চুক্তি ছাড়াই রেলের টিকিট বিক্রি করছে সিএনএস

ইসমাইলআলী২০০৭ সাল থেকে রেলের টিকিট বিক্রির দায়িত্ব পালন করছে সিএনএস লিমিটেড। ২০১৪ সালের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে দ্বিতীয় দফা চুক্তি করে রেলওয়ে। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সে চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরে কোম্পানিটির সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর উদ্যোগ নেয় রেলওয়ে। কিন্তু তা মাত্র ছয় মাস বৃদ্ধি অনুমোদন করে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি, যা ২০২০ সালের মার্চে শেষ হয়ে গেছে। এতে চুক্তি ছাড়াই এখন রেলের টিকিট বিক্রি করছে সিএনএস।

এদিকে দরপত্র প্রক্রিয়া শেষ হলেও আইনি জটিলতায় নতুন অপারেটর নিয়োগ দিতে পারেনি রেলওয়ে। আবার সিএনএসকে বাদ দিলে হাতে লিখে টিকিট বিক্রি করতে হবে সংস্থাটিকে। ফলে রেলের সেবায় বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এ অবস্থায় মৌখিক নির্দেশের ভিত্তিতে সিএনএসকে টিকিট বিক্রি চালিয়ে নেয়ার জন্য অনুমোদন দিয়েছে রেলওয়ে। তবে বৈধ কোনো চুক্তি না থাকায় সিএনএসকে এ-সংক্রান্ত কোনো বিল দিতে পারছে না রেলওয়ে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৭ সালে রেলের টিকিট বিক্রিতে প্রথম দফা সিএনএসের সঙ্গে ৯ কোটি ৯১ লাখ টাকায় চুক্তি হয়। ৬০ মাস মেয়াদি এ চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় ২০১২ সালে। তবে ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি, স্টপেজ বৃদ্ধি, কোচ ও আসন বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে ৬০ মাস শেষে চুক্তি মূল্য দাঁড়ায় ১৩ কোটি আট লাখ টাকা। তবে সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনক্রমে চুক্তির মেয়াদ দুই বছর বাড়ানো হয়।

পরবর্তীতে দরপত্র আহ্বান করা হলে আবারও কাজ পায় সিএনএস। ২০১৪ সালের অক্টোবরে ৬০ মাসের জন্য এ-সংক্রান্ত চুক্তি করা হয়। সে সময় চুক্তিমূল্য ছিল ৩১ কোটি ৩২ লাখ টাকা। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে সে চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল। যদিও ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি, স্টপেজ বৃদ্ধি, কোচ ও আসন বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে ৬০ মাস শেষে চুক্তি মূল্য দাঁড়ায় ৪১ কোটি ৯০ লাখ টাকা।

নতুন অপারেটর নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন না হওয়ায় সে সময়ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে ২০ শতাংশ বা ১২ মাস চুক্তির মেয়াদ বাড়ানোর প্রস্তাব পাঠায় রেলওয়ে। কিন্তু এ প্রস্তাব নিয়েই তৈরি হয় জটিলতা। ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি মতামত দেয়, চুক্তির ক্ষেত্রে মেয়াদের পরিবর্তে মূল্য বিবেচনা করতে হবে। এতে চুক্তিমূল্য ৩১ কোটি ৩২ লাখ টাকা ৪২ মাস তথা ২০১৭ সালের ডিসেম্বরেই শেষ হয়ে গেছে। ফলে চুক্তিমূল্য সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ তথা ১৫ কোটি ৬৬ লাখ টাকার আনুপাতিক চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। ফলে বর্ধিত চুক্তির মূল্য দাঁড়ায় ৪৬ কোটি ৯৮ লাখ টাকা।

এ হিসাবে অবশিষ্ট চুক্তিমূল্য ছিল পাঁচ কোটি আট লাখ টাকা। ফলে বর্ধিত এ চুক্তিমূল্য দিয়ে আর মাত্র ছয় মাস চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো যায়, যা গত বছর মার্চে শেষ হয়ে যায়। এরপর থেকেই চুক্তি ছাড়া রেলের টিকিট বিক্রি করে যাচ্ছে সিএনএস। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের মৌখিক নির্দেশে এ কাজ করে যাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

যদিও সিএনএস টিকিট বিক্রির কাজ চালিয়ে যেতে আগ্রহ দেখায়নি। তবে সিএনএসের সেবা বন্ধ হয়ে গেলে রেলওয়ের টিকিট বিক্রিতে বিশৃঙ্খলা দেখা  দেবে। তখন কম্পিউটারাইজড পদ্ধতির পরিবর্তে ম্যানুয়ালি হাতে লিখে টিকিট বিক্রি করতে হবে রেলওয়েকে। ফলে বাধ্য হয়েই সিএনএসকে ছাড়তে পারেনি রেলওয়ে।

এদিকে ২০১৯ সালে রেলের টিকিট বিক্রির জন্য নতুন অপারেটর নিয়োগের কার্যক্রম শুরু করা হয়। করোনার কারণে তা কিছুটা পিছিয়ে গেলেও গত বছর শেষ দিকে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। এক্ষেত্রে কাজ পায় ‘সহজ’। কিন্তু দরপত্র মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যথাযথ হয়নিÑঅভিযোগ এনে এর বিরুদ্ধে সিপিটিইউতে (সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট) আবেদন করে সিএনএস। এছাড়া হাইকোর্টে রিট করলে পুরো প্রক্রিয়ার ওপর স্থগিতাদেশ দেন হাইকোর্ট। ফলে নতুন অপারেটরও নিয়োগ দিতে পারছে না রেলওয়ে। এ অবস্থায় অবৈধভাবে চুক্তি ছাড়াই শুধু মৌখিক নির্দেশে সিএনএস সেবা দিয়ে যাচ্ছে।

এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান জানান, তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না। পরবর্তী সময়ে রেলপথ সচিব মো. সেলিম রেজার সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ফোন বন্ধ করে দেন। আর রেলপথমন্ত্রী মো. নুরুল ইসলাম সুজনের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগ করলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে খুদেবার্তা পাঠালেও তিনি উত্তর দেননি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগেরবারের মতো এবারও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি চুক্তির মেয়াদের ৫০ শতাংশ অনুপাতে মূল্য বৃদ্ধির প্রস্তাব অনুমোদন করলে এ সমস্যা হতো না। কারণ তখন চুক্তিমূল্য প্রায় ২২ কোটি টাকা বাড়ত। এতে কমপক্ষে দুই বছর সিএনএস থেকে সেবা নেয়া যেত। তবে মেয়াদের পরিবর্তে চুক্তিমূল্য ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করায় আনুপাতিক হারে তা আগেই শেষ হয়ে যায়। কিন্তু তাদের সেবা নেয়া বন্ধ করলে রেলওয়েতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দেবে। তাই বাধ্য হয়েই সিএনএসের সেবা নেয়া হচ্ছে।

সূত্র:শেয়ার বিজ, জানুয়ারী ১৪, ২০২১

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।