ভুলে ভরা পরিকল্পনায় ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় ও চতুর্থ রেলপথ নির্মাণ!

ভুলে ভরা পরিকল্পনায় ঢাকা-টঙ্গী তৃতীয় ও চতুর্থ রেলপথ নির্মাণ!

ইসমাইলআলীঢাকা-টঙ্গী রেলপথ তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পটি নেয়া হয় ২০১২ সালের নভেম্বরে। তবে আট বছরে এর অগ্রগতি খুবই কম। এর মূল কারণ ভুল পরিকল্পনা। আর তা সংশোধনে এরই মধ্যে কয়েক দফা পরিকল্পনায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে। দুই দফা বাতিল করা হয়েছে দরপত্র। প্রকল্পটির নকশা সংশোধনের কাজ এখনও চলছে। ফলে কবে নাগাদ এ রেলপথ নির্মাণ সম্পন্ন হবে, তা নিশ্চিত নয়।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত প্রকল্পটির প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটির (পিআইসি) সভায় এসব বিষয় উঠে আসে। এতে জানানো হয়, প্রকল্পটির দুই প্যাকেজের মধ্যে একটির ঠিকাদার নিয়োগ এখনও সম্পন্ন হয়নি। যদিও প্রথম প্যাকেজের চুক্তিমূল্য প্রাক্কলিত ব্যয়ের চেয়ে অনেক বেশি। তবে দ্বিতীয় প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগ শেষে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় আড়াই গুণ।

তথ্যমতে, ঢাকা-টঙ্গী রেলপথ তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৮৪৮ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ভারতের ঋণ দেয়ার কথা ছিল ৬৯৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আর সরকারি তহবিল থেকে অবশিষ্ট ১৫২ কোটি ৭০ লাখ টাকা। তবে প্রকল্পটির ডিজেইল ডিজাইন ও টেন্ডারিং সার্ভিস পর্যায়ে পরামর্শক সেবা অন্তর্ভুক্ত ছিল না। এজন্য এক দফা প্রকল্পটি সংশোধন করা হয়।

ডিজেইল ডিজাইন ও টেন্ডারিং সার্ভিস পর্যায়ে পরামর্শক সেবা অন্তর্ভুক্ত করার পাশাপাশি ৯০-এ রেলের পরিবর্তে ৫২ কেজির রেলের সংস্থান রাখা হয়। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ১০৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। ২০১৪ সালের অক্টোবরে তা অনুমোদন করে একনেক (জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি)। এর মধ্যে ভারতের ঋণ রয়েছে ৯০২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। আর সরকারি তহবিল ২০৪ কোটি ১৭ লাখ টাকা।

এদিকে প্রকল্পটির পরামর্শক-সংক্রান্ত সমস্যা এখনও সমাধান হয়নি। পিআইসি বৈঠকে জানানো হয়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয় ২০১৫ সালের জুনে। আর ভারতের এক্সিম ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়া যায় ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে। তবে ডিটেইল ডিজাইন করার সময় রেলপথটির অ্যালাইনমেন্টে চলমান প্রথম ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের (এফডিইই) নির্মাণকাজ, অবৈধ স্থাপনা ইত্যাদি বিষয় নিবিড়ভাবে পর্যালোচনা ও সমন্বয় করতে হবে। এরই মধ্যে রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটির দরপত্র দ্বিতীয় দফা বাতিল করা হয়। পাশাপাশি বৃদ্ধি পেয়েছে প্রকল্পে সিগন্যালিং কাজের পরিধিসহ অন্যান্য কিছু কাজ। এতে নির্ধারিত সময়ে বিস্তারিত নকশা প্রণয়ন কাজ শেষ হয়নি। ফলে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি টাইমওভার রান দাবি করেছে। এজন্য ভেরিয়েশন প্রস্তাব দাখিল করা হয়েছে।

বৈঠকে আরও জানানো হয়, রেলপথের অ্যালাইনমেন্টে ৪২নং সেতুর ভার্টিক্যাল ক্লিয়ারেন্স ২ মিটার উচ্চতা বৃদ্ধিজনিত কারণে পুনঃডিজাইন করতে হবে। এজন্য পরামর্শক খাতে অতিরিক্ত বরাদ্দ দরকার। আবার ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনা) অনুযায়ী, প্রকল্পটির প্রথম প্যাকেজের নির্মাণকাল ২৪ মাস ধরা হলেও কাজের পরিধি বাড়ায় তা ৩৬ মাস করতে হয়েছে। এজন্য পরামর্শক খাত ব্যয় বাড়বে।

প্রাথমিকভাবে পরামর্শক খাতে চুক্তিমূল্য ছিল ২৪ কোটি ৪০ লাখ টাকা। তবে এ ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ কেটি ৬৭ লাখ টাকা। সব মিলিয়ে পরামর্শক খাতে ব্যয় বাড়ছে ১০ কোটি সাত লাখ টাকা। পরামর্শক খাতে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত এ ব্যয় ডিপিপিতে নির্ধারিত ব্যয়ের চেয়ে বেশি। তবে বৃদ্ধিপ্রাপ্ত ব্যয় ডিপিপির ৫ শতাংশের মধ্যে থাকায় সিসিজিপির নির্দেশনা মোতাবেক এক্ষেত্রে পরিকল্পনা কমিশনের অনুমতি নিতে হবে।

রেলের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ এ প্রকল্পটির অগ্রগতি এখন পর্যন্ত মাত্র ৪০ শতাংশ। তবে রেলপথ নির্মাণে প্রথম প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগ করা হয়েছে ২০১৮ সালের ২৪ জুলাই। আর এক্সিম ব্যাংকের অনুমোদন পাওয়া গেছে ২০১৯ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি। এক্ষেত্রে চুক্তিমূল্য ছিল এক হাজার ৩৯৩ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। যদিও ডিপিপিতে এ খাতে বরাদ্দ ধরা আছে ৭০১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রথম প্যাকেজেই ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে ৪৯২ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এজন্য ডিপিপি সংশোধন করতে হবে।

এদিকে প্রথম প্যাকেজের অধীন ৪২নং সেতুর পুনরায় ডিজাইন করা হচ্ছে। এতে পাইলের সংখ্যা ১১০ থেকে বেড়ে ২৬১তে উন্নীত হয়েছে। একই সঙ্গে সেতুটির অন্যান্য অংশের পরিমাণ ও কাজ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এজন্য বাড়তি অংশের বিল প্রদান বন্ধ রাখা হয়েছে। আর এ সেতুটির নকশায় পরিবর্তনের কারণে আরও দুটি সেতু অতিরিক্ত নির্মাণ করতে হবে। এজন্য ভেরিয়েশন প্রস্তাব অনুমোদন করতে হবে।

নকশা জটিলতা ছাড়াও প্রকল্প এলাকায় বেবিচকের রেকর্ডভুক্ত পাঁচ দশমিক ৪৭ একর ভূমি প্রয়োজন। এ ভূমি হস্তান্তরে রেলওয়ে তিন দফা আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠক করলেও এখনও জমি বুঝে পাওয়া যায়নি। এছাড়া মহাখালী ডিওএইচএস থেকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশন অভিমুখে ৩টি স্থানে ন্যূনতম ভূমির স্বল্পতা রয়েছে। এজন্য আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি করা হয়েছে। আবার এক্সপ্রেসওয়ের পাইলিং সম্পন্ন না হলে রেললাইন নির্মাণকাজ এগিয়ে নেয়া যাচ্ছে না।

এদিকে খিলগাঁও-মালিবাগ সেকশনে বিদ্যমান রেলক্রসিং স্থানান্তর করতে হবে। তবে এর দক্ষিণ পাশে রেলপথের সমান্তরালে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের একটি সড়ক আছে। ফলে ওই রাস্তা স্থানান্তর করতে হবে। আবার টঙ্গী-ধীরাশ্রম-জয়দেবপুর সেকশনে বনমালা লেভেল ক্রসিং থেকে জয়দেবপুর স্টেশন পর্যন্ত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্মিত সড়ক স্থানান্তর করতে হবে। এছাড়া প্রকল্পটির অ্যালাইনমেন্টে বিদ্যমান বিভিন্ন অবৈধ স্থাপনাও অপসারণ করতে হবে। সব মিলিয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়নে নানা প্রতিবন্ধকতা রয়ে গেছে।

বৈঠকে জানানো হয়, প্রকল্পটির দ্বিতীয় প্যাকেজের ঠিকাদার নিয়োগ সম্পন্ন হলে দ্বিতীয় দফা ডিপিপি সংশোধন করতে হবে। এক্ষেত্রে প্রথম প্যাকেজের অতিরিক্ত ব্যয় ও অন্যান্য কাজ মিলিয়ে বাড়তি ১১ কোটি ২০ লাখ ডলার তথা ৯৫২ কোটি টাকা দিতে সম্মত হয়েছে ভারতের এক্সিম ব্যাংক।

এ হিসাবে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়াবে দুই হাজার ৫৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা। তবে সরকারি খাতের বেশকিছু ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। সেগুলো যুক্ত করলে ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা।

জানতে চাইলে ঢাকা-টঙ্গী রেলপথ তৃতীয় ও চতুর্থ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্পের পরিচালক মো. আফজাল হোসেন শেয়ার বিজকে বলেন, বিষয়টি যেহেতু পরিকল্পনা-সংশ্লিষ্ট তাই রেলওয়ের পরিকল্পনা শাখা এ বিষয়ে বিস্তারিত বলতে পারবে। এর বেশি কিছু তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

পরে রেলওয়ের পরিকল্পনা শাখায় যোগাযোগ করা হলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক কর্মকর্তা বলেন, প্রকল্পটির শুরুই ছিল ভুল দিয়ে। সে ভুলের চক্র থেকে বের হওয়া যায়নি। ফলে আট বছরে প্রকল্পটি দৃশ্যমান অগ্রগতি খুবই কম। আর প্রকল্পটিও বারবার সংশোধন করতে হচ্ছে। তবে বর্তমানে প্রকল্পটির যে অবস্থা তাতে কবে নাগাদ নির্মাণকাজ শেষ হবে, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।

সূত্র:শেয়ার বিজ, জানুয়ারী ৬, ২০২১

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।