চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে জনসচেতনতা দরকার

চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে জনসচেতনতা দরকার

শাপলাখাতুনদূরপাল্লার গণপরিবহন হিসেবে যাত্রীদের পছন্দের তালিকায় প্রথমে রয়েছে ট্রেন। কম সময়ে এবং অল্প খরচে অনেক দূরের গন্তব্যে স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করা যায়। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মনোরম বাতাস প্রাণ জুড়িয়ে দেয়। এখানে নেই জ্যামের যানজট, সড়ক পরিবহনের মতো অতিরিক্ত দুর্ঘটনা আর নদীপথের মতো দূষিত পানির দুর্গন্ধ। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের দুর্ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। ছোট ছেলেমেয়েরা খেলার বশে অনেক সময় চলন্ত ট্রেনে পাথর, ঢিল ইত্যাদি নিক্ষেপ করে থাকে। তাদের এই শখের খেলার কারণে প্রায়ই অনেক বড় দুর্ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। তাদের বিভ্রান্ত বিকৃত আনন্দ রেলযাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠেছে। রেললাইনের অন্যতম উপাদান হলো পাথর আর এই পাথরই অপরাধপ্রবণ বালকদের নিশানা পরীক্ষার উপাদান। অনেক সময় কিশোর বালকরা ছাড়াও দুষ্কৃতকারীরা চলন্ত ট্রেনে ঢিল ছুড়ে? নিরাপদ বাহনকে অনিরাপদ করে তুলছে। পরিণতিতে ট্রেনের যেমন ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি মানুষের জীবনও বিপন্ন হচ্ছে।

খেলার ছলে হোক বা দুষ্কৃতকারীদের অপরাধ প্রবণ মনোভাব হোক এই আশঙ্কাজনক  দুর্ঘটনা ও মৃত্যুর প্রতিকার প্রয়োজন। আমরা যে কেউ, যে কোনো দিন এই মরণখেলার শিকারে পরিণত হতে পারি। ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল খুলনা-বেনাপোল রুটের বেনাপোল কমিউটার ট্রেনে দায়িত্বরত অবস্থায় গুরুতর আহত হয়েছিলেন রেল পরিদর্শক বায়োলজি হোসেন। ৪১ দিন চিকিৎসাধীন থাকার পর তার মৃত্যু হয়। ২০১৯ ও ২০২০তে প্রায় ১৪৫টির মতো পাথর নিক্ষেপের দুর্ঘটনা ঘটে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পশ্চিমাঞ্চলে এক বছরের মধ্যে ৭৪টি পাথর হামলার ঘটনা ঘটেছে। ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট নীলফামারীর সৈয়দপুরে ট্রেনে ছোড়া পাথরের আঘাতে আজমির ইসলাম নামে পাঁচ বছরের এক শিশু চোখ হারাতে বসেছে। এমন অনেক দুর্ঘটনা রয়েছে, যার সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সারাদেশের ২০টি জেলার ৭০টি স্থানকে পাথর নিক্ষেপের অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ১৫টি জেলা পড়েছে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের মধ্যে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর মধ্যে আছে দিনাজপুরের ফুলবাড়ী, পার্বতীপুর, পঞ্চগড়, সৈয়দপুর, ডোমার, পাকশী, ঈশ্বরদী বাইপাস, পোড়াদহ জং, মিরপুর, ভেড়ামারা, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, নাটোর, আক্কেলপুর, জয়পুরহাট, খুলনার দৌলতপুর, ফুলতলা, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, দর্শনা হল্ট, আলমডাঙ্গা, লালমনিরহাট, নোয়াপাড়া, যশোর, চুয়াডাঙ্গা, পাঁচবিবি ও চাটমোহর। পাথর নিক্ষেপের কারণে শুধু যাত্রীরা আহত বা নিহত হোন সেটা কিন্তু নয়, ট্রেনের জানালার গ্লাস, লাইট, ফ্যান, বিদ্যুৎ সংযোগের সুইচ বোর্ডও ভেঙে যায়। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে ট্রেনে পাথর ছুড়ে ২ হাজারের বেশি জানালা-দরজা ভাঙার ঘটনা ঘটেছে। চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপে যন্ত্রাংশের যে ক্ষতি হয়, প্রতি বছর তা সারতে ব্যয় হয় প্রায় ২ কোটি টাকা। অর্থাৎ দিনে গড়ে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। গাণিতিক হিসাবে দুষ্টবালক ও দুষ্কৃতকারীদের একদিনের পাথর নিক্ষেপ সমান বাংলাদেশ রেলওয়ের ৬০ হাজার টাকা গচ্চা যাওয়া। আর পাথর নিক্ষেপের নির্ভুল নিশানা সমান একজন রেলযাত্রীর মৃত্যু অথবা পঙ্গুত্বের পরিসংখ্যান।

এতো দুর্ঘটনা আর জাতীয় সম্পদ নষ্ট হওয়ার পরেও চলন্ত ট্রেনে বাইরে থেকে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ তো হয়নি, পাশাপাশি নিক্ষিপ্ত পাথরে আঘাত পাওয়া ট্রেনযাত্রীদের তাৎক্ষণিক চিকিৎসা ব্যবস্থাটুকুও আজ পর্যন্ত নিশ্চিত করা যায়নি। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব দুর্ঘটনায় রক্তক্ষরণ, চোখে ও মাথায় আঘাত নিয়ে বিনা চিকিৎসায় দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয় যাত্রীকে। ফলে বিপদের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। যেহেতু ট্রেনে এমন দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটছে, সেহেতু ট্রেনের প্রাথমিক চিকিৎসার সুব্যবস্থা প্রয়োজন। ট্রেনে অভ্যন্তরীণ চিকিৎসা ব্যবস্থা মৃত্যুর ঝুঁকি পরিমাণ কমাতে পারে।

যে অঞ্চলে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা বেশি ঘটে, সেসব অঞ্চলে পারিবারিক সচেতনতা সৃষ্টিতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন। রেল সংলগ্ন এলাকার বস্তি উচ্ছেদ করা যেতে পারে।  নজরদারি ও সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি আইনের কঠোর প্রয়োগ হওয়া উচিত। রেলওয়ে আইনের ১২৭ ধারায় ট্রেনে পাথর ছুড়লে যাবজ্জীবন জেলসহ ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। পাথর নিক্ষেপের ফলে যদি কারও মৃত্যু হয়, তাহলে ৩০২ ধারামতে, দোষীদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে।

দীর্ঘদিন ধরে এসব বিধিবিধান, উচিত-অনুচিত আলোচনা-পর্যালোচনা করে এলেও চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা কমানো যায়নি। মূলত দায়সারা কিছু প্রচারণা ছাড়া দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। আইন থাকলেও আইন প্রয়োগের উদাহরণ এখনও প্রায় শূন্যের কোঠায়।

এ জন্য সবার আগে রেললাইন-সংলগ্ন এলাকার জনগণের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করতে ব্যাপক প্রচারণা চালাতে হবে। এ ছাড়া পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি রেলস্টেশনের রেললাইনের দুই পাশ সীমানাপ্রাচীর দিয়ে ঘেরাও করার ব্যবস্থা করতে হবে। রেললাইন-সংলগ্ন এলাকায় রেল প্রহরীদের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

 চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের জন্য কঠোর শাস্তিমূলক আইন প্রণয়ন এবং অতি দ্রুত কার্যকর করার পদক্ষেপ নিতে হবে। যেহেতু রেললাইন নির্মাণে পাথরের বিকল্প নেই, তাই রেলযাত্রায় সুরক্ষা নিশ্চিত করতে রেললাইনের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি বাড়ানোরও বিকল্প নেই। এ জন্য বাংলাদেশ রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) এবং গভর্নমেন্ট রেল পুলিশের (জিআরপি) সমন্বয়ে একটি যৌথ কার্যকর বাহিনী নিয়োগ দিতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকেও সম্পৃক্ত করা যেতে পারে। জনগণের ইচ্ছাশক্তি এবং প্রশাসনের সহযোগিতার মাধ্যমেই ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ করার ঘটনা অনেকাংশে নির্মূল করা সম্ভব হবে। নিরাপদ ভ্রমণ, নিরাপদ যাত্রাপথ আমাদের সবার কাম্য।

শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

সূত্র:শেয়ার বিজ, সেপ্টেম্বর ১২, ২০২১


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।