তিনগুণ ব্যয়ে ডাবল লাইন নির্মাণেও নিম্নমানের কাজ!

তিনগুণ ব্যয়ে ডাবল লাইন নির্মাণেও নিম্নমানের কাজ!

ইসমাইলআলীটঙ্গী-ভৈরববাজার রেলপথ ডাবল লাইন নির্মাণে ব্যয় হয় দুই হাজার ১৭৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা, যদিও এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭২৪ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। তিনগুণের বেশি ব্যয়ে এ ডাবল লাইন নির্মাণে সময়ও লাগে ১২ বছর। ২০০৬ সালে নেওয়া প্রকল্পটি শেষ হয় ২০১৮ সালের জুনে। অথচ রেলপথটি পাঁচ বছরের মধ্যে নির্মাণ শেষ করার কথা ছিল।

এরপরও প্রকল্পের গুণগত মান নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন। রেলপথটি নির্মাণে নিন্মমানের কাজের প্রমাণও মিলেছে। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীন বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সূত্রমতে, টঙ্গী-ভৈরববাজার রেলপথ ডাবল লাইন প্রকল্পটি তিন দফা সংশোধন করা হয়। এ সময়ে প্রকল্পটির ডিজাইন সংশোধনসহ বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়। এতে বাস্তবায়ন বিলম্ব ছাড়াও ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটির প্রভাব মূল্যায়নের উদ্যোগ নেয় আইএমইডি। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এতে বলা হয়েছে, টঙ্গী-ভৈরববাজার ডাবল লাইন প্রকল্পের আওতায় নির্মিত চারটি মেজর ব্রিজের সবগুলোর রং নাজুক অবস্থায় আছে। এগুলোর অনেক জায়গায় মরিচা ধরে গেছে। তাই ব্রিজগুলোর দ্রুত রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। এছাড়া চারটি (৭৬, ৭৭, ৮০ ও ৮২নং) মাইনর ব্রিজ নির্মাণের সময় নদী আংশিক মাটি ভরাট হয়ে গেছে। এতে পানিপ্রবাহ বিঘ্ন হচ্ছে। এটি প্রকৃতি ও পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি করছে।

এদিকে রেলপথটি নির্মাণকালে ফেলা পাথরের অবস্থা বিভিন্ন স্থানে পরীক্ষা করে পরিদর্শন দল। এর মধ্যে ১০টি স্থানে ব্যালাস্টের (পাথরের টুকরা) পরিমাণ ও গুণগত মানে ত্রুটি ধরা পড়ে। এছাড়া পাথর ফেলার জন্য স্লিপারের নিচে তৈরিকৃত কাঠামো ব্যালাস্ট কুশনও নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ডের চেয়ে কম পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়েছে, ১০টি স্থানে ব্যালাস্ট কুশনের পুরুত্ব মেইন লাইনে স্লিপারের নিচে ১৫০ মিলিমিটার থেকে ২০০ মিলিমিটার পাওয়া গেছে। যদিও দরপত্রের স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে এ পুরুত্ব কমপক্ষে ২২০ মিলিমিটার হওয়া প্রয়োজন। ওই একই স্থানে সেøাডারে (রেলপথের পাশে ঢালু অংশ) ব্যালাস্ট কুশন ৩০০ থেকে ৩৯০ মিলিমিটার পাওয়া গেছে। এক্ষেত্রে দরপত্রের স্ট্যান্ডার্ড ছিল কমপক্ষে ৪২০ মিলিমিটার। এছাড়া তিনটি স্থানে লুপ লাইনের ব্যালাস্ট কুশনের পুরুত্ব ১৬০ মিলিমিটার থেকে ২০০ মিলিমিটার পাওয়া গেছে। যদিও দরপত্রের স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে তা ২০০ মিলিমিটার হওয়ার কথা।

এদিকে পরিদর্শনকালে রেলপথটিতে বিভিন্ন স্থানে ডিজাইন ও স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী ব্যালাস্ট কম পাওয়া গেছে। এর মধ্যে মেইন লাইন ৪৯ দশমিক ৫০ মিলিমিটার বা ২০ দশমিক ৫০ শতাংশ ও সোল্ডার কুশনে ৫৯ দশমিক ১৯ মিলিমিটার বা ১৪ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ কম ব্যালাস্ট পাওয়া গেছে।

এর বাইরে রেলপথে সেতু বা কালভার্ট নির্মাণের জন্য স্থাপিত বাঁধ তথা এমব্যাঙ্কমেন্ট পরিদর্শনকালে ১১টি স্থানে ক্রেস্টের (ঢালু অংশের শেষ প্রান্ত) প্রশস্ততা কম পাওয়া গেছে। প্রতিটি স্থানে এমব্যাঙ্কমেন্টের ক্রেস্টের প্রশস্ততা ছিল পাঁচ থেকে পাঁচ দশমিক ৯ মিটার, যা ডিজাইনের চেয়ে কম। এছাড়া কিছু স্থানে এমব্যাঙ্কমেন্টের সেøাল্ডার দুই দিকে ভেঙে গেছে দেখা যায়।

উল্লিখিত ত্রুটির বাইরে প্রকল্পটির বেশকিছু দুর্বল দিক চিহ্নিত করেছে আইএমইডি। এর মধ্যে অন্যতম নতুন রেলপথ নির্মাণ করা হলেও এ রুটে জনবলের অভাবে দুটি স্টেশন (হাটুভাঙ্গা ও শ্রীনিধী) বন্ধ হয়ে গেছে। এছাড়া ব্যালাস্ট ওয়াল (রেলপথের পাশে সুরক্ষা দেয়াল) না থাকায় জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ব্যালাস্ট অপচয় হচ্ছে, বিভিন্ন স্টেশনে নারীদের জন্য পৃথক টয়লেট ও বিশ্রামাগার নির্মাণ করা হয়নি, অনুমোদনহীন লেভেলক্রসিং রয়েছে রুটটিতে, সিগন্যালিং রুটের এসি নষ্ট হয়ে গেছে। এছাড়া প্রকল্পটির আওতায় ১০টি লেভেলক্রসিং গেট পুনর্বাসন করা হয়েছে। এগুলোয় ৪১টি প্রহরী থাকার কথা। তবে ১১ প্রহরী আছে। বাকি ৩০টিতে কোনো প্রহরী নেই।

উল্লেখ্য, প্রকল্পটির আওতায় টঙ্গী-ভৈরববাজার রুটে ৬৪ কিলোমিটার মেইন লাইন ও ২২ কিলোমিটার লুপ লাইন ডাবল লাইন করা হয়েছে। পাশাপাশি চারটি মেজর ও ৩১টি মাইনর ব্রিজ এবং ৩১টি কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। আর ১১টি স্টেশন বিল্ডিং ও ইয়ার্ডের আধুনিকায়ন ছাড়াও জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছে ৩৯ দশমিক ৩১ একর। এছাড়া মাটির কাজ করা হয়েছে ২৫ লাখ ৪৬ হাজার ১৫৮ ঘনমিটার এবং রেলপথ নির্মাণের জন্য ২৪ কিলোমিটার রুটের নরম মাটির শক্তি বৃদ্ধি করা হয়েছে।

সূত্র:শেয়ার বিজ, জুলাই ৩, ২০২০


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।