রেলের আয় বাড়াতে বাধা যান্ত্রিক বিভাগ

রেলের আয় বাড়াতে বাধা যান্ত্রিক বিভাগ

সাইদ সবুজ:
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে প্রথম শ্রেণির আন্তঃনগর ট্রেনে সর্বোচ্চ ২২টি করে কোচ সংযোজনের সুযোগ রয়েছে, যা ট্রেনের টাইম-টেবিল বইয়ে উল্লেখ আছে। কিন্তু যান্ত্রিক বিভাগের অনীহার কারণে স্ট্যান্ডার্ড কম্পোজিশন অনুযায়ী ট্রেন চালানো যাচ্ছে না। ফলে যাত্রী চাহিদার পরও ১৬ থেকে ১৮ কোচের মধ্যে চলছে আন্তঃনগর ট্রেন।
এতে যাত্রীরা রেলের সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। আর রেলের আয়ও কমছে। আবার কখনও বিশেষ নির্দেশনায় ২০ থেকে ২১ কোচ চলাচল করলেও যান্ত্রিক ত্রুটির আশঙ্কা তুলে ধরেন যান্ত্রিক বিভাগের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা।

রেলের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তা জানান, একটি ট্রেন চট্টগ্রাম থেকে ১৪টি কোচ নিয়ে ঢাকা গেলে যে পরিবহন খরচ হয়, ২২ কোচ নিলেও একই খরচ। তবে কোচ বেশি হলে রেলের আয় বাড়ে এবং সরকারের ভর্তুকি কমে, অন্যদিকে যাত্রীরাও চাহিদা অনুযায়ী টিকিট পান। কিন্তু যান্ত্রিক বিভাগের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি না থাকায় যাত্রীসেবা ব্যাহত হচ্ছে। তারা বলছেন, সড়কে দুর্ঘটনা বৃদ্ধি ও দীর্ঘ যানজটের ক্ষেত্রে নিরাপদ বাহন হিসেবে ট্রেন বিবেচিত। ফলে জনগণকে রেলসেবা দিতে না পারলে সরকারে ভাবমূর্তি ক্ষুণ হবে।

বাণিজ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, তিন দিনের সরকারি ছুটি এবং চট্টগ্রাম মহানগর এক্সপ্রেস ট্রেনের সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় গত ১৪ এপ্রিল সোনার বাংলা ও তূর্ণা নিশিথায় যাত্রীদের চাহিদা ছিল খুব বেশি। তাই সোনার বাংলায় চারটি এবং তূর্ণায় ছয়টি অতিরিক্ত কোচ সংযোজন করে পরিবহন বিভাগ। সোনার বাংলা ট্রেন বিকাল ৫টায় ছেড়ে যাওয়ার পর তূর্ণার অতিরিক্ত বগি সংযোজনে অস্বীকৃতি জানান প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী। অথচ ওইদিন সকালেই সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়। এতে বিব্রতকর অবস্থায় পড়ে পরিবহন বিভাগ। পরে অপ্রীতিকর ঘটনার আশঙ্কায় বগিগুলো দেওয়া হয়। অতিরিক্ত ছয় বগিতে রেলের এক দিনে প্রায় তিন লাখ টাকা বেশি আয় হয়েছে। কিন্তু ওই দিনের পর থেকে ১৬ বগির অতিরিক্ত সংযোজন করতে হলে প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলীর অনুমোদন লাগবে বলে একটি কন্ট্রোল অর্ডার জারি করা হয়, যা বেআইনি ও বিধিবহির্ভূত। কারণ রেলওয়ের টাইমটেব্ল অনুযায়ী সর্বোচ্চ ২২টি বগি লাগানোর ক্ষমতা প্রধান পরিবহন কর্মকর্তাকে দেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক যান্ত্রিক বিভাগের অজুহাতকে আমলে নেওয়ার কারণে এ ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। যাত্রীসেবা বাড়াতে তারও আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।
জানা গেছে, গত ঈদুল আজহার আগে পাঁচ দিন এবং পরে আট দিনে অতিরিক্ত কোচ লাগিয়ে আয় হয়েছে তিন কোটি ১৩ লাখ ২৩ হাজার টাকা। এর মধ্যে ঈদের আগে পাঁচ দিনে আয় হয়েছে এক কোটি ২০ লাখ ৪৭ হাজার এবং পরের আট দিনে আয় হয়েছে এক কোটি ৯২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা। অতিরিক্ত কোচ না লাগালে এ আয় থেকে বঞ্চিত হতে হতো। এতে সরকারের ভর্তুকি বাড়ত।
এদিকে অতিরিক্ত কোচ সংযোজনে যান্ত্রিক বিভাগের অজুহাতে বিরক্ত রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের পরিবহন ও বাণিজ্যিক বিভাগ। এ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রতি বছর যাত্রী খাতে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। অন্যদিকে রেলভ্রমণে যাত্রীদের চাহিদাও বাড়ছে। তাই এ বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

যান্ত্রিক বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, রেল ভবনের নির্দেশনামতো কোচ ও ইঞ্জিন বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। তবে কোচসংখ্যা বাড়লে পথিমধ্যে ইঞ্জিনের যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে, কারণ অধিকাংশ ইঞ্জিনের লাইফ টাইম শেষ হয়ে গেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা জানান, টাইম-টেব্ল বইয়ে ২২টি করে কোচ চালানোর সিদ্ধান্ত থাকলেও অতিরিক্ত বগি সংযোজনের ক্ষেত্রে প্রধান পরিবহন কর্মকর্তা যান্ত্রিক বিভাগের মৌখিক অনুমতির জন্য ফোন করেন। এতে তারা অধিকাংশ সময়ে সমস্যা তুলে ধরেন। ওই কর্মকর্তা জানান, প্রধান পরিবহন কর্মকর্তা যান্ত্রিক বিভাগের অনুমতি ছাড়াই ২২টি কোচ দিয়ে ট্রেন চালাতে পারেন।

অতিরিক্ত কোচ সংযোজনের অনুমতি চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (লোকো) রাজিব কুমার দেবনাথ সংশ্লিষ্ট শাখাকে জানান, ঈদ-পরবর্তী প্রায় ট্রেনে অতিরিক্ত কোচ লাগানো হচ্ছে। ফলে নির্দিষ্ট গতি মেনে ট্রেন চালানো সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া ইঞ্জিনে বিভিন্ন ত্রুটি দেখা দিচ্ছে।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী মিজানুর রহমানের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
উল্লেখ্য, গত বছর ৩১ জুলাই রেল ভবনে অনুষ্ঠিত মাসিক পর্যালোচনা সভায় রেলের তৎকালীন মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন রাজস্ব আয় বাড়াতে যেসব ট্রেনে যাত্রী চাহিদা বেশি এবং আয় বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে, সেসব ট্রেনে কোচ কম্পোজিশন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন, কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে না।

শেয়ার বিজ,এপ্রিল ১৭, ২০১৯

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।