেশিন পদ্ধতিতে। একই অঞ্চলে ভিন্ন ভিন্ন লাইনে ভিন্ন ভিন্ন সিগন্যাল ব্যবস্থা থাকার কারণে বিভ্রান্ত হন ট্রেনের লোকমাস্টার (এলএম) বা ট্রেন চালক। একই কারণে প্রতি বছর বাড়ছে দুর্ঘটনা।

শুধু ট্রেন চলাচলকেই রেলওয়ে বলা যায় না। অপারেশন, রোলিং স্টক, ট্রফিক আর সিগন্যালের সমন্বিত রূপই হলো রেল ব্যবস্থাপনা। এই ব্যবস্থাপনায় একটি জিনিসও অনুপস্থিত  থাকলে আর তাকে রেল ব্যবস্থাপনা বলা যায় না। লোকমোটিভ, কোচ আর সেতু রক্ষণাবেক্ষণের যন্ত্রপাতি উৎপাদন করার সক্ষমতা অর্জনও আধুনিক রেলব্যবস্থপনার অংশ। বাংলাদেশ রেলওয়ের ইঞ্জিনেই প্রয়োজন পড়ে প্রায় ২৫ হাজার যন্ত্রাংশ। আর অন্যান্য বিভাগে দরকার পড়ে আরও ৫ হাজার রকম যন্ত্রপাতি। প্রতি বছর নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় এসব উৎপাদনও হতো এক সময়। কিন্ত এখন এসবের জন্য পুরোপুরি বিদেশ নির্ভর বাংলাদেশ।

ভারতীয় রেল ব্যবস্থা এত উন্নত কেন? কারণ ওদের প্রতি বছর মেরামতের যন্ত্রাংশ কিনতে হয় খুব সামান্য। বিদেশ নির্ভর না হয়ে তারা প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির বেশির ভাগই নিজেরা উৎপাদন করে। ফলে ওদের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ অনেক কম, তাই তারা লাভ করছে প্রতি বছর। বিদেশ নির্ভর প্রতিটি দেশের রেলই লোকসানে আছে সারা দুনিয়ায়। ভারত নিজেই ইঞ্জিন ও কোচ উৎপদন করে নিজেদের চাহিদা মেটায় এমনকি তা বিদেশে রপ্তানিও করে। ফলে তাদের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক কম। সামগ্রিক এই ব্যবস্থাপনার নামই রেলওয়ে।

আমাদের দেশে ১৮৭০ সালে গড়ে ওঠে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের সর্ববৃহৎ রেলওয়ে কারখানা, যেটা নীলফামারী জেলার সৈয়দপুরে অবস্থিত। ২১০ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত রেল কারখানাটি ছিল সেই সময়ে পৃথিবীর অন্য যে কোনো আধুনিক রেল কারখানার চেয়েও উন্নত। সেখানে ১২ হাজার রকম যন্ত্রপাতি উৎপাদন করা হতো। উৎপাদন হতো ট্রেনের যাত্রীবাহী কোচ। কালের পরিক্রমায় সেই কারখানা এখন প্রায় বন্ধ। ৯০ এর দশকেও কারখানাতে কাজ করতো ৫/৭ হাজার মানুষ। এখন মাত্র ৭০০ জন। ইতোমধ্যে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে সৈয়দপুরের রেলওয়ে সেতুকারখানা। এসব কারখানায় উৎপদান না থাকায় আমরা পুরোপুরি বিদেশ নির্ভর হয়ে পড়েছি। প্রতি বছর বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয় ১০০ কোটি টাকারও বেশি যন্ত্রাংশ। প্রতি বছর এসবের কারনে ভারী হচ্ছে লোকসানের পাল্লা।

শুধু সৈয়দপুর নয় চট্টগ্রামের পাহাড়তলী,পার্বতীপুরের কেন্দ্রীয় লোকমোটিভ কারখানারও একই অবস্থা। লোকবল ঘাটতি, পুরানো যন্ত্রপাতি আর চাহিদা বাজেটের ঘাটতির কারণে ব্যহত হচ্ছে কারখানার কার্যক্রম। বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের গড় লোকসান প্রায় ১৫০০ কোটি টাকা। যদি এসব কারখানা সচল করার উদ্যোগ না নেওয়া হয়, তাহলে আগামী ৫ বছরের মধ্যে রেলের লোকসান দাঁড়াবে প্রতি বছর অন্তত ২০০০ কোটি টাকা। কেননা প্রতি বছর বাড়ছে রেল নেটওয়ার্ক, ইঞ্জিন আর যাত্রীবাহী কোচ এসব মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য খরচ বাড়বে ১০ গুন।

এই মুহূর্তে বাংলাদেশে বন্ধ রেলস্টেশনের সংখ্যা ১০০টি। লোকবলের অভাবে একের পর এক বন্ধ হচ্ছে স্টেশন। এমন এক বাস্তবতায় বুলেট ট্রেনের প্রযুক্তি আমাদের দেশের জন্য কতটা যুক্তিযুক্ত? একটি আধুনিক রেল ব্যবস্থার যে সব শর্ত প্রয়োজন, অথবা একটি লাভজনক রেলব্যবস্থায় যে সব প্রয়োজনীয় অনুসঙ্গ থাকা জরুরি তার কতটা আছে বাংলাদেশে? সামগ্রিক রেল ব্যবস্থাপনা কি বুলেট ট্রেনের উপযোগী?

দেশে ডেমু ট্রেনের দক্ষ জনবল আর মেরামতের কারখানা না থাকায় পুরোপুরি বিকল হয়ে পড়ে আছে ট্রেনগুলো। বিগত ৭/৮ বছর ধরেও দক্ষ তো দূরের কথা সামান্য ধারণা সম্পন্ন লোকবলও গড়ে তুলতে পারেনি রেলওয়ে। ডেমু ট্রেন এখন রেলের গলার কাঁটা। মেরামতের অভাবে নষ্ট হয়ে মাটির সাথে মিশতে বসেছে ৬৫৪ কোটি টাকার ২০টি ডেমু ট্রেন। দেশে ডেমুর যন্ত্রপাতি, দক্ষ জনশক্তি, মেরামতের ওয়ার্কশপ না থাকায় মুখ থুবড়ে পড়েছে ডেমু ট্রেন প্রকল্প।

একই পরিণতি হবে বুলেট ট্রেন ব্যবস্থার যদি সঠিক পরিকল্পনা ও পূর্বপ্রস্তুতি না থাকে। সামান্য ডিজেল ইঞ্জিনই রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যে দেশের রেল ব্যবস্থাপনাকে তাকিয়ে থাকতে হয় বিদেশের দিকে সেদেশে বুলেট ট্রেন সচল থাকবে কীভাবে? বুলেট ট্রেন মানে কিন্তু শুধু ট্রেন আর রেললাইন না। ট্রেন পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি ব্যবস্থাপনার নাম। যেখানে দরকার হবে উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার, যে প্রযুক্তি পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল এবং প্রযুক্তির যন্ত্রাংশ নিজে তৈরির সক্ষমতা। এই ব্যবস্থাপনার সামন্যটুকুও কী বাংলাদেশের আছে? সরাসরি উত্তর নেই। ৮০ ভাগ ঝুঁকিপূর্ণ রেল লাইন আর ৭০ শতাংশ মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিনের দেশে বুলেট ট্রেন!

বুলেট ট্রেন সম্পূর্ণ আলাদা পদ্ধতি, আলাদা প্রযুক্তি। সর্বাধুনিক রেল ব্যবস্থাপনার নাম বুলেট ট্রেন। বুলেট ট্রেন রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দরকার হবে আলাদা ওয়ার্কশপ, আলাদা ইলেকট্রিক পদ্ধতি। আলাদাভাবে বানাতে হবে কোচ ও লোকমোটিভের যন্ত্রাংশ উৎপাদন কারখানা। দেশে যদি বুলেট ট্রেনের সামান্যতম যন্ত্রপাতি উৎপাদন করা না যায় তাহলে বিদেশ থেকে কত দিন আমদানি করবে? এসবের কোনো পরিকল্পনা নেই প্রকল্পে। শুধু রেল কর্তারা গলা ফাটাচ্ছেন বুলেট ট্রেনের মহিমা বর্ণনা করে।

বলা হচ্ছে, বুলেট ট্রেন দিয়ে প্রতিদিন ৫০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা হবে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে। প্রতিদিন এত যাত্রী পাওয়া যাবে? রেল কর্মকর্তারা বলছেন, বুলেট ট্রেন হয়ে গেলে চট্টগ্রাম থেকে মানুষ ঢাকায় এসে থাকবে না। চট্টগ্রামে বসেই চাকরি করবে। প্রতিদিন দুই ঘণ্টায় যাওয়া আসা করতে পারবে। বুলেট ট্রেনের ভাড়া ঢাকা -চট্টগ্রাম ধরা হয়েছে ২ হাজার টাকা। বাড়তেও পারে। যদি না বাড়ে, তবুও ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম প্রতিদিন যাওয়া আসায় খরচ হবে ৪ হাজার টাকা। মাসে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। কে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা ট্রেন ভাড়া দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম যাওয়া আসা করবে? তাহলে তার বেতন কত হতে হবে? কত জন এমন বেতন পাবেন? তাহলে প্রতিদিন ৫০ হাজার যাত্রী পাবেন কোথায়? মালামাল পরিবহন একটা বড় আয়ের পথ হতে পারতো বুলেট ট্রেনে। কিন্ত তা রাখা হয়নি, পরিকল্পনাতেও নাই। তাহলে আয় হবে কীভাবে?

হয়তো নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে বানিয়ে নেওয়া যাবে বিরাট এই প্রকল্পের অবকাঠামো। কিন্ত প্রতি বছর এই পদ্ধতি (বুলেট ট্রেন) পরিচালনা করতে যে পরিমান খরচ হবে তা আসবে কোথায় থেকে? শুধু অবকাঠামোগত নির্মাণ ব্যয় প্রাথমিকভাবে ধরা হয়েছে ১৫০ হাজার কোটি টাকা। তবে ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে গেলে খরচ বাড়বে ২০-২৫ গুণ পর্যন্ত। কারণ ওগুলো ছাড়া আধুনিক বুলেট ট্রেন পদ্ধতি মাঝপথে গিয়ে বন্ধ হয়ে যাবে। পৃথিবীর যে সব দেশ বুলেট ট্রেন চালাচ্ছে তারা সবাই শুধু অবকাঠামো নয় পুরো ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলেছে। রক্ষণাবেক্ষণ, কারখানা, ওয়ার্কশপ, যন্ত্রপাতি নিজেরা উৎপাদন ও মেরামত ছাড়া বুলেট ট্রেন দেউলিয়া হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। শুধু তাই নয় আধুনিক প্রযুক্তির এই রেল ব্যবস্থাপনা টেকসইও হয় না। পরবর্তীতে খরচ সংকুলান করতে না পেরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার জোর সম্ভাবনা থাকে।

শুধু অবকাঠামো নির্মাণেই যদি খরচ ধরা হয় ১৫০ হাজার কোটি টাকা, তাহলে ব্যবস্থাপনা বলতে যা বুঝায় তা গড়তে গেলে আরও কত টাকা দরকার হবে?  এত বিপুল পরিমান টাকা খরচ করা হবে শুধু মাত্র ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের জন্য? আর পুরো দেশে ট্রেন চলবে ডিজেলে? মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন আর ঝুঁকিপূর্ণ রেল লাইন দিয়ে? প্রতিদিন শিডিউল বিপর্যয়ে নাস্তানাবুদ হবে অন্যান্য অঞ্চলের যাত্রীরা? এটা কি সার্বিক রেল ব্যবস্থার উন্নয়ন? পুরো রেল ব্যবস্থা নাজুক রেখে আলাদা অন্য একটি সিস্টেম চালুর জন্য বিশাল বরাদ্দ না দিয়ে সেই পরিমান টাকা পুরো দেশের রেল ব্যবস্থায় বিনিয়োগ করা হোক।

যে সব অঞ্চলে ট্রেনের গতি মাত্র ২০ কিলোমিটার সেখানে নতুন রেল লাইন নির্মাণ করা হোক। জরাজীর্ণ রেল লাইন সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হোক। ঝুঁকিপূর্ণ রেলসেতু মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হোক। মিটারগেজ থেকে ব্রডগেজে উন্নীত করা হোক দেশের সব রেল লাইন। সিংগেল থেকে ডুয়েল লাইন করার ব্যবস্থা নেওয়া হোক। নতুন নতুন ইঞ্জিন কিনে সংকট কাটানো হোক। যাত্রী সেবায় কেনা হোক নতুন কোচ, বাদ দেওয়া হোক মেয়াদোত্তীর্ণ বগি আর ইঞ্জিন। দেশীয় কারখানাগুলো সচলের উদ্যোগ নেওয়া হোক সে টাকায়। নতুন করে নির্মাণ করা হোক যন্ত্রাংশ তৈরির কারখানা। সিগন্যাল ব্যবস্থায় আধুনিক মেশিনপত্র বসানো হোক। দেশেই উৎপাদনের ব্যবস্থা করা হোক কোচ ও লোকমোটিভ মেরামতের যন্ত্রাংশ। বাংলাদেশে ইঞ্জিন না হোক অন্তত কোচ উৎপাদনের বাস্তবমুখী উদ্যোগ নেওয়া হোক। এসব স্বপ্ন বাস্তবায়ন হলেই আমাদের রেল হবে যুগোপযোগী আধুনিক ও গতিসম্পন্ন। এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বুলেট ট্রেনের চেয়ে অনেক কম খরচ হবে। এতে সার্বিক রেল ব্যবস্থাপনা হবে সুদৃঢ়।

এসব উন্নয়ন শেষ হওয়ার পর স্বপ্ন দেখা উচিৎ বুলেট ট্রেনের। তাহলে সেই উন্নয়ন টেকসই হবে। লাভজনক হবে। মানান সই হবে। বুলেট ট্রেন বাস্তবায়নের কোনো পূর্ব শর্তই বাংলাদেশে নেই এমন বাস্তবতায় তা করতে গেলে সেটা হবে অলীক ও বিলাসী। হয়তো অবকাঠামো নির্মাণ করে ট্রেন চালানোও সম্ভব হবে, কিন্ত টেকসই হবে কি? নাকি লোকসানের পাল্লা ভারি হতে হতে দেউলিয়া হবে দেশের রেল, তা ভাববার যথেষ্ট সময় রয়েছে এখনও।

লেখক: গণমাধ্যমকর্মী

সূত্র:সময়টিভি, ২০ নভেম্বর, ২০২১


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।