দ্রুতগতির ট্রেন চলছে ধীরে

দ্রুতগতির ট্রেন চলছে ধীরে

আনোয়ার হোসেন:
সম্প্রতি ইন্দোনেশিয়া থেকে ব্রডগেজ ট্রেনের কোচ আমদানির পর রেল কর্তৃপক্ষ বলছে, এগুলো ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার গতিতে চলবে। অথচ লাইনের সক্ষমতা নেই বলে পশ্চিমাঞ্চলে ব্রডগেজ ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার থেকে ৮৫ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে। পুরো পশ্চিমাঞ্চলে ট্রেনের যাতায়াত দুই ঘণ্টা পর্যন্ত বেড়েছে। বিপুল টাকা ঢেলেও ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে ট্রেনের যাতায়াত ৪৫ মিনিট বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

রেললাইন, কোচ, ইঞ্জিন, স্টেশন, সংকেতব্যবস্থা —সব ঠিক থাকলে ট্রেন সময় মেনে চলে। কিন্তু দেখা গেছে, একটি ঠিক থাকলে তো আরেকটি ঠিক থাকছে না। রেলে প্রতিটি ট্রেনের যাত্রার স্থান থেকে গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় নির্ধারিত আছে। এর ব্যত্যয় হলেই সময় মানা হয়নি বলে ধরা হয়। গতি কমে যাওয়ার কারণে সময়ানুবর্তিতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে যাত্রার সময় বাড়িয়ে তা সামাল দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।

অথচ রেলওয়ের নথি বলছে, গত ১০ বছরে রেলের উন্নয়ন প্রকল্প আর রেল পরিচালনা মিলিয়ে খরচ হয়েছে সাড়ে ৫৩ হাজার কোটি টাকা। নতুন রেললাইন ও সেতু নির্মাণে প্রচুর প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। নির্মাণ করা হয়েছে ৯১টি নতুন স্টেশন ভবন। ১৭৭টি স্টেশন ভবন পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে। লোকবল নিয়োগ করা হয়েছে প্রায় ১১ হাজার। লোকবলের অভাবে এরপরও বন্ধ প্রায় এক–চতুর্থাংশ রেলস্টেশন। সংকেতব্যবস্থা আধুনিকায়ন করার পরও প্রায়ই বিকল হয়ে ট্রেন চলাচল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কাজী রফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, ১৪০ কিলোমিটার গতিতে চলার মতো কোচ আসছে। তবে এখনই এই গতিতে চালানো যাবে না। নতুন লাইন নির্মাণ এবং বিদ্যমান লাইন মেরামতের পর ভবিষ্যতে গতি বাড়ানো হবে। পশ্চিমাঞ্চলে সময়ানুবর্তিতা কমে যাওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, লাইনে সংস্কার কাজের কারণে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। স্টেশনও বন্ধ রয়েছে অনেক স্থানে। সব মিলিয়ে সময় মেনে ট্রেন চলার হার কমেছে। পূর্বাঞ্চলে আরও ৪৫ মিনিট যাত্রার সময় বাড়ানোর বিষয়ে তিনি বলেন, এখন যে সময়সীমা মেনে ট্রেন চলছে, সেটা থেকে আর সময় বাড়বে না।

স্টেশন বন্ধ থাকার বিষয়ে রেলের মহাপরিচালক বলেন, দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ থাকার কারণে স্টেশনমাস্টারের সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বিপুল নিয়োগ হয়েছে। এসব নতুন কর্মীকে মাস্টার পর্যায়ে পৌঁছাতে সময় লাগবে।

পদ্মা-যমুনা নদী দিয়ে রেলের দুটি ভাগ—পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল। পূর্বাঞ্চলের মধ্যে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ পড়েছে; আর রাজশাহী, রংপুর ও খুলনা বিভাগ পড়েছে পশ্চিমাঞ্চলে।

পূর্বাঞ্চলে ট্রেনের যাত্রার সময় বাড়ছে

পূর্বাঞ্চলের ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথের দূরত্ব ৩২৫ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২৫৩ কিলোমিটার পথে ট্রেন আসা-যাওয়ার জন্য আলাদা লাইন রয়েছে। কিন্তু আখাউড়া-লাকসাম পর্যন্ত ৭২ কিলোমিটার পথে এক লাইন। পথটি ডাবল লাইন করার নির্মাণকাজ চলমান। রেলওয়ে সূত্র বলছে, গত ১০ ফেব্রুয়ারি আখাউড়া-লাকসাম মিশ্র গেজ ডাবল লাইন প্রকল্পের পরিচালক ডি এন মজুমদার রেলভবনে একটি চিঠি দেন। এতে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে প্রতি ট্রেন চলাচলের সময় ৪৫ মিনিট বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। সময়সীমা বাড়ানোর কারণ হিসেবে চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য কিছু কিছু স্থানে ট্রেন চলাচলে ডাইভারশন (বিকল্প পথ) করতে হবে। এ জন্য বাড়তি সময়ের প্রয়োজন। বর্তমানে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে ঘণ্টায় ৭২ থেকে ৭৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলে। সময় বৃদ্ধির প্রস্তাব কার্যকর হলে গতি আরও কমবে।

রেলওয়ে সূত্র জানায়, লাকসাম-আখাউড়া পথে ৭২ কিলোমিটার মিশ্র গেজ ডাবল লাইন নির্মাণে সাড়ে ছয় হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৪ সালে। তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু ঠিকাদারই নিয়োগ হয় ২০১৬ সালে। এরপর ২০২০ সালের জুন মাস পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়েছে। তবে প্রায় আড়াই বছরে কাজের অগ্রগতি মাত্র ৫৭ শতাংশ।

সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেন ২০০০ সালে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে যেত পাঁচ ঘণ্টায়। মাঝখানে কয়েক বছর ওই ট্রেনের নির্ধারিত সময় ছয় ঘণ্টা করা হয়। গত বছর তা করা হয় ৫ ঘণ্টা ১০ মিনিট। এবার ৪৫ মিনিট সময় বৃদ্ধি করলে এই ট্রেনের যাত্রার সময়ও বাড়বে। অর্থাৎ প্রায় ১৯ বছর পর রেলের গতি না বেড়ে কমছে।

এর আগে টঙ্গী থেকে ভৈরব বাজার এবং লাকসাম থেকে চট্টগ্রামের চিনকি আস্তানা পর্যন্ত প্রায় চার হাজার কোটি টাকা খরচ করে ১২৫ কিলোমিটার রেলপথ মিশ্র গেজ ডাবল লাইনে উন্নীত করা হয়েছে। প্রকল্প নেওয়ার আগে কর্তৃপক্ষ বলেছিল, এই দুটি প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম পথে ট্রেন চলাচলের সময় কমে আসবে। এর বাইরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ থেকে চট্টগ্রামের চিনকি আস্তানা পর্যন্ত বিদ্যমান রেলপথ সংস্কারে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। দৈনন্দিন মেরামত তো রয়েছেই। এরপরও ট্রেন চলাচলের সময়সীমা কমছে না।

পশ্চিমাঞ্চলে সময় মেনে চলছে না ট্রেন

রেলওয়ে সূত্র বলছে, কয়েক বছর ধরে পশ্চিমাঞ্চলে ব্রডগেজ রেললাইনের কিছু কিছু স্থানে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চলেছে। চলতি বছরের শুরুতে বেশির ভাগ ব্রডগেজ ট্রেনের গতিসীমা ঘণ্টায় ৮৫ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়।

রেলের সূত্র জানায়, রেলের সাবেক মহাপরিচালক আমজাদ হোসেনের নির্দেশনা অনুসারে গত বছর পশ্চিমাঞ্চলে ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই সময়ে ওই অঞ্চলে রেলপথ ও সেতু নির্মাণ, নতুন ইঞ্জিন-কোচ কেনা, পুরোনো কোচ পুনর্বাসনসহ রেলের উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করা হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে সাবেক মহাপরিচালক সমালোচনা এড়াতে অনেকটা চাপ দিয়ে গতি বাড়াতে বাধ্য করেছিলেন। কিন্তু মহাপরিচালক পরিবর্তনের পর ট্রেনের গতিও কমে গেছে। এখন পশ্চিমাঞ্চলে রেলের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৮৫ কিলোমিটারে নামিয়ে আনা হয়েছে।

রেলের একজন দায়িত্বশীল সূত্র বলছে, ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার করার মতো অবস্থায় ছিল না। এখন বিভাগীয় প্রকৌশলীরা বলছেন, বাড়তি গতিতে ট্রেন চললে দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।

পশ্চিমাঞ্চলের ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা কম কেন—এ বিষয়ে একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট (পশ্চিম) এ এম এম শাহনেওয়াজ। গত ৩১ জানুয়ারি রেলভবনে পাঠানো তাঁর এক চিঠিতে বলা হয়, সিরাজগঞ্জের জামতৈল থেকে দিনাজপুরের পার্বতীপুর পর্যন্ত ২২৮ কিলোমিটার রেলপথে ঘণ্টায় গতি ১০০ থেকে ৮৫ কিলোমিটারে নামিয়ে এনেছে প্রকৌশল শাখা। এর ফলে এই পথে ২০ থেকে ৪৫ মিনিট পর্যন্ত অতিরিক্ত সময় লাগছে।

ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, স্টেশনমাস্টারের অভাবে পাকশী ও লালমনিরহাট বিভাগে ৭৩টি ‘বি’ শ্রেণির স্টেশন বন্ধ রয়েছে। এর ফলে প্রতিটি বন্ধ স্টেশন পার হতে দুই মিনিট করে দেরি হয়। স্টেশন বন্ধ থাকায় প্রয়োজনমতো ক্রসিং (অন্য ট্রেন চলতে দেওয়া) সম্ভব হয় না। এতে ২৫ থেকে ৪০ মিনিট পর্যন্ত বাড়তি সময় ব্যয় হয়। টাঙ্গাইলের কালিয়াকৈর ও খুলনা স্টেশনে কাজ চলার কারণে সেখানেও ট্রেনের বিলম্ব হয়। গাজীপুরের জয়দেবপুর থেকে সিরাজগঞ্জের জামতৈল পর্যন্ত সক্ষমতার চেয়ে ১০টি ট্রেন বেশি চলে। বঙ্গবন্ধু সেতুতে ট্রেন ধীরে চালাতে হয়। সব মিলিয়ে প্রতিটি ট্রেনের ২ ঘণ্টার বেশি বিলম্ব হয়ে যাচ্ছে।

প্রায় এক–চতুর্থাংশ স্টেশন বন্ধ

রেলের নথি অনুযায়ী, রেলে অনুমোদিত পদের সংখ্যা ৪০ হাজার ২৭৫। বর্তমানে আছে ২৪ হাজার ৫১৩ জন। দীর্ঘদিন নিয়োগ বন্ধ থাকার পর ২০১০ সাল থেকে গত বছরের জুন পর্যন্ত বিভিন্ন পদে রেলে ১০ হাজার ৯৩৪ জন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

রেলের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তা–কর্মচারীদের বেশির ভাগই অবকাঠামো নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। কিন্তু স্টেশনমাস্টারের নিয়োগের বিষয়টি খুব একটা গুরুত্ব পায়নি। স্টেশনমাস্টার ও পয়েন্টসম্যানের (যিনি লাইন ঠিক আছে কি না, তা নিশ্চিত করেন) অভাবে স্টেশন বন্ধ আছে। সারা দেশে মোট রেলস্টেশনের সংখ্যা ৪৬৪। বর্তমানে সারা দেশে ১০৯টি রেলস্টেশন বন্ধ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে সাম্প্রতিক সময়ে ইন্দোনেশিয়া ও কোরিয়া থেকে বেশ কিছু যাত্রীবাহী কোচ আমদানি করা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া থেকে ২০০ মিটারগেজ ও ৫০টি ব্রডগেজ কোচ আমদানির প্রকল্প চলমান। এসব কোচকে দ্রুতগতির কোচ বলা হচ্ছে। ইতিমধ্যে ৩৩টি ব্রডগেজ কোচ বাংলাদেশে এসেছে। এগুলোর গতি ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার হবে বলে রেলের কর্মকর্তারা দাবি করছেন। আগামী পয়লা বৈশাখে এসব কোচ দিয়ে ঢাকা–রাজশাহী পথে একটি নতুন ট্রেন চালু হবে। মিটারগেজ ও বাকি ব্রডগেজ কোচ পর্যায়ক্রমে দেশে আসবে। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হক প্রথম আলোকে বলেন, সব দেশেই রেলের মূল লক্ষ্য—রেলে গতি বাড়িয়ে নিরাপদে যাত্রী পরিবহন। এর জন্য লাইন, ইঞ্জিন, কোচ, সংকেতব্যবস্থা ঠিক থাকতে হবে। এরপর এই ব্যবস্থা চালাতে দরকার দক্ষ জনবল। সবকিছু ঠিক থাকার পরও রেললাইন অরক্ষিত থাকলে গতি বাড়ানো সম্ভব না–ও হতে পারে। অর্থাৎ রেললাইনে অযাচিত পারাপার বন্ধ করতে হবে। এই পুরো প্রক্রিয়াটা একটার সঙ্গে অন্যটা জড়িত। ফলে আগে দ্রুতগতির কোচ বা ইঞ্জিন কিনলে এবং নতুন লাইন নির্মাণ করলেই গতি ও সেবা বাড়বে না। এর মধ্যে সমন্বয়ের দরকার আছে। রেলের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এই সমন্বয় আছে বলে মনে হচ্ছে না।

সুত্র:প্রথম আলো,০৪ এপ্রিল ২০১৯,


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।