শিরোনাম

যথাযথ কার্যক্রম চিহ্নিত ছাড়াই বঙ্গবন্ধু রেল সেতু নির্মাণ!

যথাযথ কার্যক্রম চিহ্নিত ছাড়াই বঙ্গবন্ধু রেল সেতু নির্মাণ!

ইসমাইল আলী: দেশের উত্তরাঞ্চলের সঙ্গে ট্রেন চলাচল সহজ করতে যমুনা নদীর ওপর নির্মাণ করা হচ্ছে পৃথক রেল সেতু। এজন্য ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে রেলওয়ে। তবে প্রকল্পের কার্যক্রম যথাযথভাবে চিহ্নিত করা হয়নি। ফলে বিস্তারিত নকশা প্রণয়নের পর প্রকল্পটির ব্যয় বেড়ে যায় সাত হাজার ৪৭ কোটি টাকা বা ৭২ দশমিক ৩৯ শতাংশ।

পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। সম্প্রতি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে প্রকল্পটির নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে আইএমইডি। এতে ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু’ নির্মাণ প্রকল্পটির বেশ কিছু দুর্বল দিক চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, প্রকল্পের কার্যক্রম যথাযথভাবে চিহ্নিত না করেই উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা (ডিপিপি) অনুমোদন করা হয়। এতে এরই মধ্যে এক দফা ডিপিপি সংশোধন করে ব্যয় বাড়াতে হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাপান সফরকালে প্রকল্পটি অর্থায়নে সম্মত হয় দেশটির সরকার। এতে এডিবির (এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক) সম্পাদিত জরিপের ওপর সম্পূরক জরিপ পরিচালনা করে জাইকা (জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা)। পাশাপাশি খসড়া নকশা প্রণয়ন করা হয়। এর ভিত্তিতে প্রকল্পটির প্রথম ডিপিপি অনুমোদন করা হয়। তবে চূড়ান্ত নকশায় এতে বেশ কিছু পরিবর্তন আনতে হয়।

তথ্যমতে, চূড়ান্ত নকশা প্রণয়নসহ বঙ্গবন্ধু রেল সেতুটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি সাত লাখ টাকা। দেশের বৃহত্তম এ রেল সেতু নির্মাণে সাত হাজার ৭২৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা ঋণ দেয়ার কথা ছিল জাইকার। তবে প্রথম দফা সংশোধনের পর সেতুটি নির্মাণব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে জাইকা ঋণ দেবে ১২ হাজার ১৪৯ কোটি ২০ লাখ টাকা। যদিও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের পর প্রকল্পটির ব্যয় প্রাক্কলন করা হয়েছিল আট হাজার ৪৬৪ কোটি ২১ লাখ টাকা। এ হিসাবে বঙ্গবন্ধু রেল সেতু নির্মাণব্যয় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধির কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে আইএমইডির প্রতিবেদনে। এতে দেখা যায়, প্রকল্পের মূল ডিপিপিতে জমি অধিগ্রহণ ও আনুষঙ্গিক খাতে কোনো ব্যয় ধরা ছিল না। তবে সেতু কর্তৃপক্ষের জমি ব্যবহারে পরবর্তী সময়ে রেলওয়ে সমঝোতা স্মারক সই করে। এতে ১৮৭ একর জমি স্থায়ীভাবে ব্যবহার ও ২৬৩ একর জমি অস্থায়ী ব্যবহারে সেতু কর্তৃপক্ষকে ৩৪৬ কোটি ৬৬ লাখ টাকা দিতে হচ্ছে। এছাড়া মাটির কাজে ব্যয় বেড়েছে ১৬৮ কোটি ২০ লাখ টাকা ও রেল ট্র্যাক নির্মাণে ৫৮ কোটি পাঁচ লাখ টাকা।

এদিকে সম্ভাব্যতা যাচাই ও খসড়া নকশায় সেতুটির পিলারের সংখ্যা ধরা হয়েছিল ৪১টি। চূড়ান্ত নকশায় তা বেড়ে হয়েছে ৫০টি। একইভাবে খসড়া নকশায় পাইলের গভীরতা (ডেপ্থ) ধরা হয়েছিল ২৭ দশমিক ৭৯ মিটার। চূড়ান্ত নকশায় তা বেড়ে হয়েছে ৩৭ মিটার। আর খসড়া নকশায় স্প্যান লেন্থ (দৈর্ঘ্য) ধরা হয়েছিল ১২০ মিটার। পরে তা কমিয়ে ১০০ মিটার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে মূল সেতু, রেলওয়ে ট্র্যাক, এমব্যাংকমেন্ট, স্টেশন বিল্ডিং ও সাইট অফিস ইত্যাদি নির্মাণে ব্যয় বেড়ে গেছে পাঁচ হাজার ২১৩ কোটি ২০ লাখ টাকা।

এর বাইরে সিগনালিং ও টেলিকমিউনিকেশন খাতে ব্যয় বেড়েছে তিন কোটি ছয় লাখ টাকা। নতুন করে যুক্ত হয়েছে পরিদর্শন বাংলো ও জাদুঘর নির্মাণ। এ খাতে ব্যয় হবে ৬৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা। তবে পরামর্শক খাতে ব্যয় কমেছে প্রায় ৯০ কোটি টাকা। আনুষঙ্গিক খাতে ব্যয় বেড়েছে ৫৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা, সাধারণ প্রয়োজনীয় খাতে এক হাজার ৩৩২ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, পরিবেশগত সেফগার্ড খাতে ২২ কোটি ৯৫ লাখ টাকা উল্লেখযোগ্য।

এদিকে প্রকল্পটি ৯০ মাসের মধ্যে বাস্তবায়নের কথা ছিল। এতে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটি শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ডিপিপিতে। তবে কাজ শুরু করতে দেরি হওয়ায় প্রকল্পটির মেয়াদকাল আরও ২৪ মাস বাড়ানো হয়েছে। এতে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকল্পটির কাজ শেষ করার নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এটিও প্রকল্পটির অন্যতম দুর্বল দিক। এছাড়া রেলের সড়ক বাঁধ নির্মাণে যথাযথ ও অনুমোদিত পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়নি। এটিও প্রকল্পটির দুর্বল দিক হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইএমইডি।

তথ্যমতে, বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর ৩০০ মিটার উজানে ৪ দশমিক ৮ কিলোমিটার দীর্ঘ ডুয়েলগেজ ডাবল লাইন রেল সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। এজন্য পৃথক নদী শাসন করতে হচ্ছে না।

বঙ্গবন্ধু রেল সেতুর উভয় দিকে ভায়াডাক্ট (সংযুক্ত উড়ালপথ) থাকবে ৫৮০ মিটার। যমুনা ইকো পার্কের পাশ দিয়ে এটি বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর পশ্চিম অংশের রেলপথের সঙ্গে যুক্ত হবে। এজন্য ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার সংযোগ রেলপথ নির্মাণ করতে হচ্ছে। পাশাপাশি ৩টি স্টেশন বিল্ডিং, ৩টি প্ল্যাটফর্ম ও শেড, ৩টি লেভেল ক্রসিং গেট ও ৬টি কালভার্ট নির্মাণ করা হচ্ছে। আর রেল সেতুর পূর্ব পাশে লুপ লাইনসহ প্রায় সাড়ে ১৩ কিলোমিটার, ১৩টি কালভার্ট ও ২টি সংযোগ স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু সেতুতে ট্রেন চালানো ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় পারাপারের সময় গতি অনেক কমিয়ে দেয়া হয়। এছাড়া সেতুটির ওপর দিয়ে ব্রডগেজ পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল নিষিদ্ধ রয়েছে। এটি দেশের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে বড় প্রতিবন্ধক। এজন্য পৃথক রেল সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি অনুমোদনের পর পরামর্শক নিয়োগ করা হয় ২০১৭ সালের মার্চে। বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন শেষ হয় ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে। আর দুই অংশের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের চুক্তি সই হয় ২০২০ সালের মাঝামাঝি।

রেলপথের পাশাপাশি সেতুটিতে গ্যাস সঞ্চালন লাইন নির্মাণ করা হবে। স্টিল অবকাঠামোয় প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে সেতুটি নির্মাণে। এছাড়া সাধারণ ট্রেন ছাড়াও দ্রুতগতির (হাইস্পিড) ট্রেনও চালানোর উপযুক্ত করে নির্মাণ করা হচ্ছে সেতুটি। ফলে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৫০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালানো যাবে এ সেতুতে।

সূত্র:শেয়ার বিজ


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।