অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বিশ্বব্যাংকের আগ্রহ রেলের বাণিজ্যিকীকরণে

অবকাঠামো উন্নয়ন নয়, বিশ্বব্যাংকের আগ্রহ রেলের বাণিজ্যিকীকরণে

শামীম রাহমান : বিদ্যমান রেলপথের উন্নয়ন, নতুন রেলপথ, ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি), কারখানা নির্মাণসহ অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য আটটি প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের কাছে বিনিয়োগের প্রস্তাব করেছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। এগুলোর মধ্যে তিনটিতে আগ্রহ দেখিয়েছে বিশ্বব্যাংক। রেলের প্রস্তাবে ছিল না এমন আরো দুটি উদ্যোগের সঙ্গেও যুক্ত হতে চাইছে সংস্থাটি। সব মিলিয়ে বিশ্বব্যাংক যে পাঁচটি উদ্যোগে সম্পৃক্ত হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে, তাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বদলে প্রাধান্য পেয়েছে পরিচালন ব্যবস্থা বাণিজ্যিকীকরণের মতো বিষয়গুলো।

চট্টগ্রাম-দোহাজারীর বিদ্যমান মিটার গেজ রেলপথটি ডুয়াল গেজে রূপান্তর, লাকসাম-চিনকি-আস্তানার বিদ্যমান মিটার গেজ রেলপথকে ডুয়াল গেজে রূপান্তর, পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধার মধ্যে নতুন রেলপথ নির্মাণ, পতেঙ্গায় বে টার্মিনাল রেল সংযোগ তৈরি, ধীরাশ্রমে আইসিডি নির্মাণ, দাড়িপাড়ায় রেলওয়ের কারখানা নির্মাণ, রেলওয়ের ইনভেন্টরি কন্ট্রোল সিস্টেমের অটোমেশন এবং ঢাকায় রেলওয়ে ট্রেনিং অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের কাছে বিনিয়োগ প্রস্তাব করেছিল বাংলাদেশ রেলওয়ে। গত ২ আগস্ট বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল ডিরেক্টর (সাউথ এশিয়া) অব ইনফ্রাস্ট্রাকচার গুয়াংজে চেনের সঙ্গে এক ভার্চুয়াল সভায় প্রকল্পগুলোয় বিনিয়োগের প্রস্তাব করেন বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ডিএন মজুমদার।

প্রস্তাবগুলোর মধ্যে ঢাকা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত বে টার্মিনাল কানেক্টিভিটি, ধীরাশ্রম আইসিডি ও বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল (বিবিআইএন) কানেক্টিভিটির জন্য পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা রেলপথের উদ্যোগে সাড়া দিয়েছে বিশ্বব্যাংক। এগুলোর বাইরে রেলওয়ের অধীনস্থ সংস্থা কনটেইনার কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (সিসিবিএল) প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কমলাপুর, তেজগাঁও ও বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশনকে মাল্টিমোডাল হাব হিসেবে তৈরির উদ্যোগেও আগ্রহ প্রকাশ করেছে সংস্থাটি। গতকাল বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ডিএন মজুমদার বরাবর পাঠানো এক ই-মেইলে উদ্যোগগুলোর বিষয়ে আগ্রহের কথা জানিয়েছেন বিশ্বব্যাংকের প্রোগ্রাম লিডার (ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফর বাংলাদেশ অ্যান্ড ভুটান) রাজেশ রোহাতগী।

ই-মেইলে তিনি উল্লেখ করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলো চিহ্নিত করার জন্য বিশ্বব্যাংকের একটি দল রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে আগ্রহী। পাশাপাশি উদ্যোগগুলো নিয়ে রেলওয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক ‘নলেজ শেয়ারিং ইভেন্ট’ আয়োজনেও আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তিনি। এসব ইভেন্টে রেলওয়ের পরিচালন ব্যবস্থার বাণিজ্যিকীকরণ এবং মাল্টিমোডাল হাবগুলো যথাযথভাবে পরিচালনার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। ইভেন্টগুলোতে সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশনার পাশাপাশি বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে আলোচনার জন্য রেলওয়ের একটি দলকে মনোনীত করতে মহাপরিচালককে আহ্বান জানিয়েছেন রাজেশ রোহাতগী।

এর আগে গত ২৩ আগস্ট রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব সেলিম রেজাকে একটি চিঠি দেন বিশ্বব্যাংকের রিজিওনাল ডিরেক্টর (সাউথ এশিয়া) অব ইনফ্রাস্ট্রাকচার গুয়াংজে চেন। চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, সবুজ, স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকার রেলওয়ে খাতটিকে নিয়ে যেভাবে পরিকল্পনা করছে, তা বিশ্বব্যাংকের লক্ষ্যের সঙ্গেও সংগতিপূর্ণ। আমরা পরিবহন খাতকে কার্বনমুক্ত করার উদ্যোগগুলোকে সহযোগিতা করতে চাই। এক্ষেত্রে সবচেয়ে ভালো হতে পারে বাণিজ্যিকভিত্তিক রেলওয়ে ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

তিনি আরো বলেন, ঢাকা থেকে পতেঙ্গা বে টার্মিনাল পর্যন্ত বাণিজ্যিকভাবে কনটেইনার পরিবহন, বিবিআইএনভুক্ত দেশগুলোয় বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূমিকা উন্নত করা এবং ‘ক্রেডিট এনহ্যান্সমেন্ট’ এবং পিপিপির মতো বিভিন্ন টুল ব্যবহার করে বিভিন্ন বিনিয়োগ কর্মসূচিতে রেলওয়েকে বেসরকারি ঋণের ব্যবস্থা করে দেয়ার মতো ইস্যুগুলো নিয়ে বিশ্বব্যাংক আলোচনায় আগ্রহী।

 পাশাপাশি বাংলাদেশ রেলওয়ের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থাপনা শক্তিশালীকরণ, প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধি, তথ্য-প্রযুক্তিগত উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে কারিগরি সহায়তা ও সম্ভাব্য অর্থায়নের বিষয়গুলো বিবেচনায় রাখার কথা বলেছেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের কাছে বিনিয়োগের জন্য রেলওয়ের প্রস্তাব এবং পরবর্তী সময়ে প্রস্তাবগুলোর আলোকে বিশ্বব্যাংকের আগ্রহের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ডিএন মজুমদার বণিক বার্তাকে বলেন, বিষয়গুলো এখনো প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে। এখন পর্যন্ত যেটুকু অগ্রগতি হয়েছে তা মৌখিক আলোচনা এবং ই-মেইলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। তবে বিষয়গুলো নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে উদ্যোগী হতে চাইছে। রেলওয়ের উন্নয়নের জন্য যেকোনো উন্নয়ন সহযোগীর বিনিয়োগকে আমরা স্বাগত জানাই।

প্রসঙ্গত, বিনিয়োগ ও কারিগরি সহায়তা মিলে বর্তমানে ৩৯টি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর মধ্যে ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকার ১৩টি বিনিয়োগ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে জিওবি তহবিল থেকে।

 পাঁচটি প্রকল্পে ২২ হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। যমুনা নদীর ওপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু নির্মাণে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) দিয়েছে ১২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা। রোলিং স্টক সংগ্রহের একটি প্রকল্পে ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড (ইডিসিএফ) ঋণ দিয়েছে ১ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা। ছয়টি প্রকল্পে ১১ হাজার ৩৩ কোটি টাকা ভারত দিয়েছে লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি) মাধ্যমে। জিটুজি ভিত্তিতে তিনটি প্রকল্পে ২৯ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণ দিয়েছে চীন। টেন্ডারার্স ফাইন্যান্সিং ও ভারত সরকারের ঋণে চলমান আছে একাধিক প্রকল্প। চলমান প্রকল্পগুলোতে বিশ্বব্যাংকের কোনো বিনিয়োগ নেই।

সূত্র:বণিক বার্তা, সেপ্টেম্বর ১৩, ২০২১


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।