প্রথম দিন থেকে পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলা নিয়ে সংশয়

প্রথম দিন থেকে পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলা নিয়ে সংশয়

রাজীব আহাম্মদ: আগামী জুনে পদ্মা সেতু যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়ার পরিকল্পনা এগিয়ে চলছে। তবে প্রথম দিন থেকে সেতু দিয়ে ট্রেন চলাচল না করার শঙ্কা জোরালো হয়েছে। সেতুর তুলনায় রেল সংযোগ প্রকল্প পিছিয়ে থাকায় আগেই এ সংশয় ছিল। এর পরেই সরকারের ঘোষণা ছিল- একই দিনে গাড়ির সঙ্গে ট্রেনও চলবে। কিন্তু এবার রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনেরই সংশয়- উদ্বোধনের দিনে ‘হয়তো’ ট্রেন চালানো সম্ভব হবে না। সেতু চালুর পর রেললাইন স্থাপনের কাজ শুরু হলে যান চলাচলে সমস্যারও শঙ্কা রয়েছে।

গতকাল মঙ্গলবার পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন রেলমন্ত্রী। কেরানীগঞ্জের পানগাঁওয়ে প্রকল্পের কার্যালয়ে অগ্রগতি পর্যালোচনা সভার পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন, পদ্মা সেতুর কাজ শেষের পথে। আগামী জুনে যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। ওই দিন থেকে ট্রেন চালাতে হলে আগামী ডিসেম্বর থেকে সেতুতে রেললাইন স্থাপনের কাজ শুরু করতে হবে। তবে পদ্মা সেতু নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ এখনও কাজ শুরুর অনুমতি দেয়নি রেলওয়েকে। সেতু বিভাগ আগামী মার্চ-এপ্রিল নাগাদ তাদের সব কাজ শেষ করার পর রেলওয়েকে কাজ শুরুর অনুমতি দিতে চায়। তেমনটি হলে আগামী জুনে সেতুতে ট্রেন পরিচালনা সম্ভব নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগামী বছরের ডিসেম্বরে ঢাকা থেকে মাওয়া হয়ে ভাঙা পর্যন্ত নির্মাণাধীন রেলপথটি চালু হবে।

৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকায় পদ্মা সেতু নির্মাণ চলছে। ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত ব্রডগেজ রেলপথ নির্মাণে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকার আরেকটি প্রকল্প চলছে ‘পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প’ নামে। দুটিই সরকারের অগ্রাধিকারের প্রকল্প।

৬ দশমিক ১৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পদ্মা সেতু দুই তলাবিশিষ্ট। এর ওপরতলা (আপার ডেক) দিয়ে চলবে গাড়ি। নিচতলা (লোয়ার ডেক) দিয়ে ট্রেন চলবে ব্রডগেজ লাইনে। নিচতলায় রেলপথ ছাড়াও থাকছে গ্যাসের পাইপলাইন ও হাঁটার পথ (ওয়াকওয়ে)।

রেলমন্ত্রী বলেন, পদ্মা সেতুতে রেললাইন হবে ব্যালাস্টবিহীন (পাথরবিহীন)। স্লিপার ব্যবহার করা হবে না। ঢালাই করে রেলপথ নির্মাণ করা হবে। এ কাজে ছয় মাস সময় লাগবে।

রেলওয়ে ডিসেম্বর থেকে রেলপথ বসানোর কাজ শুরু করে আগামী মে মাসে শেষ করতে চাইলেও তা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, লোয়ার ডেকে গ্যাসের লাইন স্থাপন এবং ওয়াকওয়ে নির্মাণে কাজ চলছে। এসব কাজ শেষে রেলওয়েকে রেললাইন স্থাপনের অনুমতি দেবে সেতু কর্তৃপক্ষ। ডিসেম্বরের মধ্যে রেলকে কাজের অনুমতি না দিলে প্রথম দিন

থেকে ট্রেন চলবে না- এমন বাস্তবতায় পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম সমকালকে বলেন, পদ্মা সেতু একটি জটিল কারিগরি বিষয়। সেতু বিভাগ তাই চাইলেও নিজের কাজ শেষ করার আগে রেলকে কাজ শুরুর অনুমতি দিতে পারবে না। কবে নাগাদ অনুমতি দেওয়া সম্ভব হবে, তা আগামী নভেম্বর সেতু বিভাগ ও রেলওয়ের যৌথ পরিদর্শনে ঠিক করা হবে।

পদ্মা সেতু প্রকল্প সূত্র সমকালকে বলেছে, আগামী এপ্রিলের আগে রেললাইন স্থাপনের অনুমতি দেওয়া সম্ভব হবে না। তাতে নিশ্চিত- প্রথম দিন থেকে ট্রেন চলবে না। তবে ট্রেন বাদ রেখে সেতু চালু হলে পরবর্তী সময়ে রেললাইন বসানোর কাজে বিপত্তির শঙ্কা রয়েছে।

সূত্রটির ভাষ্য, সেতুতে যান চলাচল শুরুর পর নিচতলায় রেললাইন স্থাপন কাজে ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহারে কম্পনসহ যে পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে, তাতে সেতুতে যান চলাচল অব্যাহত রাখা সম্ভব নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে পদ্মা সেতুর উদ্বোধনই পিছিয়ে পড়তে পারে।

রেলমন্ত্রীও বলেছেন, সেতু চালুর পর নিচতলায় রেলপথ বসানোর কাজে কম্পন সৃষ্টি হয়ে যান চলাচলে কিছু সমস্যা হতে পারে।

ঢাকার কমলাপুর থেকে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা, কেরানীগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর, লৌহজং, পদ্মা সেতু, শরীয়তপুরের জাজিরা, মাদারীপুরের শিবচর, ফরিদপুরের ভাঙ্গা, নড়াইল, মাগুরা হয়ে যশোর পর্যন্ত ১৬৯ কিলোমিটার মূল রেললাইন তিনটি প্যাকেজে নির্মাণ করা হচ্ছে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের অধীনে। প্রথম প্যাকেজে ঢাকা থেকে মাওয়া পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৪২ শতাংশ, দ্বিতীয় প্যাকেজে মাওয়া থেকে ভাঙ্গা অগ্রগতি ৭০ শতাংশ এবং শেষ প্যাকেজে ভাঙ্গা থেকে যশোর রেলপথ নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে ৪০ শতাংশ। রেলের পরিকল্পনা আগামী জুনে মাওয়া-ভাঙ্গা সেকশন চালু করা। প্রকল্প মেয়াদ ২০২৪ হলেও এক বছর আগেই বাকি কাজ শেষ করতে চায় রেল। যদিও লক্ষ্যমাত্রা পিছিয়ে রয়েছে প্রকল্পটির।

১৬৯ কিলোমিটার মূল রেলপথ ছাড়াও ৪৬ কিলোমিটার লুপ লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। মূল রেলপথের ২৩ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার হবে ভায়াডাক্টে (উড়াল)। মাওয়ায় উড়ালপথে বসেছে এক দশমিক ৭ কিলোমিটার পাথরবিহীন রেলপথ। তাতে রেললাইনের স্লিপার ও রেলপাত বসানোর ‘গ্যাং ট্রেনে’ চড়েন রেলমন্ত্রী। তিনি পদ্মা সেতুর জাজিরা প্রান্তে ভায়াডাক্টের ওপর স্লিপার স্থাপন কাজের উদ্বোধন করেন।

এ সময় অন্যদের মধ্যে ছিলেন রেল সচিব সেলিম রেজা, রেলের মহাপরিচালক ডিএন মজুমদার, রেল সংযোগ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সেনাবাহিনীর কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্টের (সিএসসি) প্রধান সমন্বয়ক মেজর জেনারেল এফ এম জাহিদ হোসাইন, উপপ্রধান সমন্বয়ক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জাকির আহমেদ, সংযোগ প্রকল্পের পরিচালক আফজাল হোসেন।

এর আগে পানগাঁওয়ে প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা উপস্থাপনার ঠিকাদার চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের (সিআরইসি) কর্মকর্তারা অভিযোগ তোলেন, অর্থায়নের সমস্যা রয়েছে। তারা নির্ধারিত সময়ে বিল পাচ্ছে না। জমি বুঝে পেতেও সমস্যা হয়েছে। শতাধিক ভেরিয়েশন (পরিবর্তন) এসেছে প্রকল্পের কাজে। এসব অভিযোগ সম্পর্কে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম বলেন, জমি অধিগ্রহণে কোনো সমস্যা নেই। অর্থায়নেও সংকট নেই। নির্বিঘ্নে কাজ চলছে।

ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিয়ে সেতুর নিচতলা পরিদর্শন করেন মন্ত্রী। তিনি পদ্মা সেতু কর্মকর্তাদের কাছে জানতে চান, ডিসেম্বরের মধ্যে সব কাজ শেষ করে রেললাইন স্থাপন কাজ শুরুর অনুমতি দিতে অসুবিধা কোথায়? সেতুর প্রকৌশলীরা মন্ত্রীকে জানান, রেলপথ যেখানে বসবে, তার পাশেই গ্যাসলাইন স্থাপনের কাজ চলছে। রেললাইন বসানোর কাজ করতে ভারী যন্ত্রপাতি আনতে হবে। গ্যাস পাইপ বসাতেও ভারী যন্ত্র ব্যবহার করা হচ্ছে। এতটি ভারী যন্ত্রপাতি পাশাপাশি কাজ করা সম্ভব নয়।

সূত্র:সমকাল, ০৮ সেপ্টেম্বর ২১ 


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।