জমি দিয়ে বিপাকে রেলওয়ে আদায় হয় না ইজারা মূল্য

জমি দিয়ে বিপাকে রেলওয়ে আদায় হয় না ইজারা মূল্য

ইসমাইল আলী: রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে ১২টি মার্কেট নির্মাণের জন্য ১৯৮৫ সালের রেলওয়ের অব্যবহৃত ১২ দশমিক ৫৫ একর জমি ইজারা নেয় তৎকালীন ঢাকা সিটি করপোরেশন। ইজারা নেয়া জমিতে মার্কেট নির্মাণ করে নিয়মিত ভাড়া আদায় করলেও ইজারা মূল্য বাবদ বছরে প্রায় ৫০ লাখ টাকা রেলওয়েকে পরিশোধ করেনি সংস্থাটি। রেলওয়ের পক্ষ থেকে ইজারার অর্থ চেয়ে বারবার চিঠি দিলেও কোনো লাভ হয়নি।

২০১০ সাল পর্যন্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের কাছে ইজারা মূল্য বাবদ রেলওয়ের পাওনা দাঁড়ায় প্রায় ১১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা। তবে এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সে অর্থ পরিশোধ করছে না সিটি করপোরেশন। আবার চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের হেড কোয়ার্টার্স নির্মাণে জমি দিয়েছিল রেলওয়ে। সে বাবদ ৭৬ লাখ টাকা এখনও পাওনা রয়েছে।

এদিকে নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদীতীরে ফেরিঘাট স্থাপনে ইজারা নেয়া হয় রেলের জমি। এজন্য সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের পাওনা রয়েছে সাত লাখ টাকা। একইভাবে ভৈরব নদীতে সেতু নির্মাণকাজে রেলের জমি নেয়া হয়। এজন্য প্রায় ১৪ লাখ টাকা পাওনা থাকলেও তা পরিশোধ করেনি সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ। যদিও বাধ্য হয়েই এক দশক আগের সেই পাওনা মওকুফ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে।

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক চাপে এভাবেই বিভিন্ন সময়ে সরকারি, বেসরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন নানা সময় রেলের অব্যবহৃত জমি ইজারা নেয়। প্রতি বছর ইজারা মূল্য অগ্রিম পরিশোধের শর্তে জমি দেয়া হলেও বেশিরভাগ সরকারি প্রতিষ্ঠানই তা পালন করেনি। কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানও ইজারা মূল্য আটকে আছে বছরের পর বছর। এভাবে ২০১০ সাল পর্যন্তই রেলওয়ের আটকে থাকা পাওনা প্রায় ৪১ কোটি টাকা।

সূত্রমতে, দীর্ঘদিন ইজারার অর্থ পরিশোধ না করায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা করেছে রেলওয়ে। এছাড়া পাওনা দ্রুত আদায়ের ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। সম্প্রতি রেলভবনে এ বিষয়ে পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে জমি ইজারা বা বিক্রির অর্থ আদায়ে রেলওয়েকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে নানা সুপারিশ করা হয়।

বৈঠকের তথ্যমতে, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএনডিসি) ১৯৮১ সালে ১৪ দশমিক ৫৫ একর জমি ইজারা নেয়। তবে এরপর আর কোনো ইজারা মূল্য পরিশোধ করেনি সংস্থাটি। এতে বিএডিসির কাছে জমি ইজারা বাবদ রেলওয়ের পাওনা দাঁড়ায় এক কোটি ৭৭ লাখ টাকা। ২০১৬ সালে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় তিন মাসের মধ্যে এ অর্থ ফেরত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় বিএনডিসি। এরপর প্রায় পাঁচ বছর পেরুলেও এখন পর্যন্ত ইজারা মূল্য পরিশোধ করেনি সংস্থাটি।

এদিকে চট্টগ্রামে আন্তঃজেলা বাস টার্মিনাল নির্মাণে ১৯৮৬ সালে রেলের জমি ইজারা নিয়েছিল মালিক সমিতি। তবে ইজারা নেয়ার পর থেকে কোনো অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। এতে অনাদায়ী পাওনা দাঁড়ায় এক কোটি ৯ লাখ টাকা। এ নিয়ে মামলা করলে আদালত প্রতি মাসে ৫০ হাজার টাকা করে পরিশোধের নির্দেশনা দেন। তবে আপত্তিকালীন ১৯৮৬ সালের জুলাই থেকে ২০১২ সালে জুন পর্যন্ত প্রমাণ দাখিল করা হয়নি। ফলে ওই সময়ের জন্য ৪৯ লাখ টাকা আদায়ে জটিলতা রয়ে গেছে।

একইভাবে চট্টগ্রামের ধুমশুভপুর বাস মালিক সমিতির কাছে ১৯৭৮ সালে ১ দশমিক ১৩ একর জমি ইজারা দিলেও তারা অর্থ পরিশোধ করেনি। এতে তিন কোটি ১৩ লাখ টাকা বকেয়া পড়েছে। পরে মামলা করলে মালিক সমিতির সভাপতি পাঁচ লাখ টাকা পরিশোধ করে। বাকি অর্থ আর পরিশোধ করেনি। এতে সমিতির কর্তা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু করে ধরে এনে পাওনা আদায়ের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়।

বৈঠকে আরও জানানো হয়, রেলওয়ের কর্মকর্তাদের জন্য গড়ে সহযোগী দুটি সংগঠনও জমি ইজারা নিয়ে অর্থ পরিশোধ করছে না। এগুলো হলো, বাংলাদেশ রেলওয়ে সমবায় ঋণদান সমিতি ও দি রেলওয়ে মেন্স স্টোরস লিমিটেড। এদের কাছে পাওনা রয়েছে যথাক্রমে প্রায় ২১ লাখ টাকা ও এক কোটি ৯ লাখ টাকা। আর বন বিভাগের কাছে ২০১০ সাল পর্যন্ত রেলওয়ের পাওনা ছিল সাত কোটি ৩৮ লাখ টাকা। এর মধ্যে তিন কোটি ৭৩ লাখ টাকা জমা দিয়েছে বন বিভাগ। বাকি অর্থ আর পরিশোধ করছে না বিভাগটি।

এদিকে নারায়ণগঞ্জে ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি হাঁসের প্রজনন খামার গড়ে তুলতে বাণিজ্যিক হারে জমি ইজারা দেয়া হয়েছিল। তবে সে অর্থ পরিশোধ না করায় প্রতিষ্ঠানটির কাছে বকেয়া দাঁড়ায় দুই কোটি ৪৮ লাখ টাকা। আবার তিতাস গ্যাসের রেলওয়ের বকেয়া পাওনা ছিল ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১০ লাখ টাকা এখনও পরিশোধ করেনি সংস্থাটি। আর চাঁদপুরে বিআইডব্লিউটিএ’র কাছে দশমিক ৯০ একর জমি বিক্রি করা হয়। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাটি আট লাখ টাকা পরিশোধ করেনি।

জমির ইজারা মূল্য আদায় না হওয়া প্রসঙ্গে রেলওয়ের মহাপরিচালক ডিএন মজুমদার শেয়ার বিজকে বলেন, বিভিন্ন সময় প্রশাসন, মন্ত্রণালয় বা রাজনৈতিক চাপে রেলওয়ে অব্যবহƒত অনেক জমি ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছিল। কিন্তু ইজারা গ্রহীতা বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা এ অর্থ পরিশোধে গড়িমসি করে যাচ্ছে। তাই পাওনা আদায়ে জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছে সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। এর পরিপ্রেক্ষিতে মন্ত্রণালয় থেকে কিছু নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সূত্র:শেয়ার বিজ, ২৭ নভেম্বর ২০২১


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।