সারা দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ রেল সেতু ১২৭০টি

সারা দেশে মেয়াদোত্তীর্ণ রেল সেতু ১২৭০টি

ইসমাইল আলী: বাংলাদেশ রেলপথ রয়েছে দুই হাজার ৮৭৭ কিলোমিটার। আর এসব পথে ছোট-মাঝারি ও বড় মিলিয়ে তিন হাজার ৬৫০টির বেশি রেল সেতু রয়েছে। এর মধ্যে এক হাজার ২৭০টি সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। তাই মেয়াদোত্তীর্ণ এসব রেল সেতুর ওপর দিয়ে ঝুঁকি নিয়ে চলছে ট্রেন। মাঝে মধ্যে এসব সেতু ধসে পড়ে ট্রেন যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়।

সূত্রমতে, রেলের পূর্বাঞ্চলের (ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগ) ৯টি সেকশনে (রুট) মেয়াদোত্তীর্ণ ঝুঁকিপূর্ণ রেল সেতু রয়েছে ৫০৫টি। এর মধ্যে ৬টি গুরুত্বপূর্ণ সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এছাড়া আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া মেজর (বড়) সেতু রয়েছে ৪৮টি ও মাইন (ছোট) সেতু ৪৫১টি।

এদিকে পশ্চিমাঞ্চলের (খুলনা, রাজশাহী, ময়মনসিংহ ও রংপুর বিভাগ) ৮টি সেকশনে (রুট) ১৪৪টি মেজর সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে বড় সেতু রয়েছে ১০টি। বাকি ১৩৪টি মাঝারি সেতু। আর মাইনর সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে ৬২১টির। সব মিলিয়ে পশ্চিমাঞ্চলে ৭৬৫টি রেল সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে।

আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া এসব সেতু পুনর্নির্মাণ ও পুনর্বাসনে দুটি পৃথক প্রকল্প নিতে যাচ্ছে রেলওয়ে। এর মধ্যে মেজরগুলোর স্থলে গার্ডার সেতু নির্মাণ করা হবে। আর মাইনর সেতুগুলোর স্থলে নির্মাণ করা হবে বক্স কালভার্ট। এজন্য পূর্বাঞ্চলের মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু পুনর্নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে দুই হাজার ৫৮২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আর পঞ্চিমাঞ্চলের সেতুগুলো পুনর্নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে চার হাজার ২৩২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা।

তথ্যমতে, পূর্বাঞ্চলে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুগুলোর মধ্যে চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রকৌশলীর অধীনে রয়েছে ১৬৪টি। এর মধ্যে ষোলশহর-নাজিরহাট সেকশনে আয়ুষ্কাল পেরিয়ে যাওয়া সেতু রয়েছে ৭৯টি। এ সেকশনটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৯২৭ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে। অর্থাৎ ৯০ বছরের বেশি পুরোনো এ সেকশনের সেতুগুলো। এর মধ্যে ৪টি মেজর ও ৭৫টি মাইনর সেতু মেয়াদোত্তীর্ণ অবস্থায় আছে। আর লাকসাম-নোয়াখালী সেকশনটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৯০০ থেকে ১৯০৩ সালে। এ রুটে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু রয়েছে ৩৭টি। এর মধ্যে মেজর সেতু ২টি ও মাইনর ৩৫টি। এছাড়া লাকসাম-চাঁদপুর সেকশনটি নির্মাণ করা হয়েছে ১৮৯২ থেকে ১৮৯৫ সালে। এ সেকশনে মেয়াদোত্তীর্ণ রেল সেতু রয়েছে ৪৮টি। এর মধ্যে ৭টি মেজর ও ৪১টি মাইনর।

এদিকে ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলীর অধীনে ২৯৪টি রেল সেতু রয়েছে মেয়াদোত্তীর্ণ। এর মধ্যে জয়দেবপুর-বিদ্যাগঞ্জ সেকশনে ১২১টি মাইনর ও ৮টি মেজর (মোট ১২৯টি) রেল সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এ সেকশনটি নির্মাণ করা হয়েছিল ১৮৮২ থেকে ১৮৮৫ সালের মধ্যে। আর বিদ্যাগঞ্জ-জামালপুর ও জামালপুর-বাহাদুরাবাদঘাট সেকশনটি নির্মাণ করা হয়েছে যথাক্রমে ১৮৯৬ থেকে ১৮৯৯ ও ১৯০৯ থেকে ১৯১২ সালের মধ্যে। এ সেকশনে ৩৩টি মাইনর, ৩টি মেজর ও ১টি গুরুত্বপূর্ণ অর্থাৎ মোট ৩৭টি রেল সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে।

এর বাইরে ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা রুটটি ১৯১৪ থেকে ১৯১৭ ও নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ রুটটি ১৯২৬ থেকে ১৯২৯ সালে নির্মাণ করা। এর মধ্যে ময়মনসিংহ-নেত্রকোনা রুটে মেয়াদোত্তীর্ণ ৩৯টি মাইনর, ৫টি মেজর ও ১টি গুরুত্বপূর্ণ (মোট ৫৫টি) রেল সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। আর নেত্রকোনা-মোহনগঞ্জ রুটে ৪৫টি মাইনর, ২টি মেজর ও ১টি গুরুত্বপূর্ণ (মোট ৪৮টি) রেল সেতুর মেয়াদ পেরিয়ে গেছে।

ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলীর অধীনে শ্যামগঞ্জ-জারিয়া ঝাঞ্জাইল সেকশনটি নির্মাণ করা হয় ১৯১৪ থেকে ১৯১৭ সালের মধ্যে। এ রুটে আয়ুষ্কাল পেরিয়ে রেল সেতু ২৫টি। এর মধ্যে মাইনর ১৯টি ও ৬টি মেজর। এছাড়া সিলেট বিভাগীয় প্রকৌশলীর অধীনে সিলেট-ছাতকবাজার রুটে মেয়াদ পেরিয়ে যাওয়া রেল সেতু ৪৭টি। এর মধ্যে ৩৩টি মাইনর, ১১টি মেজর ও ৩টি গুরুত্বপূর্ণ রেল সেতু রয়েছে।

অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চল রেলে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু সবচেয়ে বেশি রয়েছে আবদুলপুর-চাঁপাইনবাবগঞ্জ-রোহানপুর বর্ডার সেকশনে। এ রুটে ২১২টি সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে বড় সেতু রয়েছে ২টি, মাঝারি ৯টি ও ছোট ২০১টি। এরপর ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে সান্তাহার-চিলাহাটি সেকশনে। এ রুটে ১১২টি সেতুর আয়ুষ্কাল শেষ। এর মধ্যে বড় সেতু রয়েছে ১টি, মাঝারি ১৭টি ও ছোট ৯৪টি।

পোড়াদহ-গোয়ালন্দঘাট সেকশনে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু রয়েছে ১০৩টি। এর মধ্যে ১৫টি মাঝারি ও ৮৮টি ছোট সেতু রয়েছে। আর সান্তাহার-কাউনিয়া সেকশনে মোট ১০২টি সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে ১টি বড়, ৩৬টি মাঝারি ও ৬৫টি ছোট সেতু রয়েছে। এছাড়া ঈশ্বরদী-সান্তাহার সেকশনে মেয়াদোত্তীর্ণ সেতু রয়েছে ৬৮টি। এর মধ্যে বড় সেতু ২টি, মাঝারি ৩৩টি ও ছোট সেতু ৩৩টি।

এর বাইরে সিরাজগঞ্জ-ভেড়ামারা সেকশনে ৫৮টি, সান্তাহার-কাউনিয়া সেকশনে ৫৭টি ও ভেড়ামারা-দর্শনা বর্ডার সেকশনে ৫৩টি সেতুর আয়ুষ্কাল পেরিয়ে গেছে। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জ-ভেড়ামারা সেকশনে ৪টি বড়, ১৪টি মাঝারি ও ৪০টি সেতু মেয়াদোত্তীর্ণ। সান্তাহার-কাউনিয়া সেকশনে ২টি মাঝারি ও ৫৫টি সেকশনে ছোট সেতুর আয়ুষ্কাল শেষ। আর ভেড়ামারা-দর্শনা বর্ডার সেকশনে ৮টি মাঝারি ও ৪৫টি ছোট সেতুর আয়ুষ্কাল ফুরিয়ে গেছে।

সেতুগুলো পুনর্নির্মাণ-সংক্রান্ত প্রকল্প প্রস্তাবে বলা হয়েছে, দর্শনা থেকে জগতি পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের মাধ্যমে ১৮৬২ সালে এ অঞ্চলে শুরু হয় ট্রেনের যাত্রা। এরপর এ অঞ্চলে রেলপথ সম্প্রসারণ হতে থাকে। এসব রেলপথে চুন-সুরকির ইটের গাঁথুনির ওপর রেল সেতুর ডিজাইন করা হয়েছে। অধিকাংশ মেজর সেতুর পিয়ার ও অ্যামব্যাঙ্কমেন্ট চুন-সুরকির ইটের গাঁথুনির ফাউন্ডেশনের ওপর নির্মিত।

১০০ বছর বা তারও পুরোনো এসব সেতুর আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে গেলেও এগুলোর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া এসব সেতুর এক্সেল লোড ধরা আছে মাত্র ১১ দশমিক ৬ টন।

এদিকে ইটের গাঁথুনিতে ফাটল দেখা দেওয়ায় এসব সেতুতে ট্রেন চলাচলে নিয়ন্ত্রণাদেশ দেওয়া হয়। এতে ট্রেন চলাচলে সময়ানুবর্তিতা হ্রাস পাওয়াসহ নানা ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হয়। এছাড়া যাত্রী সাধারণের মনে নিরাপত্তা ভীতির সঞ্চার হয়। তাই সেতুগুলো পুনর্নির্মাণ করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে ২৫ টন এক্সেল লোড ধরে সেতুগুলোর ডিজাইন করা হবে। এতে দুই অঞ্চলের জন্য পৃথক দুটি প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। আর দুই প্রকল্প মিলিয়ে সেতুগুলো পুনর্নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছে ছয় হাজার ৮১৫ কোটি ২৫ লাখ টাকা।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বলেন, দুই অঞ্চলে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে বেশকিছু রেল সেতু পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে বা চলমান আছে। বাকি মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুগুলো পুনর্নির্মাণে দুটি পৃথক প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে। বর্তমানে প্রকল্প দুটি যাচাই-বাছাই চলছে। এরপর প্রকল্প দুটি চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর যাবে পরিকল্পনা কমিশনে। তারপর চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য যাবে একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি)। বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন শেষে পাঁচ থেকে সাত বছরের মধ্যে সেতুগুলো নির্মাণ সম্পন্ন হবে।

সূত্র:শেয়ার বিজ, সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২০

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।