শিরোনাম

মানতেই চায় না রেলক্রসিং

মানতেই চায় না রেলক্রসিং

আল ফাতাহ মামুন :

রোববার দুপুর। সময় ১টা বেজে ১৫ মিনিট। ঠিক পাঁচ মিনিট পর কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের উদ্দেশে ছেড়ে আসা আন্তনগর ট্রেনটি ক্রস করবে রাজধানীর ব্যস্ততম এলাকা সায়দাবাদ। বৃদ্ধ গেটম্যান ব্যারিকেড ফেলে রাস্তা আটকে দিয়েছেন। অন্যপ্রান্তেও ব্যারিকেড ফেলেছেন আরেক গেটম্যান। দু’পাশে চার লেনে গাড়ি থেমে অপেক্ষা করছে ট্রেনটি চলে যাওয়ার জন্য। এমন সময় এক তরুণ মোটরসাইকেলসহ ব্যারিকেড ডিঙিয়ে পার হতে চেষ্টা করল। বাঁশি বাজিয়ে সতর্ক করলেন গেটম্যান। মোটরসাইকেল আরোহী যেন কানেই তুলল না গেটম্যানের সতর্ক সংকেত। গেটম্যান দৌড়ে এসে আটকে দিয়ে বলল, একটু পরে যান, ট্রেন চলে এসেছে।

কিছু বুঝে ওঠার আগেই অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করল মোটরসাইকেল আরোহী। প্রায় ট্রেনের সামনে দিয়েই মোটরসাইকেল হাঁকিয়ে চলে গেল ওই তরুণ। এর মধ্যে মানুষজনের আসা-যাওয়া তো আছেই। একটু পর কথা হয় ওই বৃদ্ধ গেটম্যানের সঙ্গে। নাম আজিজুল হক। বিমর্ষ চেহারায় বসে আছেন তার জন্য নির্ধারিত কক্ষে। অপেক্ষা করছেন পরবর্তী ট্রেনের জন্য। তিনি বলেন, আমাদের দুঃখের কথা কাকে বলব, আমরা তো মানুষের ভালোর জন্যই অপেক্ষা করতে বলি; কিন্তু এর বিনিময়ে এমন এমন পরিস্থিতির শিকার হই, সেসব কথা মনে পড়লে চোখে পানি চলে আসে। কিছুক্ষণ স্তম্ভিত থেকে আজিজুল হক বলেন, এই তো গেল সপ্তাহেও ছেলে বয়সী একজন আমার গায়ে হাত তোলে। রাজধানীর প্রতিটি রেলক্রসিংয়ের নিয়মিত চিত্র এটি।

দুপুর ৩টায় মালিবাগ রেলক্রসিংয়ে ব্যারিকেড পড়ার আগে আগে যেন প্রতিটি ড্রাইভার এবং পথচারীর ব্যস্ততা বেড়ে যায় অনেক বেশি। ট্রেন যত কাছে আসতে থাকে পথচারী, রিকশা ও বাইকচালকদের তাড়াহুড়ো ততই বাড়তে থাকে। ব্যারিকেড ডিঙিয়ে, এমনকি হাত দিয়ে ব্যারিকেড উঁচিয়ে পার হতে দেখা যায় সাধারণ পথচারী, রিকশা ও মোটরআরোহীদের। মালিবাগ রেলক্রসিংয়ের গেটম্যান সালেহ আহমদ বলেন, রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত এলাকা মালিবাগ। এমন কোনো সপ্তাহ নেই, এখানে এক-দুটো দুর্ঘটনা ঘটে না। আগে তো বলতে গেলে প্রতিদিনই ঘটত। এখন তা সপ্তাহে নেমে এসেছে। আরেক গেটম্যান এনায়েত বলেন, আমরা মানুষকে সতর্ক করি; কিন্তু মানুষ না শুনলে কী করব বলেন?

বিকাল ৪টা ২০ মিনিটে কমলাপুর থেকে নারায়ঞ্জের উদ্দেশে আসা ট্রেনের জন্য ব্যারিকেড ফেলা হয়েছে ঢাকা মাওয়া হাইওয়ে রোড জুরাইন রেলক্রসিংয়ে। আধাঘণ্টা আগে খিলগাঁ মোড় ও কমলাপুর রেলক্রসিংয়ে যে দৃশ্য দেখা গেছে এখানেও সেই একই দৃশ্য। বাইক, সাইকেল, রিকশা, ভ্যান ব্যারিকেডের ফাঁক দিয়ে, ব্যারিকেড উঁচিয়ে সমানে পার হয়ে যাচ্ছে। সাধারণ পথচারীরা হন্তদন্ত হয়ে ব্যারিকেড ডিঙিয়ে, নিচে দিয়ে কোনোমতে দৌড়ে পার হতে পারলেই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। এর মধ্যে কিছু মানুষ আছে মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে পার হচ্ছেন বিপজ্জনক এ রেলক্রসিংগুলো। এমন এক-দু’জনের দেখাও মিলেছে, যারা কানে হেডফোন লাগিয়ে রেলক্রসিং পার হচ্ছিলেন। ট্রেন খুব কাছে চলে আসার পরও বিপজ্জনক আসা-যাওয়া থামেনি তাদের।

জুরাইন রেলক্রসিংয়ের গেটম্যান মো. রমজান আলী বলেন, রেলওয়ে আইনে বলা আছে ব্যারিকেড পড়ে যাওয়ার পর কেউ যদি ডিঙিয়ে পার হন, এমনকি ব্যারিকেডের ভেতরেও আসেন তবে তাকে ম্যাজিস্ট্রেট জেল-জরিমানা পর্যন্ত করতে পারেন। কিন্তু চাকরিতে যোগদান করেছি এত বছর হল, কোনো দিন এ আইনের প্রয়োগ তো দূরের কথা, ম্যাজিস্ট্রেট পর্যন্ত আসতে দেখিনি। সত্যি বলতে কী এ আইনের প্রয়োগ আমাদের দেশে কখনও হয়েছে বলে শুনিনি। আর মানুষ যদি সচেতন-সতর্ক না হয়, তাহলে আইন দিয়ে কতক্ষণ ঠিক রাখা যাবে। ব্যারিকেড ডিঙিয়ে পার হওয়াদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া হয়- এ বিষয়ে জানতে কথা হয় মালিবাগ রেলক্রসিংয়ে দায়িত্বরত সার্জেন্ট সাদেকুল ইসলাম সাদীর সঙ্গে। তিনি বলেন, কেউ যদি ব্যারিকেড পড়ার পর রেলক্রসিং পার হতে চায়, তাহলে তাকে রং সাইড দিয়ে পার হতে হবে। আর সঠিক লেন দিয়ে পার হলেও সে ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য করার অপরাধে শাস্তি পাবে। আমি নিজেও অনেকজনকে এ ধরনের অপরাধের কারণে শাস্তি দিয়েছি; কিন্তু মানুষ খুব একটা সতর্ক হয়েছে বলে মনে হয় না। এ ছাড়া সাধারণ পথচারীরা যদি ব্যারিকেড ডিঙিয়ে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পার হতে চায়, এ ক্ষেত্রে রেলওয়ের আলাদা আইন আছে; কিন্তু তার প্রয়োগ হয়েছে বলে কখনও শুনিনি। মানুষ নিজেকে দুর্ঘটনা থেকে বাঁচাবে- এ ক্ষেত্রেও যদি আইনের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, তাহলে মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব এবং দায়বোধ কোথায় গিয়ে দাঁড়িয়েছে তা আবারও নতুন করে ভাবতে হবে।

সুত্র:যুগান্তর, ১৯ নভেম্বর ২০১৯


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।