শিরোনাম

অর্থায়ন অনিশ্চয়তায় ঝুলে যাচ্ছে হাইস্পিড ট্রেন!

অর্থায়ন অনিশ্চয়তায় ঝুলে যাচ্ছে হাইস্পিড ট্রেন!

ইসমাইল আলী: ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে হাইস্পিড ট্রেন চালুর পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এতে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম এক ঘণ্টায় যাতায়াত সম্ভব হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। তবে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে সহজলভ্য কোনো অর্থায়নের উৎস পাচ্ছে না রেলওয়ে। আর উচ্চ নির্মাণব্যয়ের কারণে এ ট্রেনে ভাড়াও হবে অনেক বেশি। ফলে ঝুলে যেতে বসেছে হাইস্পিড ট্রেন প্রকল্পটি।

সম্প্রতি প্রকল্পটির অর্থায়নের বিষয়ে মতামত চেয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে রেলওয়ে। তবে মন্ত্রণালয়ও এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না। ফলে প্রধানমন্ত্রীর দ্বারস্থ হতে যাচ্ছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

চিঠিতে বলা হয়, হাইস্পিড ট্রেন চালুর লক্ষ্যে রেলপথ নির্মাণে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও নকশা প্রণয়নের কাজ শেষ হয়েছে। যথাযথ কর্তৃপক্ষ তা অনুমোদন করেছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে বিদ্যমান ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথে যাত্রীবাহী ট্রেনের পরিবর্তে পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করা সম্ভব হবে। অপরদিকে দ্রুতগতির রেলপথে এক ঘণ্টায় ঢাকা-চট্টগ্রাম যাতায়াত করা সম্ভব হবে। এতে ঘণ্টায় ৫০ হাজার যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব। ২০৫০ সালে তা এক লাখ ২৮ হাজারে উন্নীত করা যাবে।

নকশা অনুযায়ী, রেলপথটির ৯৬ শতাংশ উড়ালপথে (এলিভেটেড) হওয়ায় কৃষিজমি দরকার হবে অনেক কম। এ রেলপথের দৈর্ঘ্য হবে ২২৪ দশমিক ৬২৪ কিলোমিটার ও ডিজাইন স্পিড ৩০০ কিলোমিটার। আর সম্পূর্ণ পথে পাঁচটি স্টেশন (ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা, ফেনী ও চট্টগ্রাম) রয়েছে। দ্রুতগতির (বুলেট) ট্রেন কেনা ও অন্যান্য ব্যয়সহ প্রকল্পটি সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ১১১ কোটি ৩২ লাখ ডলার। প্রকল্পটির ইআইআরআর (ইকোনমিক ইন্টারনাল রেট অব রিটার্ন) ১৫ দশমিক ০৯ শতাংশ।

চিঠিতে আরও বলা হয়, প্রকল্পটি একটি বৃহৎ প্রকল্প। এটি বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়নকারী সংস্থা, যেমন বিশ্বব্যাংক, এডিবি (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক), জাইকা (জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা) প্রভৃতি সংস্থা থেকে সহজ শর্তে ঋণ নেয়া বা উন্নয়ন সহযোগী দেশের সঙ্গে জিটুজি চুক্তি বা পিপিপি-জিটুজি (সরকারি পর্যায়ে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব) চুক্তি অথবা পিপিপি-বিওটি, বিওওটি (বিল্ড অপারেট ট্রান্সফার, বিল্ড ওন অপারেট ট্রান্সফার) পদ্ধতি অবলম্বন করা যেতে পারে। এ অবস্থায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কোন পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে, তা নির্ধারণপূর্বক সে অনুযায়ী পরবর্তী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।

রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে শেয়ার বিজকে জানান, হাইস্পিড ট্রেন চালুর প্রকল্পটি হবে রেলের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প। বাংলাদেশের ইতিহাসেও এটি দ্বিতীয় বৃহৎ প্রকল্প হবে। ২০১৮ সালে চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন ইন্টারন্যাশনাল (সিআরসিসিআই) প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আগ্রহ দেখিয়েছিল। সে সময় এমওইউ সই করা হলেও তা নিয়ম মেনে না করায় আপত্তি তোলে চীনের দূতাবাস। এর পরিপ্রেক্ষিতে এমওইউটি বাতিল করা হয়। এরপর তিন বছরে ২/১টি দেশি-বিদেশি কোম্পানি মৌখিকভাবে আগ্রহ দেখালেও বাস্তবিকভাবে কোনো প্রস্তাব আসেনি।

তারা আরও জানান, প্রায় এক লাখ কোটি টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন বেশ ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ এর ইআইআরআর গ্রহণযোগ্য মাত্রার (২০%) চেয়ে কম। তাই এত বড় প্রকল্পে কোনো দাতা সংস্থা অর্থায়ন করবে নাÑএটাই স্বাভাবিক। আবার পিপিপিতেও এ প্রকল্পটির বাস্তবায়ন টেকসই (ভায়াবল) হবে না। এক্ষেত্রে টেকসই করতে গেলেও বড় অঙ্কের ভিজিএফ (ভায়াবিলিটি গ্যাপ ফান্ড) সরকারকে বিনিয়োগ করতে হবে। ফলে জিটুজি হতে পারে একমাত্র অর্থায়ন উৎস। কিন্তু এখনো কোনো দেশই এ বিষয়ে আগ্রহ দেখায়নি। ফলে প্রকল্পটি ঝুলে যেতে বসেছে।

জানতে চাইলে রেলওয়ের মহাপরিচালক ডিএন মজুমদার বলেন, হাইস্পিড রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পে অর্থায়নের বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের মতামত চাওয়া হয়েছে। মতামত পাওয়া গেলে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে। এ বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয় সচিব সেলিম রেজা বলেন, বুলেট ট্রেন প্রকল্পটি অনেক ব্যয়বহুল হওয়ায় বিকল্প ভাবা হচ্ছে।

এ বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অত্যধিক নির্মাণব্যয় হওয়ায় হাইস্পিড রেলপথ নিয়ে মন্ত্রণালয়ও কোনো মতামত দিতে পারেনি। এ বিষয়ে শিগগিরই মন্ত্রীর সভাপতিত্বে রেলওয়ে ও মন্ত্রণালয়ের যৌথ সভা অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেও এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া না গেলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য প্রধানমন্ত্রীর মতামত চাওয়া হবে।

হাইস্পিড ট্রেনের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের তথ্যমতে, এ ট্রেনের জন্য বিশেষ ধরনের রেলপথ নির্মাণ করা হবে, যা হবে ব্যালাস্টলেস (পাথরবিহীন) কনক্রিটের তৈরি। ডাবল লাইনের এ রেলপথের এক্সেল লোড ধরা হয়েছে ১৭ টন। বৈদ্যুতিক এ পথ হবে স্ট্যান্ডার্ডগেজ তথা এক হাজার ৪৩৫ মিলিমিটারের। আর নারায়ণগঞ্জের কাছে একটি ডিপো নির্মাণ করা হবে।

নির্মাণব্যয়ের মধ্যে সরকারি তহবিল থেকে সরবরাহ করতে হবে ৪৪৬ কোটি ৪৯ লাখ ডলার। আর বৈদেশিক বিনিয়োগ দরকার হবে ৬৬৪ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। ভর্তুকি না দিলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে ভাড়া হবে তিন হাজার টাকার বেশি। দ্বিতীয় পর্যায়ে এ রেলপথটি চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সম্প্রসারণের সুপারিশও করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম হাইস্পিড ট্রেনের বিকল্প হিসেবে ঢাকা-লাকসাম কর্ডলাইন ও ঢাকা-চট্টগ্রাম ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন নিয়ে ভাবছে রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, কর্ডলাইন নির্মাণের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রকল্প এরই মধ্যে অনুমোদন হয়েছে। এর পাশাপাশি ইলেকট্রিক ট্র্যাকশন করা গেলে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানো যাবে। এতে দুই ঘণ্টায় ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম যাওয়া যাবে। আবার খরচও লাগবে হাইস্পিড ট্রেনের অর্ধেকের কম, যা হবে টেকসই একটি প্রকল্প। তাই হাইস্পিড ট্রেনে বিনিয়োগ না পাওয়া গেলে বিকল্প হিসেবে এ দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে।

সূত্র:শেয়ার বিজ, ২৭ ডিসেম্বর ২০২১

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।