শিরোনাম

রেলে বাড়ছে বিনা টিকিটে ভ্রমণ

রেলে বাড়ছে বিনা টিকিটে ভ্রমণ

শিপন হাবীব: চট্টগ্রাম হালিশহরের বাসিন্দা লিয়াকত আলীও রাতের ট্রেনের যাত্রী। প্রতি মাসে অন্তত ৫-৭ বার চট্টগ্রাম-ঢাকা ট্রেনে ভ্রমণ করেন তিনি। প্রতিবারই ট্রেনে ঠাসা থাকে যাত্রী। কোনো দিনই সিট খালি দেখেননি, বরং আসন সংখ্যার সমপরিমাণ যাত্রী দাঁড়িয়ে, ঝুলে যেতে দেখেন।

ট্রেন বিলম্বে চলাচলের সঙ্গে বিনা টিকিটে ভ্রমণকারীদের দৌরাত্ম্য যুগ যুগ ধরেই চলে আসছে। এমনটা খোদ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ স্বীকার করে বলছেন, ট্রেনের শিডিউল আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত হলেও, বিনা টিকিটে ভ্রমণ কিছুতেই রোধ করা যাচ্ছে না। ফলে কাঙ্ক্ষিত সেবার সঙ্গে নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। প্রায় ১৫ বছর ধরে রেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসানো যাচ্ছে না। ২০০৭ সালের ২৯ অক্টোবর রেলওয়ে কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রিরিয়াল ক্ষমতা রহিত করে দেওয়া হয়। ফলে রেলে আসন সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ যাত্রী বিনা টিকিটে ভ্রমণ করেন।

২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা রেলওয়ে বিভাগীয় প্রধানের (ডিআরএম) নির্দেশনায় বিনা টিকিটের যাত্রী প্রতিরোধকল্পে রাজধানীর ক্যান্টনমেন্ট ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনে টিকিট চেকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। মাত্র দু’ঘণ্টার চেকিং কার্যক্রমে ১১২৮ জন বিনা টিকিটে যাত্রীর কাছ থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার ৬৯০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। ২৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ৩ মার্চ পর্যন্ত এমন আরও ৫টি চেকিং কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। একেকটি চেকিং কার্যক্রমে অন্তত ১৫শ বিনা টিকিটের যাত্রী থেকে জরিমানা আদায় করা হয়। স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরোলোও ট্রেনের শিডিউল ঠিক হয়নি। বর্তমানে ১০৫টি আন্তঃনগর ট্রেনসহ মোট ৩৫৯টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে।

এ বিষয়ে রেলওয়ে অপারেশন বিভাগের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, রেলে কোনো স্টেশনেই শতভাগ নিরাপত্তা বেষ্টনি নেই। ৯৫ শতাংশ স্টেশন একেবারেই উন্মুক্ত। শুধু বিনা টিকিটে ভ্রমণ নয়, অপরাধীরা সহজেই বিনা বাধায় ট্রেন ভ্রমণ করতে পারছে। কোনো স্টেশনেই স্ক্যানিং মেশিন কিংবা নিরাপত্তা-তল্লাশি চৌকি নেই। রেলে বর্তমানে লোকবল রয়েছে অর্ধেকেরও কম। ট্রেন পরিচালনার সঙ্গে বিশেষ করে চালক, গার্ড, টিটিইর সংখ্যা ৭৫ শতাংশ ঘাটতি। টিকিটধারী যাত্রীরা অসহায় হয়ে পড়ছে। ট্রেনে ছিনতাইকারীদের আনাগোনা রয়েছে। কখনও জানালা-দরজা দিয়ে, কখনও ট্রেনের ভেতর থেকেই যাত্রীদের মালামাল, গহনা নিয়ে লম্পট দেয় অপরাধীরা।

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ে প্রধান বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (সিসিএম) নাজমুল ইসলাম যুগান্তরকে জানান, আগের চেয়ে ট্রেনের শিডিউল পরিস্থিতি উন্নত হয়েছে। বিনা টিকিটে ভ্রমণ রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। এক সময় রেলের কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল ক্ষমতা ছিল। চেকিং বসিয়ে যথাযথ জরিমানা আদায় করাসহ, কিছু বিনা টিকিটের যাত্রীদের ১৫ থেকে ৩০ দিনের কারাদণ্ড প্রদান করা হতো। প্রায় ১৫ বছর ধরে মোবাইল কোর্ট বসানো যাচ্ছে না। মোবাইল কোর্ট প্রতিনিয়ত করা গেলে বিনা টিকিটে ভ্রমণ শূন্যে নেমে আসত। আমরা প্রায় সময় বিভিন্ন স্টেশনে চেকিং কার্যক্রম পরিচালনা করি। জরিমানা আদায় করে ছেড়ে দিতে হয়।

স্টেশনগুলো নিরাপত্তা বেষ্টনি নিশ্চিত করতে পারলে পরিস্থিতির উন্নয়ন হবে। তিনি বলেন, বর্তমানে রেলে লোকবল স্বল্পতা থাকায়, যথাযথ চেকিং কার্যক্রম করা যাচ্ছে না। এতে নিশ্চয় লোকসান গুনতে হচ্ছে। রেলওয়ে ট্রাফিক বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, রেলে ৪৬৬টি স্টেশনের মধ্যে ১৩১টি বন্ধ রয়েছে। চালু স্টেশনগুলোতে প্রতিনিয়ত চেকিং কিংবা মোবাইলকোর্ট পরিচালনা করা হলে দ্বিগুণের বেশি টাকা রেলে যুক্ত হতো। জানা যায়, এ অনিয়মের সঙ্গে কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত। নামে মাত্র লোক দেখানো কিছু চেকিং কার্যক্রম পরিচালনা করেই দায়িত্ব শেষ করছে সংশ্লিষ্টরা। পরিবহণ দপ্তর সূত্র বলছে, বহুবার রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ নীতিনির্ধারকদের কাছে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে, সব স্টেশন নিরাপত্তা বেষ্টনির আওতায় আনতে।

রেলওয়ে পরিকল্পনা দপ্তর সূত্রে জানা যায়, রেলের বর্তমানে প্রায় পৌনে দুই লাখ কোটি টাকা ব্যয়ে ৩৯টি উন্নয়ন প্রকল্প চলমান রয়েছে। কোনো প্রকল্পেই বিদ্যমান রেলপথ, স্টেশন উন্নয়নের কাজ নেই। এদিকে রেলওয়ে মাঠপর্যায়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, ‘মুজিব শতবর্ষ পালন’ উপলক্ষ্যে ৫৩টি রেলওয়ে স্টেশন আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। এসব স্টেশনে নিম্নমানের কাজ হচ্ছে। অপরিকল্পিত ভাবে স্টেশন উঁচুনিচু করা হচ্ছে। খোদ কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন আধুনিকায়নে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্লাটফর্মে নিম্নমানের কাজ স্পষ্ট হয়ে উঠছে। নিম্নমানের কাজ হচ্ছে এমন অভিযোগে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কয়েকজন কর্মকর্তা কমলাপুর স্টেশন বেশ কয়েকবার ঘুরে দেখেছেন। কর্মকর্তাদের একজন বলেছেন, এসব কাজ ‘ক্ষমতাধর’ ঠিকাদাররা করছে। আমাদের দেখা কিংবা না দেখা- কিছুই আসে যায় না’।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলছেন, রেল বছরে প্রায় ১১ কোটি যাত্রী বহন করছে। কিন্তু, চাহিদা প্রচুর। বর্তমানে ৩৫৯টি যাত্রীবাহী ট্রেন চলে। প্রয়োজন দ্বিগুণের বেশি। প্রয়োজন উন্নত প্রযুক্তি, গোটা পরিকাঠামোর উন্নয়ন। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত অর্থবছরে রেল আয় করেছে ১ হাজার ১৩ কোটি টাকা। ব্যয় করেছে ৬ হাজার ২৫ কোটি টাকা। রেলে অপরিকল্পিত প্রকল্পের দৌড় কত, তা বোঝার জন্য এই তুলনাটাই যথেষ্ট। চলমান ট্রেনের সঙ্গে আরও অন্তত ২২শ যাত্রীবাহী কোচ সংযুক্ত করা যায়। এতে প্রতিদিন যাত্রীর সংখ্যা বাড়বে প্রায় ১ লাখ ৪৫ হাজার।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ও গণপরিবহণ বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল হক জানান, রেলের উন্নয়ন হতে হবে যাত্রীবাবন্ধব। অধিকাংশ প্রকল্পেই সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা নেই। পরিকল্পনাহীন প্রকল্পে যাত্রীদের স্বার্থ থাকে না। রেলওয়ে কর্মকর্তা তথা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা শুধু প্রকল্পের গ্রহণ বাস্তবায়নের দিকে দৌড়াচ্ছে। নতুন রেলপথ নির্মাণে মরিয়া হয়ে উঠছে। কিন্তু, চলমান রেলপথ রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কারে যেন কারওই মাথাব্যথা নেই। কারণ, প্রকল্প হলেই পিডি (প্রকল্প পরিচালক) হওয়া থেকে শুরু করে নানা সুবিধা মেলে। চলমান রেলপথ যথাযথ সংস্কার, ইঞ্জিন-কোচ সংগ্রহ, লোকবল নিয়োগ এবং সুদূর পরিকল্পনায় প্রকল্প গ্রহণ বাস্তবায়ন বেশি জরুরি।

রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, রেলে বর্তমান সরকার যে উন্নয়ন করছে, বিগত কোনো সরকার তা করেনি। চলমান প্রকল্পগুলো সমাপ্ত হলে রেলে আমূল পরিবর্তন আসবে। তাছাড়া রেল সাধারণ মানুষের গণপরিবহণ, এখানে লাভ-লোকসান বড় কিছু নয়। আমরা চাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করে, সেবা বাড়াতে। ইঞ্জিন-কোচ ক্রয় চলমান রয়েছে। বর্তমান সরকার নতুন ট্রেন পরিচালনাসহ, নতুন রেলপথ নির্মাণ করছে। নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিনা টিকিটে ভ্রমণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। উন্নয়ন প্রকল্পে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেওয়া হবে না। বর্তমান সরকার রেলকে বিশ্বে একটি আধুনিক রেল হিসাবে দাঁড় করতে কাজ করছে।

সূত্র:যুগান্তর


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।