রেলের ২০০ কোচ কেনা নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের অসন্তোষ

রেলের ২০০ কোচ কেনা নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের অসন্তোষ

ইসমাইলআলীকঠিন শর্তের ঋণে (টেন্ডারার্স ফাইন্যান্সিং) ২০০টি মিটারগেজ কোচ কেনায় ২০১১ সালে প্রকল্প নেয় রেলওয়ে। এজন্য দরপত্র আহ্বান করা হলে কাজ পায় চীনের সিআরআরসি সিফ্যান কোম্পানি লিমিটেড। যদিও কোম্পানিটির অস্তিত্ব নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন। এ কোচগুলো কেনায় কঠিন শর্তের ঋণ দেবে চীনের আরেক কোম্পানি। অথচ সম্ভাব্যতা যাচাই ছাড়াই প্রকল্পটি নেয়া হয়েছিল। এ নিয়ে সম্প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন।

নামসর্বস্ব এ কোম্পানিটির সক্ষমতা নিয়ে গত বছর প্রশ্ন তুলে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) অনমনীয় ঋণ-বিষয়ক স্থায়ী কমিটি। এজন্য কোম্পানিটির সক্ষমতা যাচাইয়ের সুপারিশ করেছিল ইআরডি। তবে এক বছর পেরিয়ে গেলেও করোনার কারণে তা শুরু করেনি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। পাশাপাশি ঋণচুক্তিও সই হয়নি। ফলে প্রকল্পটির মেয়াদ আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে।

তথ্যমতে, গত ২৩ জুন এ বিষয়ে রেলওয়েকে চিঠি দেয় পরিকল্পনা কমিশন। এতে বলা হয়, ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০০টি মিটারগেজ প্যাসেঞ্জার ক্যারেজ সংগ্রহ শীর্ষক প্রকল্পটির মেয়াদ ব্যয় বৃদ্ধি ব্যতিরেকে দ্বিতীয়বার তিন বছর, অর্থাৎ জুলাই ২০১৬ থেকে জুন ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত নির্দেশক্রমে বৃদ্ধি করা হলো।’

এক্ষেত্রে দুটি শর্ত দিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। এর মধ্যে প্রথমটি হলো, প্রকল্পের অর্থায়নকারী প্রতিষ্ঠানের ঋণ প্রস্তাবের নেগোসিয়েশন দ্রুত চূড়ান্ত করে ঋণচুক্তি সম্পাদন করতে হবে। আর দ্বিতীয় শর্তে বলা হয়েছে, প্রকল্পটি গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কোন সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়নি। ভবিষ্যতে এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণকালে যাতে যথাযথ প্রক্রিয়ায় সম্ভাব্যতা যাচাই করা হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।

সূত্রমতে, টেন্ডারার্স ফাইন্যান্সিংয়ে ২০০ মিটারগেজ কোচ কেনায় রেলওয়েকে ২০১১ সালের ২০ জুলাই বিশেষ অনুমোদন দেয় অর্থনৈতিক বিষয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি। আর ২০১২ সালের ৯ এপ্রিল কোচগুলো কেনায় অগ্রিম ক্রয় প্রক্রিয়াকরণ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নীতিগত অনুমোদন নেয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সে বছর ৪ অক্টোবর প্রকল্পটির দরপত্র আহ্বান করা হয়। এতে সর্বনি¤œ দরদাতা হিসেবে চীনের সিআরআর সিসিফ্যান কোম্পানির প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়।

যদিও এ নামে কোনো কোম্পানির অস্তিত্ব অনলাইনে খুঁজে পাওয়া যায়নি। এ অবস্থায়ই কোচগুলো কেনায় অর্থায়নের বিষয়ে অনুমোদন নিতে প্রস্তাবটি পাঠানো হয় ইআরডিতে। তবে অর্থায়নের প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ের আগে উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুমোদন ও ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিজিপি) অনুমোদন গ্রহণের সুপারিশ করে ইআরডি। এজন্য ২০১৫ সালের ৩১ আগস্ট এ বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৬ সালের ৪ অক্টোবর প্রকল্পটি একনেকে (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি) অনুমোদন করা হয়। আর সে বছর ২১ নভেম্বর ঋণ নেগোসিয়েশন ও ঋণচুক্তি স্বাক্ষরের জন্য আবার ইআরডিতে প্রস্তাব পাঠায় রেলপথ মন্ত্রণালয়। তবে নানা জটিলতা থাকায় এ বিষয়ে আগে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেয় ইআরডি। এক্ষেত্রে ক্রয় কার্যক্রমটি ব্যতিক্রম হিসেবে গণ্য করে এ প্রক্রিয়াটি শুধু রেলওয়ের আলোচ্য প্রকল্পের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে বলে মতামত দেন প্রধানমন্ত্রী।

এদিকে ২০১৭ সালের ১১ অক্টোবর সিসিজিপি ক্রয় প্রস্তাবটি অনুমোদন করে। আর ২০১৮ সালের ৪ নভেম্বর কোচগুলো কেনার জন্য চুক্তি সই করা হয়। এরপর আড়াই বছরের বেশি পেরুলেও এখনও ঋণচুক্তি সই হয়নি। যদিও ২০১৮ সালের ১৩ ডিসেম্বর সরবরাহকারি কোম্পানির নাম নিয়ে আপত্তি তোলে সিপিটিইউ। পরে ২০১৯ সালের ১৫ মে বিষয়টি সিসিজিপিকে জানায় রেলপথ মন্ত্রণালয়। তবে অনির্দিষ্ট কারণে প্রস্তাবটি বাতিল হয়নি।

তথ্যমতে, ২০০ কোচ কেনায় ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৯২৭ কোটি ৫২ লাখ টাকা। এ কোচগুলো কেনায় ঋণ দেবে চীনের ক্রেডিট এগ্রিকোল করপোরেট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক। এক্ষেত্রে ঋণের পরিমাণ ধরা হয়েছে আট কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার ডলারের সমপরিমাণ ইউরো। এ ঋণের সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় মাস মেয়াদি ইউরো আন্তঃব্যাংক অফার রেটের সঙ্গে (ইউরিবর) দুই শতাংশ যোগ করে নির্ধারিত হার। পাশাপাশি ২৫ শতাংশ কমিটমেন্ট ফি দিতে হবে। এছাড়া ঋণের অ্যারেঞ্জমেন্ট ফি দিতে হবে এক দশমিক তিন শতাংশ। আর ১৫ বছর মেয়াদি ঋণের গ্রেস পিরিয়ড ধরা হয়েছে তিন বছর।

ইআরডির দর কষাকষি শেষে ২০১৯ সালের ১৯ জুলাই চিঠি দেয়া হয় ঋণদানকারী কোম্পানি ক্রেডিট এগ্রিকোল করপোরেট অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংককে। আর ২০ সেপ্টেম্বরে প্রস্তাবটি পাঠানো হয় অনমনীয় ঋণ-বিষয়ক স্থায়ী কমিটিতে। পরে তা অনুমোদন করে কমিটি। এক্ষেত্রে দুটি শর্ত দেয় অনমনীয় ঋণ-বিষয়ক স্থায়ী কমিটি।

প্রথমত, ঋণচুক্তি সইয়ের আগে সরবরাহকারী কোম্পানির মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনের সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক যেসব দেশে তাদের তৈরি যাত্রীবাহী কোচ সরবরাহ করা হয়েছে, সেসব দেশে একটি প্রতিনিধিদল পাঠাতে হবে। তারা কোম্পানিটির সরবরাহকৃত কোচের গুণগত মান ও কর্মদক্ষতা যাচাই করবে। পাশাপাশি কোম্পানিটির সক্ষমতাও যাচাই করবে। রেলপথ মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

যদিও করোনার জন্য চীনে বা সরবরাহকারীর পণ্য আমদানিকারক কোনো দেশেই এখনও প্রতিনিধি দল পাঠানো হয়নি। এরই মধ্যে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হয়ে যায় গত মাসে। তাই ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে প্রকল্পটির মেয়াদ।

জানতে চাইলে প্রকল্পটির পরিচালক মৃণাল কান্তি বণিক শেয়ার বিজকে জানান, অনমনীয় ঋণ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সুপারিশ ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের বৈঠকের ভিত্তিতে কোচগুলো সরবরাহকারী কোম্পানিটির সক্ষমতা যাচাইয়ে প্রতিনিধিদল গঠন করা হচ্ছে। শিগগিরই তারা কাজ শুরু করবে।

যদিও এ কোচগুলো কেনার আদৌ প্রয়োজন ছিল না বলে মনে করেন রেলওয়ে-সংশ্লিষ্টরা। তারা জানান, গত কয়েক বছরে রেলের বহলে যুক্ত হয়েছে ৫২০টি কোচ। এর মধ্যে মিটারগেজ কোচ রয়েছে ৩০০টি। আরও ৪৫০টি কোচ কেনার প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে মিটারগেজ কোচ ২৫০টি। এগুলো সবই শর্তের ঋণে কেনা। তাই কঠিন শর্তের ঋণে চীন থেকে ২০০ কোচ কেনার কোনো প্রয়োজন ছিল না।

সূত্র:শেয়ার বিজ, জুলাই ৫, ২০২১


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।