শতবর্ষী ঝুঁকিপূর্ণ তিস্তা রেল সেতু পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ

শতবর্ষী ঝুঁকিপূর্ণ তিস্তা রেল সেতু পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ

ইসমাইলআলীরংপুরের তিস্তা রেল সেতু চালু করা হয়েছিল ১৯০১ সালে। ১০০ বছর আয়ুষ্কাল ধরা সেতুটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে ২০০০ সালেই। এরপর আরও ২০ বছর পেরিয়ে গেছে। এতে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে রেল সেতুটি। অবশেষে তিস্তা রেল সেতু পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে।

সেতুটি নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের কাজ চলছে। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত খসড়া সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদন জমা দেয়া হয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে।

এতে দেখা যায়, তিস্তা রেল সেতুটি নির্মাণে চারটি সম্ভাব্য রুট প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান সেতুর উজান ও ভাটিতে এ রুট চারটি প্রস্তাব করা হয়েছে। রুটভেদে মূল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ৬৫০ থেকে ৭০০ মিটার। তবে ভায়াডাক্ট তথা উড়ালপথসহ মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে দুই হাজার ২২৯ থেকে দুই হাজার ৫০৩ মিটার।

সূত্রমতে, তিস্তা রেল সেতু চালুর ১২০ বছর পূর্ণ হয়েছে ২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর। লালমনিরহাট রেল বিভাগের অধীন এ সেতুটি দিয়ে বর্তমানে ২০টি ট্রেন দৈনিক চলাচল করে। আগামীতে এ রুটে ট্রেনের সংখ্যা আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এতে ট্রেন চলাচলে ঝুঁকি বাড়তে পারে। এ অবস্থায় সেতুটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।

নতুন সেতুটির এক্সেল লোড ধরা হয়েছে ২৫ টন। এতে সেতুর ভারবাহী ক্ষমতাও বাড়বে। আর চারটি সম্ভাব্য রুটের মধ্যে প্রথম অপশনটিতে সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রে নতুন কোনো স্টেশন নির্মাণ করতে হবে। এক্ষেত্রে বিদ্যমান কাউনিয়া ও তিস্তা স্টেশনই ব্যবহার করা যাবে। আর এ অপশনে মূল সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ৬৫০ মিটার। তবে ভায়াডাক্টসহ মোট দৈর্ঘ্য দাঁড়াবে দুই হাজার ৫০৩ মিটার।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, সারাদেশের সঙ্গে লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামের রেল যোগাযোগ সৃষ্টিতে ১৮৯৯-১৯০০ সালে তিস্তা নদীর ওপর ২ হাজার ১১০ ফুট লম্বা প্রথম তিস্তা রেল সেতু নির্মাণ করে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার। ১৯০১ সালে সেতুটি উদ্বোধন করা হয়। সে সময় দেশের তৃতীয় বৃহত্তম রেল সেতু হিসেবে এটির ব্যাপক পরিচিতি ছিল। সেতুটি উত্তর পাশে লালমনিরহাটের সদর উপজেলার তিস্তা এবং দক্ষিণ পাশে যুক্ত হয়েছে রংপুরের কাউনিয়ার সঙ্গে। সেতুটির মেয়াদ ধরা হয়েছিল ১০০ বছর। এ হিসাবে আরও ২০ বছর আগেই সেতুটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে।

এদিকে ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সেতুটিতে মিত্রবাহিনী বোমা হামলায় কাউনিয়া প্রান্তের একটি গার্ডার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে মেরামতের মাধ্যমে ১৯৭২ সালে সেতুটি পুনরায় চালু করা হয়। ১৯৭৭ সালে রেলওয়ে এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তর যৌথভাবে রেল সেতুতে মিটারগেজ লাইনের পাশে ২৬০টি স্টিলের টাফ প্লেট ও কাঠের পাটাতন স্থাপন করে। আর ১৯৭৮ সালে ট্রেনের পাশাপাশি সেতুটি দিয়ে সড়ক যোগাযোগ শুরু করা হয়। সে থেকেই সেতুটি ওপর দিয়ে ট্রেন ছাড়াও যাত্রীবাহী বাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহন চলাচল করত। এতে মাত্রাতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক ও পাথরের ট্রাক পারাপারের ফলে সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় ২০০১ সালে রেল সেতুর পূর্ব পাশে তিস্তা সড়ক সেতু নির্মাণের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরে ২০১২ সালের ২০ সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তা সড়ক সেতু উদ্বোধন করেন। এতে মেয়াদোত্তীর্ণ রেল সেতুতে যানবাহন চলাচল বন্ধ করে শুধু ট্রেন চলাচল অব্যাহত রাখা হয়।

কয়েক মাস আগে তিস্তা রেল সেতু পরিদর্শন করে রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজন বলেন, কানেক্টিভিটি বাড়াতে তিস্তা রেল সেতুতে ট্রেনের গতি ও সংখ্যা বাড়ানো হবে। তাই তিস্তা নদীর ওপর আরেকটি রেল সেতু নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুরোনো সেতুর পশ্চিম পাশে আরেকটি ডুয়েলগেজ সেতু নির্মাণে খুব দ্রুত কার্যক্রম হাতে নেয়া হবে।

মন্ত্রীর ঘোষণার পর তিস্তা রেল সেতু পুনর্নির্মাণে সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু করা হয়। এ-সংক্রান্ত খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেতুটি নির্মাণে প্রায় ৩৮ একর জমি অধিগ্রহণ করতে হবে। তবে ওই এলাকায় কোনো বাড়িঘর বা অবকাঠামো না থাকায় পুনর্বাসন খাতে কোনো অর্থ ব্যয় হবে না।

সেতুটি নির্মাণে জমি অধিগ্রহণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ কোটি ১২ লাখ টাকা। আর সেতু নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রথম অপশনের জন্য ৪০৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা, দ্বিতীয় অপশনের জন্য ৪৪৭ কোটি ৫৬ লাখ টাকা, তৃতীয় অপশনের জন্য ৪৪৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা ও চতুর্থ অপশনের জন্য ৪৩৬ কোটি ২৬ লাখ টাকা।

সূত্র:শেয়ার বিজ, এপ্রিল ১০, ২০২১

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।