স্বাধীন পর্যালোচনার নামে দুর্নীতি আড়ালের চেষ্টা!

স্বাধীন পর্যালোচনার নামে দুর্নীতি আড়ালের চেষ্টা!

ইসমাইলআলীদক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেমের সরবরাহকৃত ১০ মিটারগেজ লোকোমোটিভে (ইঞ্জিন) চুক্তি অনুযায়ী বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংযোজন করা হয়নি। এজন্য গত বছর আগস্টে দেশে এলেও ইঞ্জিনগুলো গ্রহণ করা হয়নি। এক্ষেত্রে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি ইঞ্জিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান হুন্দাই রোটেম ও প্রি-শিপমেন্ট ইন্সপেক্টর সিঙ্গাপুরের সিসিআইসিকে অভিযুক্ত ও শাস্তির সুপারিশ করে। গত ফেব্রুয়ারিতে এ সুপারিশ করা হলেও এখনও কারোরই শাস্তি হয়নি।

পরবর্তী সময়ে রেলওয়ের গঠিত কারিগরি কমিটিও ইঞ্জিনগুলো গ্রহণে আপত্তি তোলে। তারা ইন্ডিপেনডেন্ট রিভিউয়ার নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমে ইঞ্জিনগুলো যাচাইয়ের সুপারিশ করে। যদিও গোপনে ইন্ডিপেনডেন্ট রিভিউয়ার নিয়োগ করে তাদের মাধ্যমে ইঞ্জিনগুলো গ্রহণ করার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করেছে রেলওয়ে। এর মাধ্যমে ইঞ্জিনগুলো কেনায় অনিয়ম আড়াল করা হচ্ছে।

এদিকে ইঞ্জিনগুলো কেনায় দুর্নীতি বিষয়ে তদন্তে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দুই দফা চিঠি দিলেও তার উত্তর দেয়নি রেলপথ মন্ত্রণালয়।

তথ্যমতে, ইঞ্জিনগুলো কেনায় ঋণ দিচ্ছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। গত জুনে এ ঋণের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। তবে এ মেয়াদ আর বাড়াতে রাজি নয় এডিবি। যদিও গ্রেস পিরিয়ড রয়েছে ছয় মাস। এ হিসেবে আগামী ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় আছে রেলওয়ের হাতে। তাই ইঞ্জিন সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেমকে দ্রুত মূল্য পরিশোধের পাঁয়তারা শুরু করেছে সংশ্লিষ্টরা।

১০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ) কেনায় হুন্দাই রোটেমের সঙ্গে ২০১৮ সালের ১৭ মে চুক্তি করে রেলওয়ে। চুক্তিমূল্য ছিল তিন কোটি ৭৯ লাখ ৬৩ হাজার ৪০০ ডলার বা প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ অর্থ অগ্রিম দেয়া হয়। বাকি অর্থের মধ্যে ইঞ্জিনগুলো দেশে আসার পর ৬৫ শতাংশ আর গুণগত মান যাচাই শেষে বাকি ১০ শতাংশ পরিশোধের শর্ত ছিল। তবে নিম্নমানের ইঞ্জিন সরবরাহের কারণে চুক্তিমূল্যের ৬৫ শতাংশ অর্থ আটকে দেন প্রকল্পটির তৎকালীন পরিচালক। নি¤œমানের ইঞ্জিন গ্রহণে অস্বীকৃতিও জানান তিনি। এর পরিপ্রেক্ষিতে তদন্ত কমিটি গঠন করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি রেলপথ সচিবের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয় ওই কমিটি।

এতে বলা হয়, ইঞ্জিনগুলো তৈরিতে কারিগরি শর্ত অনুসরণ করা হয়নি। ইঞ্জিন, অলটারনেটর, কম্প্রেসর ও ট্রাকশন মোটর এ চারটি ক্যাপিটাল কম্পোন্যান্টস চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ করা হয়নি। ফলে টেস্ট রানের সময় ইঞ্জিনের ব্রেক হর্সপাওয়ার ২২০০বিপিএইচ ও ট্রাকশন হর্সপাওয়ার ২০০০টিএইচপি হওয়ার কথা থাকলেও পাওয়া যায় যথাক্রমে ২১৭০বিপিএইচ ও ১৯৪২টিএইচপি। এজন্য হুন্দাই রোটেম ও সিসিআইসিকে অভিযুক্ত করা হয়। কোম্পানি দুটির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশও করা হয়। তবে কোম্পানি দুটির বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।

উল্টো নিম্নমানের ইঞ্জিনগুলো চালানোর উপযুক্ত কি না তা যাচাইয়ের জন্য ২৩ মার্চ কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে কারিগরি কমিটি। এতে বলা হয়েছে, হুন্দাই রোটেমের সরবরাহকৃত ১০ ইঞ্জিন বর্তমান অবস্থায় গ্রহণ করার সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে ইন্ডিপেনডেন্ট রিভিউয়ার নিয়োগের মাধ্যমে ইঞ্জিনগুলো যাচাই করে গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

কারিগরি কমিটির রিপোর্টের পরিপ্রেক্ষিতে গোপনে ইন্ডিপেনডেন্ট রিভিউয়ার নিয়োগ দেয় রেলওয়ে। আর ইঞ্জিনগুলো গ্রহণে কোনো জটিলতা নেই বলে জানায় সেই রিভিউয়ার। যদিও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটির নাম গোপন রেখেছে রেলওয়ে। সম্প্রতি ইন্ডিপেনডেন্ট রিভিউয়ারের প্রতিবেদনসহ ইঞ্জিনগুলো গ্রহণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর ইঞ্জিনগুলো গ্রহণ করা হবে বলে গতকাল জানান ১০ ইঞ্জিন প্রকল্পের পরিচালক হাসান মনসুর। তিনি শেয়ার বিজকে বলেন, ইন্ডিপেনডেন্ট রিভিউয়ার ইতিবাচক প্রতিবেদন দিয়েছে। তবে গোপনীয়তার স্বার্থে তার নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না। ওই প্রতিবেদনসহ ইঞ্জিনগুলো গ্রহণের প্রস্তাব মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় অনুমোদন করলে ইঞ্জিনগুলো গ্রহণ করে চালানো শুরু করা হবে।

আগের তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই প্রতিবেদন সম্পূর্ণ ভুল। তারা না বুঝেই চারটি কম্পোন্যান্টে ভুল ধরেছে। শুধু অলটারনেটর ছাড়া অন্য কোনো সমস্যা নেই। আর টিএ-৯ মডেলের অলটারনেটরই দুই হাজার হর্সপাওয়ারের জন্য উপযুক্ত। টিএ-১২ মডেলের অলটারনেটর দরকার নেই। তাই এখন ইঞ্জিনগুলো গ্রহণ করে চালানো শুরু করাই হলো মূল লক্ষ্য।

ত্রুটিপূর্ণ ইঞ্জিন গ্রহণের বিষয়ে জানতে রেলওয়ের মহাপরিচালক ডিএন মজুমদারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, সবকিছু সিস্টেম অনুযায়ী হচ্ছে। এর বেশি কিছু বলা সম্ভব নয়।

হুন্দাই রোটেমের বিরুদ্ধে কেন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি জানতে রেলপথ সচিব মো. সেলিম রেজার সঙ্গে সাক্ষাতের চেষ্টা করলেও তিনি সম্মত হয়নি। এছাড়া মোবাইল ফোনে কল করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

প্রসঙ্গত, গত বছর ৯ ডিসেম্বর ‘রেলওয়ের ১০ ইঞ্জিন কেনায় অনিয়ম: নিম্নমানের ইঞ্জিন সরবরাহ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম’ শীর্ষক প্রথম প্রতিবেদন প্রকাশিত হয় শেয়ার বিজে। পরে ইঞ্জিনগুলোর অনিয়ম নিয়ে আরও ৯টি প্রতিবেদন শেয়ার বিজে প্রকাশিত হয়।


সূত্র:শেয়ার বিজ, অগাস্ট ২৪, ২০২১ 


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।