রেলের ইঞ্জিন ফেইলিউর বাড়লেও দায় নেই কারও!

রেলের ইঞ্জিন ফেইলিউর বাড়লেও দায় নেই কারও!

ইসমাইল আলী: রাজশাহী-বাংলাবান্ধা রুটে চলাচল করে বাংলাবান্ধা এক্সপ্রেস (৮০৩ আপ ও ৮০৪ ডাউন) ট্রেন। গত ৮ নভেম্বর ট্রেনটিতে ৬৫১৩নং ইঞ্জিন সংযুক্ত ছিল। রাজশাহী থেকে ছেড়ে যাওয়া ৮০৩নং আপ ট্রেনটি মাধনগর স্টেশনে পৌঁছালে ৩নং বিয়ারিংয়ের এক্সেল বক্স সিজ্ড হয়ে ইঞ্জিনটি বিকল হয়ে যায়।

পরে ৬৫০২নং ইঞ্জিন থেকে একটি ট্রলি পরিবর্তন করে ৬৫১৩নং ইঞ্জিনটি ফিট প্রদান করা হয়। যদিও এ ঘটনায় কাউকে দায়ী করা হয়নি। বরং বস্তুগত বিকলতা বলে দায় এড়িয়ে যান সংশ্লিষ্টরা। অথচ ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় ট্রেনটির বিলম্ব হয় চার ঘণ্টা ১০ মিনিট।

একই ধরনের ঘটনা ঘটে খুলনা-চিলাহাটি রুটে চলাচলকারী রূপসা এক্সপ্রেস (৭২৭ ও ৭২৮) ট্রেনে। ওইদিন ৬৪০৩নং ইঞ্জিন নিয়ে খুলনা থেকে ৭২৭ আপ ট্রেন যাত্রা শুরু করে। তবে নীলফামারী স্টেশনে ইঞ্জিন কুলিং ওয়াটারের সব পানি পড়ে গিয়ে ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। এতে ট্রেনটির বিলম্ব হয় এক ঘণ্টা ৫৫ মিনিট।

পরে ইঞ্জিনটি পার্বতীপুর লোকোশেডে আসার পর চেক করে দেখা যায়, এল-৮ সিলিন্ডারের পিস্টন, কানেক্টিং রড ও সিলিন্ডার লাইনার ভেঙে গিয়ে পানি পড়ে যাওয়ায় ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায়। তবে এ ঘটনায় কাউকে দায়ী করা হয়নি। বরং বস্তুগত বিকলতা বলে দায় এড়িয়ে যান সংশ্লিষ্টরা।

ইঞ্জিন ফেইলিউরের দায় এভাবেই এড়িয়ে যাচ্ছে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা। যদিও ইঞ্জিন ফেইলিউর বেড়ে গেছে। গত ৩০ ডিসেম্বর রেলভবনে অনুষ্ঠিত অপারেশনাল রিভিউ মিটিংয়ে (ওআরএম) এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে জানানো হয়, গত অক্টোবর ও নভেম্বরে পশ্চিমাঞ্চলে ১৭টি ইঞ্জিন বিকল হয়। এর মধ্যে নভেম্বরে ৯টি ইঞ্জিন বিকল হয়। অথচ ২০১৯ সালের ইঞ্জিন বিকল হয়েছিল মাত্র দুটি।

বৈঠকের তথ্যমতে, চলতি বছর নভেম্বরে ইঞ্জিন ফেইলিউরের ৯টির মধ্যে ছয়টি ছিল পাকশীতে ও তিনটি লালমনিরহাট বিভাগে। আর ৯টি ইঞ্জিন ফেইলিউরের মধ্যে ছয়টির জন্যই দায়ী করা হয়েছে বস্তুগত বিকলতাকে। বাকি তিনটি ইঞ্জিন ফেইলিউরে রেলওয়ের বিভিন্ন বিভাগের কর্মচারীদের দায়ী করা হয়েছে। তবে কোনো কর্মকর্তাকে এক্ষেত্রে দায়ী করা হয়নি। এছাড়া দায়ীদের কারও শাস্তিও হয়নি।

বৈঠকের তথ্যমতে, নভেম্বরে পশ্চিমাঞ্চলে প্রথম ইঞ্জিন ফেইলিউর হয় পদ্মা এক্সপ্রেসে (৭৫৯ আপ ট্রেন)। গত ১ নভেম্বর ঢাকা থেকে রাজশাহীর পথে রওনা হওয়া ট্রেনটিতে ৬৫০৮নং ইঞ্জিন যুক্ত ছিল। বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব স্টেশনে পৌঁছানোর পর ৫নং ট্রাকশন মোটরের ফিল্ড কানেকশন জ্বলে যাওয়ায় ইঞ্জিন হুইল স্লিপ করে। পরে আর ইঞ্জিনটি মুভ করেনি।

পরে লোকোমাস্টার ও সহকারী লোকোমাস্টার এএমই (লোকো), ঈশ্বরদী এসএসএই (এম), রাজশাহীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ৫নং ট্রাকশন মোটর কেটে ইঞ্জিনটি এক ঘণ্টা পর চালু করা হয়। এ বিকলতার জন্য রেলের এলএম ও এএলএমকে দায়ী করা হয়। এ ঘটনায় তিন ঘণ্টা চার মিনিট বিলম্ব হয় ট্রেনটির।

একই ধরনের ঘটনা ঘটে ১৩ নভেম্বর খুলনা-চিলাহাটি রুটে চলাচলকারী সীমান্ত এক্সপ্রেস (৭৪৭নং আপ) ট্রেনে। ওইদিন খুলনা থেকে ট্রেনটি যাত্রা শুরুর সময় ৬৪০৫ ইঞ্জিন যুক্ত ছিল। ট্রেনটি দর্শনা জংশন হয়ে চুয়াডাঙ্গা স্টেশনে গেলে মেশিন ফিল্টার হাউজিং লিকেজ হয়ে ইঞ্জিনের লুব অয়েল পড়ে গিয়ে বিকল হয়ে যায়। এতে দুই ঘণ্টার বেশি বিলম্ব হয় ট্রেনটির।

ইঞ্জিনটি ঈশ্বরদী লোকোশেডে গেলে পরীক্ষা করে দেখা যায়, লুব অয়েল ফিল্টার হাউজিংয়ের বাইপাস পাইপলাইনের আরমোর্ড গ্যাসকিট ফেটে লুব অয়েল পড়ে যায়। পরে আরমোর্ড গ্যাসটি পরিবর্তন করে লোকোমোটিভটি ফিট করা হয়। এ ঘটনার জন্য খুলনা লোকোশেডের ফিটিং কর্মচারীদের দায়ী করা হয়।

এর বাইরে সান্তাহার-বুড়িমারী রুটে চলা করতোয়া এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয় ২৭ নভেম্বর। ৭১৩ আপ ট্রেনটি বুড়িমারী পৌঁছানোর পর ৭১৪ হিসেবে ড্রাউন ট্রেনের কাজ করতে গিয়ে দেখা যায়, ইঞ্জিন ফরমোস্টে (লংহডে) মুভ করে না এবং প্রচুর স্লিপ করে। পরে ডেড অবস্থায় লালমনিরহাট লোকোশেডে গেলে পরীক্ষা করে রিভার্স কন্টাক্টের ২নং কন্টাক্টের মাঝে শুকনো পাতা পাওয়া যায়। পাতাটি সরিয়ে ইঞ্জিন কার্যোপযোগী করা হলেও ট্রেনটির বিলম্ব হয় তিন ঘণ্টা ২০ মিনিট। যদিও শুকনো পাতার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের দায়ী করা হয়েছে।

এদিকে ২৬ নভেম্বর রাজশাহী-চিলাহাটি রুটে চলা বরেন্দ্র এক্সপ্রেসের (৭৩২ ডাউন) ইঞ্জিন বিকল হয়। সে সময় ট্রেনটিতে ৬৫১৪নং ইঞ্জিন যুক্ত ছিল। চিলাহাটি থেকে ছেড়ে আসা ট্রেনটি সাহাগোলা স্টেশনে ইঞ্জিন শাটডাউন হয়ে বিকল হয়ে যায়। এতে ৬৫১৩নং রিলিফ ট্রেন পাঠিয়ে কাজ করানো হয়। তবে দুই ঘণ্টা ১৩ মিনিট ট্রেনটি আটকে ছিল।

পরে ৬৫১৪ মৃত অবস্থায় ঈশ্বরদী লোকোশেডে আসার পর চেক করিয়া দেখা যায়, এমইপি এমসিসি কার্ড খারাপ। সেই কার্ড পরিবর্তন করে ইঞ্জিনটি ফিট করা হয়। তবে এ ঘটনায় কাউকে দায়ী করা হয়নি, বরং বস্তুগত বিকলতা দেখানো হয়েছে।

একইভাবে ২৯ নভেম্বর বিকল হয় ঢাকা-চাঁপাইনবাবগঞ্জ রুটে চলা বনলতা এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন। ৬৫০৬নং ইঞ্জিন নিয়ে ডাউন ট্রেনটি চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হওয়ার আগে কাজ করার সময় দেখা যায় একটি ট্রাকশন মোটর কম আছে। এর পরও ট্রেনটি রওনা হলে ওই লাইন আপগ্রেডিং এবং ঘন কুয়াশার কারণে হুইল স্লিপ হয়ে লোকো লস হিসাবে এক ঘণ্টা ১০ মিনিট হওয়ার কারণে লোকো বিকলতা হিসেবে গণ্য হয়। কিন্তু এ ঘটনায়ও কাউকে দায়ী করা হয়নি, বরং বস্তুগত বিকলতা দেখানো হয়েছে।

এদিকে ইন্ডিপেনডেন্ট ব্রেক ভাল্ব রিলিজ না হওয়ায় ১১ নভেম্বর বিকল হয় দিনাজপুর কমিউটার (৬১ আপ)। এতে এক ঘণ্টা ২০ মিনিট বিলম্ব হয় ট্রেনটি। আর ২৬ নভেম্বর বিকল হয় সান্তাহার আপ ট্রেনের ২৩০৩নং ইঞ্জিন। লো-ভোল্টেজ গ্রাউন্ডের জন্য পার্বতীপুর শেডে এটি পরীক্ষা করা যায়নি। কিন্তু এ দুই ঘটনার জন্য কাউকে দায়ী করা হয়নি, বরং বস্তুগত বিকলতা দেখানো হয়েছে।

জানতে চাইলে রেলওয়ের মহাব্যবস্থাপক (পশ্চিমাঞ্চল) মিহির কান্তি গুহ শেয়ার বিজকে বলেন, রেলের ইঞ্জিন ফেইলিউরের প্রতিটি ঘটনার জন্য পৃথক তদন্ত কমিটি করা হয়। তারা সবকিছু বিচার-বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদন জমা দেয়। পরে তা ঢাকায় রেলভবনে পাঠানো হয় এবং ওআরএম মিটিংয়ে তা উপস্থাপন করা হয়। বেশিরভাগ ইঞ্জিন ফেইলিউরের পেছনেই বস্তুগত কারণ থাকে। এখানে কেউ দায়ী থাকে না। রেলওয়ের মহাপরিচালক নিজেই মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, এছাড়া অতিরিক্ত মহাপরিচালক (আরএস) আছেন। তাই এখানে চাইলেও ফাঁকি দেয়ার সুযোগ নেই।

সূত্র:শেয়ার বিজ, জানুয়ারী ৭, ২০২১


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।