দেশে দ্রুত গতির রেলের সম্ভাবনা


এক শতাব্দী আগেও কাউকে যদি বলা হতো, উড়োজাহাজ ছাড়াই মানুষের পক্ষে ঘণ্টায় ২৫০-৩০০ কিলোমিটার যাত্রা করা সম্ভব, নিঃসন্দেহে তা বিশ্বাস করতে কষ্ট হতো। কিন্তু সময় বদলেছে, আর এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে বদলেছে আধুনিক বিশ্বের জীবনাচারের ধ্যান-ধারণা। প্রতিনিয়ত নতুন ও উন্নত প্রযুক্তির আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন উন্নত দেশে হাইস্পিড রেল (এইচএসআর) চালুর মধ্য দিয়ে পরিবহণ ব্যবস্থায় অভাবনীয় রূপান্তর ঘটেছে।

হাইস্পিড রেলের জন্মস্থল হিসাবে বিবেচনা করা হয় জাপানকে। জাপান ১৯৬৪ সালে সর্বপ্রথম উচ্চ-গতিসম্পন্ন রেল চালু করে, যা ‘বুলেট ট্রেন’ নামেই ব্যাপকভাবে পরিচিত। সপ্তাহের কর্মদিবসগুলোয় জাপানি হাইস্পিড ট্রেনগুলো দিনে সাধারণত ৪ লাখ ২০ হাজারেরও বেশি যাত্রী বহন করে থাকে। পরবর্তীকালে ইউরোপের অনেক দেশেও একই ধরনের রেলব্যবস্থা গড়ে ওঠে। সাম্প্রতিক সময়ে চীন তাদের উন্নত ও অধিক কার্যকর হাইস্পিড রেল অবকাঠামোকে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও দক্ষতার মাধ্যমে সমন্বিত করে গোটা বিশ্বে প্রশংসিত হয়েছে।

উন্নত দেশগুলো ক্রমেই উচ্চগতির রেলব্যবস্থার দিকে ঝুঁকছে, যার কারণ হলো এর পরিবহণ সুবিধা, শক্তি সঞ্চয় (এনার্জি সেভিং) সুবিধা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি। তাছাড়া এর পরিবেশসংক্রান্ত নানা সুবিধাও রয়েছে। এগুলো দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিকে ত্বরান্বিত করতে সক্ষম। যে কোনো দেশকে তিনভাবে প্রবৃদ্ধি অর্জনে সাহায্য করতে পারে হাইস্পিড রেল নেটওয়ার্ক। প্রথমত, এটি একই সময়ে একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যাত্রী পরিবহণের একটি দ্রুত ও আরামদায়ক মাধ্যম হওয়ায় তা যাত্রীদের সময় ও অর্থ সাশ্রয় করতে সাহায্য করে। দ্বিতীয়ত, এটি বেকার শ্রমশক্তির জন্য উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। তৃতীয়ত, উচ্চগতিসম্পন্ন রেলব্যবস্থা দেশের শহরগুলোর মধ্যে উন্নত আন্তঃসংযোগ তৈরি করে, যার ফলস্বরূপ ছোট শহরগুলো বড় শহরগুলোর সঙ্গে আরও ভালোভাবে সংযুক্ত হতে পারে, যা নানা ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনে।

অত্যন্ত আশার কথা, বাংলাদেশ এর সমূহ সম্ভাবনা উপলব্ধি করে দেশে হাইস্পিড রেল চালু করার জন্য বিস্তারিত পরিকল্পনা ও উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকার বিগত কয়েক বছরে বেশকিছু রেল প্রকল্প গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত হাইস্পিড রেল সংযোগ প্রকল্প। প্রকল্পের প্রাক্কলন অনুসারে হাইস্পিড ট্রেন চালু করা গেলে প্রতিদিন ৫০ হাজারের বেশি যাত্রী মাত্র ৭৩ মিনিটেই ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যাতায়াত করতে পারবেন। প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা যাচাই ইতোমধ্যেই সম্পন্ন হয়েছে। দুটি চীনা প্রতিষ্ঠান এবং একটি অস্ট্রেলিয়ান ফার্ম পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) ভিত্তিতে যৌথ উদ্যোগে প্রকল্পটির নির্মাণ, পরিচালনা ও তহবিল ব্যবস্থাপনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। হাইস্পিড রেল চালু হলে তা দেশের অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখবে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর্যায়ে রয়েছে। এক্ষেত্রে একটি দ্রুতগতির যোগাযোগ ব্যবস্থা দেশের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতিকে বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ এটি কেবল মানুষের সময়ই সাশ্রয় করবে না, দেশের দুই প্রধান শহর ঢাকা ও চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা আরও ফলপ্রসূ উপায়ে বাস্তবায়নেও সহায়তা করবে।

করোনার বৈশ্বিক মহামারির কারণে বর্তমানে এ রেল সংযোগ প্রকল্প সম্পর্কিত বিভিন্ন কৌশলগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব হচ্ছে। এ প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি সুযোগ-সুবিধাদি বিবেচনায় রেখে কোন কোম্পানিকে নির্মাণের অংশীদার করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। সরকারের সময়ানুগ সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে প্রকল্পটি থেকে দেশের মানুষের কল্যাণ ও জীবন-জীবিকার উন্নয়ন।

এম এ মোনায়েম : আর্থওয়ার্ক ইঞ্জিনিয়ার ইনচার্জ, মাওয়া ভাঙ্গা বিভাগ, পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।