পয়েন্টসম্যানের অভাবে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রেলের ২০ স্টেশন

পয়েন্টসম্যানের অভাবে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রেলের ২০ স্টেশন

সুজিত সাহা:
ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে অতি জরুরি কর্মী পয়েন্টসম্যান। স্টেশন ছাড়ার আগে ট্রেনচালকের কাছে ট্র্যাক ও অন্যান্য বিষয়ে স্টেশনমাস্টারের নির্দেশনা পৌঁছে দেন পয়েন্টসম্যান। কোথাও কোথাও রেল ট্র্যাক পরিবর্তনের কাজটিও করেন পয়েন্টসম্যান।

পি-ম্যান নামে পরিচিত গুরুত্বপূর্ণ এ পদে লোকবল সংকট থাকলেও তা কাটিয়ে উঠতে পারছে না রেলওয়ে। এতে করে বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে অন্তত ২০টি গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনে রেলওয়ের যাত্রী ও পরিবহন সেবা। পয়েন্টসম্যান সংকট কাটাতে নিয়োগবিধি সংশোধনে রেলপথ মন্ত্রণালয় কালক্ষেপণ করছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।

জানা গেছে, পয়েন্টসম্যানের পদটি চতুর্থ শ্রেণীর। এ পদে সরাসরি নিয়োগের সুযোগ নেই রেলওয়ের। বিদ্যমান নিয়োগবিধি অনুযায়ী, রেলওয়ের ট্রাফিক বিভাগে গেটকিপার, পোর্টার, সিলম্যান ও ওয়েটিংরুম বেয়ারাসহ অন্যান্য চতুর্থ শ্রেণীর পদে ন্যূনতম তিন বছর কর্মরতদের মধ্য থেকে পয়েন্টসম্যান নিয়োগ দিতে হয়। কিন্তু এক দশক ধরে ট্রাফিক বিভাগে চতুর্থ শ্রেণীর লোকবল নিয়োগে ধীরগতির পাশাপাশি একাধিক পদের নিয়োগ প্রক্রিয়া আটকে আছে মামলাজনিত কারণে। এ কারণে পি-ম্যান পদেও পদোন্নতিযোগ্য কর্মী পাওয়া যাচ্ছে না।

সংশ্লিষ্টরা জানান, নিয়োগবিধি সংশোধন করে রেলের বিভিন্ন বিভাগ থেকে পয়েন্টসম্যান নিয়োগের উদ্যোগ নেয়া হয় প্রায় দুই বছর আগে। তবে এখনো মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে রেলের পরিবহন বিভাগের এ উদ্যোগ। এদিকে পয়েন্টসম্যান পদে কর্মী সংকটের কারণে আগামী জুনের মধ্যে শুধু পূর্বাঞ্চলেই রেলের ২০টি স্টেশন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। একই কারণে নিরাপদ ট্রেন পরিচালনা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, নিয়োগবিধি সংশোধনের মাধ্যমে পি-ম্যান নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করতে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে একটি চিঠি পাঠান রেলওয়ের মহাপরিচালক আমজাদ হোসেন (তত্কালীন)। রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে দেয়া ওই চিঠিতে ফিডার পদ থেকে চাহিদা অনুযায়ী পয়েন্টসম্যান না পাওয়ায় রেলওয়ের নিয়োগবিধি-১৯৮৫ সংশোধনের অনুরোধ জানানো হয়। এর মাধ্যমে পয়েন্টসম্যানের ৬০ শতাংশ শূন্যপদে সরাসরি নিয়োগ এবং ৪০ শতাংশ পদ রেলের যেকোনো বিভাগের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মীদের পদোন্নতি দিয়ে পূরণের অনুরোধ জানানো হয়। এক্ষেত্রে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে এসএসসি বা সমমান ও ফিডার পদ থেকে পদোন্নতির ক্ষেত্রে তিন বছরের চাকরির যোগ্যতা রাখতে প্রস্তাব করা হয়। তবে চিঠি প্রাপ্তির পর এখনো কোনো উদ্যোগ নেয়নি রেলপথ মন্ত্রণালয়।

ট্রাফিক বিভাগের তথ্যানুসারে, বাংলাদেশে যে পদ্ধতিতে ট্রেন চলাচল করে তাতে পয়েন্টসম্যান ছাড়া সেবাপ্রদান অসম্ভব। সর্বশেষ গত ২৯ ডিসেম্বর হাজীগঞ্জ স্টেশনে কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে শামসুল হক নামে এক পি-ম্যান সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। ওই স্টেশনে মঞ্জুরিকৃত তিনটি পি-ম্যান পদের বিপরীতে কর্মরত ছিলেন দুজন। এর মধ্যে একজন মারা যাওয়ায় স্টেশনটির কার্যক্রম পরিচালনা দুরূহ হয়ে পড়েছে। এর আগে ২৭ ডিসেম্বর শশীদল স্টেশনের পি-ম্যান মুজিবুল হক স্টেশন থেকে বাড়ি ফেরার পথে মারা যান। ওই স্টেশনে মঞ্জুরিকৃত পি-ম্যান দুজন। একজনের মৃত্যু হওয়ায় ঝুঁকিতে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্টেশনটিতে ট্রেন চলাচল।

এদিকে চলতি বছরের ১ জানুয়ারি কুমিল্লায় দুজন, ইমামবাড়ীতে একজন, কসবায় একজন, চাঁদপুরে একজন ও চট্টগ্রামে একজন পি-ম্যান অবসরে যান। ক্রমাগত অবসরে যেতে থাকায় পি-ম্যানের সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে।

সূত্র জানায়, বর্তমানে রেলওয়ের উভয় অঞ্চলে মঞ্জুরিকৃত পয়েন্টসম্যান পদের সংখ্যা ১ হাজার ৪৪৫। এর মধ্যে শূন্য পদ রয়েছে ৪৭১টি। পয়েন্টসম্যানের সংকট সবচেয়ে তীব্র রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে। এ অঞ্চলে মঞ্জুরিকৃত ৭৫০টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র ৪১৮ জন পয়েন্টসম্যান। সর্বশেষ ৩১ ডিসেম্বর অবসরোত্তর ছুটিতে গেছেন ৩৯ জন। এছাড়া ২০১৯ সালে ২৭ জন এবং ২০২০ সালে আরো ২৬ জন পয়েন্টসম্যান অবসরে যাবেন। এতে ২০২০ সালের মধ্যে পূর্বাঞ্চলে কর্মরত পয়েন্টসম্যানের সংখ্যা দাঁড়াবে ৩৬৫ জনে, যা মঞ্জুরিকৃত পদের প্রায় অর্ধেক। এ অবস্থায় নিয়োগবিধি সংশোধনের মাধ্যমে ফিডার পদ থেকে পি-ম্যান নিয়োগ দেয়া না গেলে ট্রেন পরিচালনা ঝুঁকির মধ্যে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা।

অভিযোগ উঠেছে, পি-ম্যান নিয়োগবিধি সংশোধনের এখতিয়ার রেলপথ মন্ত্রণালয়ের থাকলেও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন চাওয়ায় দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হচ্ছে। ২০১৭ সালের জুলাইয়ে নিয়োগবিধি সংশোধনের প্রস্তাব পাওয়ার পর একই বছরের ১২ সেপ্টেম্বর রেলপথ সচিবের পক্ষ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবকে ফিডার পদ থেকে পয়েন্টসম্যানে পদোন্নতি বিধি সংশোধনে ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা হয়।

জানতে চাইলে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, রেলের লোকবল সংকট দীর্ঘদিনের। পয়েন্টসম্যানেরও সংকট আছে। বিষয়টি আমাদের নজরে রয়েছে। রেলের মহাপরিচালক কিংবা দুই অঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকরাও সংকটের বিষয়টি জানিয়েছেন। আশা করি দ্রুত এ বিষয়ে একটি সমাধানে আসবে রেলপথ মন্ত্রণালয়।

পরিবহন বিভাগের তথ্যমতে, প্রতিটি ট্রেন স্টেশন পার হওয়ার সময় স্টেশন মাস্টারের লিখিত একটি বার্তা পয়েন্টসম্যান ট্রেনের চালককে পৌঁছে দেন। কোনো স্টেশনে ট্রেন প্রবেশের অনুমতি পেতে জটিলতা তৈরি হলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কন্ট্রোল রুমের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্টেশন মাস্টার সেখানে প্রবেশ করতে যাওয়া ট্রেনের জন্য একটি নির্দেশনামূলক বার্তা তৈরি করেন। এভাবে একজন পয়েন্টসম্যান উভয়মুখী ট্রেনের জন্য দৈনিক সর্বমোট ১৫টি বার্তা বা ওপিটি (অপারেশনাল ট্রান্সপোর্টেশন) বহন করে পৌঁছে দেন। অনেক সময় সংশ্লিষ্ট স্টেশনে থাকা ট্রেনেও চলন্ত অবস্থায় চালকের কাছে বার্তা পৌঁছাতে হয় বলে পি-ম্যানের কাজটি কষ্টসাধ্য ও ঝুঁকিপূর্ণ। এ অবস্থায় নির্বিঘ্ন ট্রেন পরিচালনার জন্য পি-ম্যান ছাড়া কোনো স্টেশন চালু রাখা সম্ভব নয়।

পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে রেলের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, পি-ম্যান সংকট কাটাতে রিক্রুটমেন্ট রুলস সংশোধন জরুরি। এ ক্ষমতা রেলওয়ে সচিবের থাকলেও অজানা কারণে প্রস্তাব পাঠানোর দেড় বছর অতিক্রান্ত হলেও কোনো সিদ্ধান্ত দেয়া হচ্ছে না। ফলে যেকোনো সময় একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। এতে সেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কার কথা জানান ওই কর্মকর্তা।

সুত্র:বণিক বার্তা, জানুয়ারি ০৫, ২০১৯

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।