পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও অবহেলিত থাকছে রেল!

পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও অবহেলিত থাকছে রেল!

ইসমাইলআলীএকশ বছরেরও বেশি আগে পদ্মা নদীর ওপর নির্মাণ করা হয়েছিল হার্ডিঞ্জ ব্রিজ। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত এ রেল সেতুটি ডাবল লাইন। অথচ বর্তমানে একই নদীর ওপর নির্মাণাধীন পদ্মা সেতুর রেলপথটি সিঙ্গেল লাইন। এতে পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচল সক্ষমতা অনেক কম হবে। এছাড়া পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক ও রেলপথটির রুটে একাধিক স্থানে রয়েছে সাংঘর্ষিক অবস্থা। সে সমস্যা সমাধান না হওয়ায় জাজিরা প্রান্তে পদ্মা রেল সংযোগ লাইনের কাজ আপাতত বন্ধ। এতে একই দিনে যান ও ট্রেন চলাচল উদ্বোধন করার সম্ভাবনাও নেই।

সূত্রমতে, ২০০৭ সালে সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পদ্মা সেতু প্রকল্প অনুমোদন করা হয়। সে সময় শুধু সড়ক সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। তবে ২০০৯ সালের শুরুতে দায়িত্ব গ্রহণের পর পদ্মা সেতুতে সড়কের পাশাপাশি রেলপথ সংযোগের সিদ্ধান্ত নেয় বর্তমান সরকার। এর পরিপ্রেক্ষিতে দ্বিতল সেতুর (ওপরতলায় যান ও নিচতলায় ট্রেন) নকশা প্রণয়ন করা হয়।

সে সময় প্রকল্পটির নির্মাণ ব্যয়ও বেড়ে যায়। ২০১১ সালে ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকার সংশোধিত প্রকল্প অনুমোদন করে সরকার। যদিও ব্যয় হ্রাসের যুক্তিতে নকশা প্রণয়নের সময় সিঙ্গেল লাইন রেলপথ নির্মাণের বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। রেলওয়ের পক্ষ থেকে সে সময় এর বিরোধিতা করে ডাবল লাইন নির্মাণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তবে তা গ্রহণ করা হয়নি।

পরবর্তীকালে পদ্মা সেতুর নির্মাণব্যয় আরও বৃদ্ধি পায়। এর মধ্যে ২০১৬ সালে আট হাজার ২৮৬ কোটি টাকা বেড়ে মোট ব্যয় দাঁড়ায় ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। ২০১৮ সালে তা আরও এক হাজার ৪০০ কোটি টাকা বাড়ানো হয়েছে। এতে বর্তমানে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। তবে পাইলের নকশায় পরিবর্তন ও বাস্তবায়ন বিলম্বের কারণে নির্মাণ শেষের দিকে পদ্মা সেতুর ব্যয় আরেক দফা বৃদ্ধি পাবে। এতে সেতুটির মোট নির্মাণ ব্যয় ৩৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা।

যদিও সিঙ্গেল লাইন রেলপথ পদ্মা সেতুর বড় একটি দুর্বলতা বলে মনে করেন রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, পদ্মা সেতু দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সঙ্গে রাজধানীকে যুক্ত করবে। এতে ওই অঞ্চলের জেলাগুলোর সঙ্গে রেল সংযোগ স্থাপনে বিভিন্ন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। এছাড়া বরিশাল হয়ে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের জন্য সম্ভাব্যতা যাচাই চলছে। পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হলে ওই রুটে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচলও বাড়বে। পাশাপাশি বর্তমানে অনেকটা ঘুরপথে চলা মৈত্রী ট্রেনও এ সেতু দিয়ে সহজে চলাচল করতে পারবে। আবার মংলা বন্দরের সঙ্গে রেলপথে রাজধানীর সংযোগ হবে পদ্মা সেতু দিয়েই। তাই পদ্মা সেতুতে ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণ করা দরকার ছিল। এজন্য কয়েক দফা আপত্তি তোলে রেলওয়ে, কিন্তু তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ফলে আগামীতে এ সেতুটি ট্রেন চলাচলের ক্ষেত্রে কম কার্যকর হবে। যদিও বিদ্যমান কাঠামোতেই ডাবল লাইন নির্মাণের সুযোগ ছিল। শুধু সেতুটির ভারবাহী ক্ষমতা বাড়ালেই চলত।

জানতে চাইলে পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. শামছুল হক শেয়ার বিজকে বলেন, স্বাভাবিকভাবে চার লেনের সেতুর জন্য যতটুকু জায়গা লাগে ট্রেনের দুই লেনের জন্য তার চেয়ে কিছুটা কম জায়গা লাগে। কারণ মোটরযানের জন্য রাইট অব ওয়ে যতটুকু দরকার ট্রেনের ততটা লাগে না। আর পদ্মা সেতু যেহেতু দুই তলার এবং ওপরতলায় যানবাহন চলাচলের জন্য চার লেনের ব্যবস্থা আছে, তাই নিচতলায় ডাবল লাইন রেলপথ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় জায়গা থাকার কথা। তবে সম্ভাবতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশায় কেন বিষয়টি রাখা হয়নি, তা সংশ্লিষ্টরাই ভালো বলতে পারবেন।

এ বিষয়ে সেতু বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ডাবল লাইন রেলপথের জন্য পদ্মা সেতুর ভারবাহী সক্ষমতা আরও বাড়াতে হতো। এতে সেতুর নির্মাণব্যয় আরও বেড়ে যেত। তাই সিঙ্গেল লাইন রেলপথই রাখা হয়। প্রধানমন্ত্রীও বিষয়টি অনুমোদন দেন। তাই এখন এ বিষয় নিয়ে বিতর্কের কোনো সুযোগ নেই।

যদিও রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ১০৫ বছর আগে পদ্মা নদীর ওপর নির্মিত হার্ডিঞ্জ ব্রিজটি ছিল ডাবল লাইনের। অথচ এখন পদ্মা সেতুতে নির্মাণ করা হচ্ছে সিঙ্গেল লাইন রেলপথ। যমুনা নদীতে সেতু নির্মাণের ক্ষেত্রেও সিঙ্গেল লাইন রেলপথ ছিল। তাই দুই দশকের মধ্যে পৃথক রেল সেতু নির্মাণে প্রকল্প নিতে হয়েছে। কিন্তু পদ্মার মতো খরস্রোতা নদীতে একটি সেতু নির্মাণেই অনেক ঝামেলা পোহাতে হচ্ছে। এর পাশে চাইলেও আরেকটি রেলসেতু নির্মাণ সহজসাধ্য বিষয় নয়। আর যদি তা করাও হয় তবে ব্যয় পড়বে অনেক বেশি।

এদিকে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের ভায়াডাক্টের (উড়ালপথ) সঙ্গে পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়কের কয়েকটি স্থানে রয়েছে সাংঘর্ষিক অবস্থা। এর মধ্যে ভায়াডাক্টের পি২৫-১ ও পি২৫-২ পিলারে সমস্যা বেশি। এ পিলার দুটি নির্মাণ করতে গিয়ে জাজিরায় নির্মিত সংযোগ সড়কের কিছু অংশ কেটে ফেলেছে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের ঠিকাদার চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি)। এছাড়া এই পিলার দুটির উচ্চতা ভূমি থেকে ছয় মিটারের কম, যা সংযোগ সড়কে যান চলাচলে বাধার সৃষ্টি করবে।

সেতু কর্তৃপক্ষ বলছে, সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের ম্যানুয়াল অনুযায়ী ভায়াডাক্টের উচ্চতা কমপক্ষে ছয় মিটার হতে হবে। কিন্তু পিলার দুটির উচ্চতা যথাক্রমে পাঁচ দশমিক ৫১৭ ও পাঁচ দশমিক ৭০ মিটার। এগুলোর উচ্চতা বাড়িয়ে ছয় মিটার করতে হবে। তবে তা মানতে রাজি নয় পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্প কর্তৃপক্ষ।

রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এক্ষেত্রে যুক্তি দিচ্ছে, ২০১৬ সালে পদ্মা রেল সংযোগ অংশের ডিজাইন প্রণয়ন করা হয়েছে। পরে তা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন পিলার নির্মাণ করা হয়েছে। তাই চাইলেই এখন আর পিলারের উচ্চতা বাড়ানো সম্ভব নয়। আর পি২৫-১ ও পি২৫-২ একটি পোর্টাল ফ্রেম পিলার। তাই এখন ডিজাইন পরিবর্তন অসম্ভব। বরং পদ্মা সেতুর সংযোগ সড়ক কিছুটা নিচু করতে হবে। এ নিয়ে আপত্তি তুলেছে পদ্মা সেতু কর্তৃপক্ষ। নকশাগত জটিলতা নিরসনে রেলওয়েকে কয়েক দফা চিঠিও দিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। তবে তা না মেনেই পিলার দুটির পাইলিং সম্পন্ন করেছে সিআরইসি। এর পরিপ্রেক্ষিতে জাজিরা প্রান্তে ওই অংশের কাজ বন্ধ করে দিয়েছে সেতু কর্তৃপক্ষ। বিষয়টি সমাধানে এরই মধ্যে ৯ সদস্যবিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে বিষয়টি এখনও সমাধান করা যায়নি। এছাড়া পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের নকশা নিয়ে আরও কিছু সমস্যা রয়েছে। ফলে রেল সংযোগের কাজ অনেক পিছিয়ে গেছে। এ অবস্থায় পদ্মা সেতুতে একই দিনে যান ও ট্রেন চলাচলের উদ্বোধনের সম্ভাবনা নেই বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র:শেয়ার বিজ, সেপ্টেম্বর ১, ২০২০ 

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।