শাস্তি না হওয়ায় রেলে বন্ধ হচ্ছে না তেল চুরি

শাস্তি না হওয়ায় রেলে বন্ধ হচ্ছে না তেল চুরি

আনু মোস্তফা:

কোনোভাবেই বন্ধ হচ্ছে না রেলের তেল চুরি। দুই অঞ্চলে রেলে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার তেল চুরি হচ্ছে। লোকোশেড ছাড়াও পাওয়ার কার, ডিপো ও ট্রেন ইঞ্জিন থেকেই তেল চুরির ঘটনা ঘটছে। তেল চুরির সঙ্গে স্টেশন মাস্টার, ডিপো ইনচার্জ, গার্ড, ট্রেনচালক ছাড়াও সক্রিয় একাধিক সিন্ডিকেট জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। মাঝেমধ্যে রেল নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) ছাড়াও র‌্যাব তেল উদ্ধার ও চোরদের মালামালসহ গ্রেফতার করলেও বন্ধ হয়নি চোর সিন্ডিকেটের তৎপরতা। বিশেষ করে রেলের পাকশী ডিভিশনের অন্তত ১০টি স্টেশনে নিয়মিতভাবে পাওয়ার কার ও ইঞ্জিন থেকে তেল চুরি হচ্ছে।

জানা গেছে, সর্বশেষ ২১ অক্টোবর বিকাল ৫টায় ঈশ্বরদী বাইপাস স্টেশনে ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা রাজশাহী-চাঁপাইনবাবগঞ্জগামী বিরতিহীন বনলতা এক্সপ্রেস থামিয়ে পাওয়ার কার থেকে তেল পাচারের সময় আরএনবি ১২০ লিটার তেলসহ এক ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেন। গ্রেফতার তেল চোর আবদুল হাকিম নাটোরের লালপুর উপজেলার সিরামগাড়ীর আরফান আলীর ছেলে। অভিযান পরিচালনাকারী ঈশ্বরদী রেল নিরাপত্তা বাহিনীর পরিদর্শক ফিরোজ আহম্মেদ বলেন, তেল চোর হাকিম আগেও তিনবার চোরাই তেলসহ গ্রেফতার হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে ঈশ্বরদী আরএনবি ফাঁড়িতে মামলা হয়েছে। ঈশ্বরদী বাইপাসে বিরতিহীন বনলতার ট্রেনের কোনো স্টপেজ না থাকলেও চালক ও গার্ডরা সেখানে ট্রেন থামিয়ে তেল পাচারের সুযোগ করে দেন।

পশ্চিম ও পূর্ব রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, রেলের তেল চুরি ধারাবাহিক অপরাধ কর্ম, যা ঠেকানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তেল চোর চক্রের সঙ্গে রেলের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার লোকজন প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত।

পশ্চিম রেলের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, বনলতা এক্সপ্রেসের মতো অভিজাত ট্রেনের সুরক্ষিত পাওয়ার কারে চোর ঢুকে তেল চুরি করা কোনোভাবেই সম্ভব না। যদি না ট্রেনে দায়িত্বরত কেউ সেই সুযোগ না করে দেয়। তাছাড়া ঈশ্বরদীতে বনলতার স্টপেজও ছিল না। তেল চোর হাকিম গ্রেফতার হলেও বনলতার পাওয়ার কারে দায়িত্বরত কাউকে আটক করা হয়নি।

এদিকে ২৩ এপ্রিল দুপুরে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে চোরাই তেল ট্যাংকারে ভরার সময় আরএনবি ৫ হাজার লিটার তেলের সঙ্গে রেলের ডিপো ইনচার্জ উপসহকারী প্রকৌশলী আবুল হাসানসহ ৪ জনকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতার ব্যক্তিরা সবাই জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার চাকরিতে পুনর্বহাল হয়েছেন।

জানা গেছে, পশ্চিমাঞ্চল রেলের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা আশাবুল ইসলাম কয়েক মাস আগে রাজশাহীতে যোগদানের পর তেল চুরি ও পাচার ঠেকাতে অভিযান জোরদার করেন। এ কারণে মাসে গড়ে ১০টি করে বিশেষ অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এতে গড়ে ৫টি করে তেল চুরির ঘটনা ধরা পড়ছে।

পশ্চিম রেলের প্রধান নিরাপত্তা কর্মকর্তা (আরএনবি) আশাবুল ইসলাম বলেন, কোনো ট্রেনে আপ-ডাউনে ৫ হাজার লিটার তেলের দরকার হয়। কিন্তু ডিপোকে ম্যানেজ করে পাওয়ার কার বা ইঞ্জিনে আরও এক হাজার লিটার অতিরিক্ত তেল নেয়া হয়। অতিরিক্ত তেলটা তারা পথে পাচার করে দিচ্ছে। এভাবেই তেল চুরির সুযোগ করে দেয়া হচ্ছে। রেলের সংশ্লিষ্ট সব বিভাগপ্রধানরা সজাগ ও সতর্ক থাকলে তেল পাচার ও চুরি ঠেকানো সম্ভব বলে তিনি মনে করেন। রেল থেকে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার বেশি তেল পাচার ও চুরি হয়ে যাচ্ছে বলে তিনি মনে করেন।

জানা যায়, পূর্ব ও পশ্চিম মিলে ২৪ ঘণ্টায় দেশের চারটি সেকশনে তিন শতাধিক এক্সপ্রেস, মেইল, লোকাল ও মালবাহী ট্রেন চলাচল করে। বর্তমানে ২ হাজার ৯৫৬ কিলোমিটার রেলপথ রয়েছে। ৪৪টি জেলায় বর্তমানে এসব ট্রেন চলাচল করে। এ সংখ্যক ট্রেন চলাচলে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে ১ লাখ ৮৩ হাজার লিটার তেলের প্রয়োজন হয়। এ হিসাবে বছরে ৬ কোটি ৬৪ লাখ ৩০ হাজার লিটার তেল লাগে। রেলওয়ে নিরাপত্তা বিভাগের আনুমানিক হিসাব মতে, সারা দেশের রেলপথে দৈনিক গড়ে ৪৫ হাজার লিটার তেল পাচার ও চুরি হয়। বছরে যে পরিমাণ তেল পাচার হয় তার দাম ১০০ কোটি টাকার বেশি।

অন্যদিকে পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বেশি তেল চুরি ও পাচার হয় পাকশী বিভাগের আব্দুলপুর, ঈশ্বরদী, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, আমনুরা, হাতিবান্ধা, পার্বতীপুর, সৈয়দপুর, ললিতনগর, সান্তাহার, কাউনিয়া, চাটমোহর, বালাসী রেল ডিপো, পোড়াদহ, কালুখালী, দৌলতদিয়া, নওয়াপাড়া, রহনপুর, দর্শনা ও নাটোর স্টেশনে। পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের ১৯২ ট্রেনের মধ্যে ১৮৩টিতেই তেল চুরি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া দুই অঞ্চলের মালবাহী ট্রেন থেকে তেল চুরির ঘটনাও ঘটে।

রেলওয়ে কর্মকর্তারা আরও জানান, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও অবহেলার কারণেই তেল চুরি ও পাচার ঠেকানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আরএনবি অভিযান চালিয়ে পাচার ও চুরি হওয়া তেলসহ হাতেনাতে চোর ধরতে পারলেও চুরি সিন্ডিকেটে জড়িত রেলের কাউকে সহজে আটক বা গ্রেফতার করতে পারেন না।

পশ্চিম রেলের জেনারেল ম্যানেজার মিহির কান্তি গুহ বলেন, তেল পাচার ঠেকাতে ইতোমধ্যে পশ্চিম রেল বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। আরএনবি এখন অনেক বেশি সক্রিয়। তারা প্রায়ই অভিযান চালায়। আশা করছি, এতে তেল পাচার প্রতিরোধ সম্ভব হবে।

সূত্র:যুগান্তর, ২৫ অক্টোবর ২০২০

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।