সমান সেবার আন্ত নগর ট্রেনে দুই রকম ভাড়া

সমান সেবার আন্ত নগর ট্রেনে দুই রকম ভাড়া

নূপুর দেব: বাংলাদেশ রেলওয়েতে বিরতিহীন দুই জোড়া আন্ত নগর ট্রেন চলাচল করে ঢাকা-চট্টগ্রাম-ঢাকা রুটে। ৩৪৬ কিলোমিটার দূরত্বের এ রেলপথে ২৩ বছর ধরে চলছে সুবর্ণ এক্সপ্রেস আর চার বছর তিন মাস ধরে চলছে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস। একই দূরত্ব, একই গন্তব্য, গন্তব্যে পৌঁছার সময় এবং একই মানের হলেও এই দুই ট্রেনে ভাড়া নিয়ে চলছে বৈষম্য।

অভিযোগ উঠেছে, সোনার বাংলা ট্রেনে বছরে অন্তত এক কোটি ৭০ লাখ চার হাজার টাকা ভাড়া বাড়তি আদায় করা হচ্ছে। গত চার বছর তিন মাসে এ হিসাবে সোনার বাংলা ট্রেনে যাত্রীদের কাছ থেকে সাত কোটি ২২ লাখ ৬৭ হাজার টাকা বেশি ভাড়া আদায় করা হয়েছে। সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে এই বাড়তি ভাড়া আদায় নিয়ে খোদ রেলওয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যেই রয়েছে নানামুখী আলোচনা।

রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানান, সোনার বাংলা ট্রেনে শোভন চেয়ার ও স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার)—এই দুই শ্রেণির আসনের টিকিটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি সম্প্রতি তাঁদের নজরে এসেছে। ২০১৬ সালের জুন মাসের শেষ দিকে নতুন এ ট্রেন চালু করা হয়। তখন যাত্রীর খাবারসহ শোভন চেয়ারের মোট ভাড়া নির্ধারণ করা হয় ৬০০ টাকা। একইভাবে স্নিগ্ধা (এসি চেয়ার) শ্রেণির যাত্রীপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয় এক হাজার টাকা আর এসি সিট এক হাজার ১০০ টাকা। করোনা পরিস্থিতিতে প্রায় তিন মাস আগে এ ট্রেনে খাবারের (খাবার বন্ধ) ১৯৫ টাকা বাদ দিয়ে সর্বশেষ শোভন চেয়ারে যাত্রীপ্রতি ৪০৫ টাকা, এসি চেয়ার ৮০৫ টাকা এবং এসি সিট ৯০৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।

অন্যদিকে একই রুটে সুবর্ণ এক্সপ্রেস বিরতিহীন ট্রেনের শোভন চেয়ার শ্রেণির ভাড়া যাত্রীপ্রতি ৩৮০ টাকা, স্নিগ্ধা শ্রেণির যাত্রীপ্রতি ভাড়া ৭২৫ টাকা। বিরতিহীন উভয় ট্রেনে এ ভাড়ায় ১০ শতাংশ নন-স্টপ চার্জ ও ভ্যাট একই সমান।

গত বুধবার বিকেল ৫টায় চট্টগ্রাম রেলস্টেশন থেকে ঢাকার উদ্দেশে ছেড়ে যায় বিরতিহীন সোনার বাংলা এক্সপ্রেস। সরেজমিনে গিয়ে ট্রেনটি ছাড়ার প্রায় এক ঘণ্টা আগে যাত্রী, চালকসহ (লোকো মাস্টার) কয়েকজন অ্যাটেনডেন্টের (সহকারী) সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। যাত্রীরা জানায়, তাদের কাছ থেকে বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে আর রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা জানান, বাড়তি ভাড়ার ব্যাপারে তাঁরা কিছু জানেন না।

লোকো মাস্টার ফখরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি সুবর্ণ ও সোনার বাংলা দুই ট্রেনই চালাই। দুটি ট্রেন একই মানের। পাঁচ ঘণ্টা ১০ মিনিট থেকে পাঁচ ঘণ্টা ২০ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছানো যায়, তবে ভাড়ার বিষয়ে আমি কিছু জানি না।’

চট্টগ্রাম থেকে ঢাকার উত্তরায় যাচ্ছেন এক নারী যাত্রী। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘আমি সুবর্ণ ও সোনার বাংলা দুই ট্রেনেই যাতায়াত করি। আমার কাছে মনে হয়েছে ট্রেন দুটি একই মানের। কিন্তু সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে ভাড়া বেশি নেয়। এখন খাবারের ১৯৫ টাকা না নিলেও এসি চেয়ারে (স্নিগ্ধা) ৮০ টাকা বেশি নেয় ভাড়া। আমাদের কিছু করার নেই।’

সৌরভ নামে ট্রেনের এক অ্যাটেনডেন্ট বলেন, ‘আমি সুবর্ণ এক্সপ্রেসে পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেছি। সোনার বাংলা এক্সপ্রেসেও শুরু থেকে আছি। বিরতিহীন এই দুই ট্রেনের সেবা একই।’

‘গ’ বগিতে শোভন চেয়ারের এক যাত্রী বলেন, ‘সুবর্ণতে গেলে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৩৮০ টাকা। সোনার বাংলায় গেলে শোভন চেয়ারের ভাড়া ৪০৫ টাকা। কেন এই বাড়তি ভাড়া নেওয়া হচ্ছে, আমরা জানি না।’

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চিফ কমার্শিয়াল ম্যানেজার ও চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (অতিরিক্ত দায়িত্ব) এ এম এম শাহনেওয়াজ কালের কণ্ঠকে বলেন, বিশেষজ্ঞরা যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনা করেই ভাড়া নির্ধারণ করেছেন। সুবর্ণ এক্সপ্রেসের পর নতুন আঙ্গিকে আধুনিক কোচ সংযোজনের মাধ্যমে সোনার বাংলা এক্সপ্রেস চালু করা হয়েছে। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা রাখা হয়েছে। সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে সুবর্ণ থেকে বাড়তি কী সুযোগ-সুবিধা রয়েছে, এমন প্রশ্নের জবাবে সুনির্দিষ্ট কোনো জবাব দিতে পারেননি তিনি।

সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে বেশি ভাড়া আদায়ের বিষয়ে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় (ঢাকা) বাণিজ্যিক কর্মকর্তা (ডিসিও) মোহাম্মদ শওকত জামিল মোহশি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এ ব্যাপারে আমাদের কাছে কেউ লিখিত কোনো অভিযোগ করেননি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাড়া নিয়ে নানা মন্তব্য দেখেছি।’

বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, একই রুট, একই দূরত্ব, একই গন্তব্য, একই মানের বিরতিহীন ট্রেন, সেখানে ভাড়া কেন ভিন্ন হবে? সোনার বাংলা ট্রেনে সার্ভিস চার্জের নামে যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। এটা অন্যায়। বাড়তি ভাড়া নেওয়ার কারণে তাদের সুনামও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সুবর্ণ এক্সপ্রেসে বর্তমানে শোভন চেয়ার (আসন) রয়েছে ৪২০টি, ৪৫৯টি এসি চেয়ার রয়েছে। ১৮টি বগি (কোচ) দিয়ে এ ট্রেন চলছে। অন্যদিকে সোনার বাংলা এক্সপ্রেসে ২১০টি শোভন চেয়ার, ২৭৫টি স্নিগ্ধা (এসি) শ্রেণির আসন রয়েছে। এ ছাড়া এসি সিট ৬৬টি ও নন-এসি সিট রয়েছে ৩৩টি। 

এই দুই ট্রেনের ভাড়া পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সুবর্ণ ট্রেনের চেয়ে সোনার বাংলা ট্রেনে শোভন চেয়ারে যাত্রীপ্রতি ২৫ টাকা, এসি চেয়ারে যাত্রীপ্রতি ৮০ টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

সূত্র:কালের কন্ঠ, ১১ অক্টোবর, ২০২০

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।