শিরোনাম

খুঁড়িয়ে চলছে রেল

খুঁড়িয়ে চলছে রেল

ফসিহ উদ্দীন মাহতাব:
প্রবল জনবল সংকটে খুঁড়িয়ে চলছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। দেড় যুগের বেশি সময় ধরে নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মন্ত্রণালয় থেকে আঞ্চলিক পর্যায়ে সর্বস্তরে লোকবল সংকট রয়েছে। রেলওয়ের অর্গানোগ্রাম (সাংগঠনিক কাঠামো) অনুযায়ী, সংস্থাটির অনুমোদিত পদসংখ্যা ৪৭ হাজার। সর্বশেষ হিসাবে কর্মরত জনবল রয়েছে ২৬ হাজার ৪৩ জন। শূন্য পদ প্রায় ১৫ হাজার। এর মধ্যে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির ১০ হাজারের বেশি। বাকি শূন্য পদগুলো প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির।

ব্রিটিশ আমলে পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চল নিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের কার্যক্রম শুরু হয়। পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের প্রধান দপ্তর রাজশাহীতে আর পূর্বাঞ্চলের চট্টগ্রামে। অনেক দিন থেকে গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু পদে লোকবল না থাকায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে স্বাভাবিক রেল চলাচল। এতে করে যেমন কমে যাচ্ছে রেলের আয়, তেমনি সময়মতো রেল গন্তব্যে না পৌঁছানোয় যাত্রীরাও পড়ছেন ভোগান্তিতে।

এদিকে, রেলের জ্যেষ্ঠ কর্মীদের অনেকে এরই মধ্যে অবসরে গেছেন। আগামী দু-এক বছরে অধিকাংশই কর্মকর্তা অবসর নেবেন। তখন কর্তৃপক্ষের জন্য রেল পরিচালনা কঠিন ও চ্যালেঞ্জ হবে। এ নিয়ে যদিও রেল কর্তৃপক্ষ সচেষ্ট রয়েছে। তারপরও ১৫ হাজার পদ শূন্য রয়েছে। লোকবল সংকট থাকায় অনেকটাই খুঁড়িয়ে চলছে রেলওয়ে।

রেলওয়ের কর্মচারীদের অবসর ও নিয়োগের তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটির এক হাজার ৪৩ কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসর নেন। এর বিপরীতে নিয়োগ পান ৫৭৮ জন। এর মধ্যে কর্মচারীর সংখ্যা ৫৪৪। সর্বশেষ গত দুই অর্থবছরে রেলওয়ের জনবল কমেছে দুই হাজার ২৮০ জন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে শূন্য পদ ছিল ১১ হাজার ৯৪১টি। পরের অর্থবছরে তা ১৩ হাজার ১৭৮ জনে দাঁড়ায়। আর সর্বশেষ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে প্রতিষ্ঠানটিতে পদ শূন্য হয়েছে আরও এক হাজার ৪৩টি। এ ছাড়া রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে খালি রয়েছে স্টেশন মাস্টার (এসএম), সহকারী স্টেশন মাস্টার (এএসএম), পয়েন্টম্যান, গেটম্যান ও সান্টিংম্যানের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদ।

তথ্যমতে, যেখানে প্রথম থেকে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত জনবল থাকার কথা দুই হাজার ৫৩৭ জন, সেখানে বর্তমানে কর্মরত আছেন এক হাজার ৩১২ জন। পদ খালি রয়েছে ২২৫ জনের। অন্যদিকে প্রধান ট্রেন নিয়ন্ত্রক, সুপারিনটেনডেন্ট ও টিআই ১৭টি পদ খালি আছে। তা ছাড়া এসএম, এএসএমের পদে খালি রয়েছে ৫৫৬টি। এসএম ২১৫টি এবং এএসএম ৯২টির পদ খালি আছে। পয়েন্টম্যান, গেটম্যান, সান্টিংম্যানসহ ৯টি পদে খালি আছে ৬৬৪টি পদ। যেখানে থাকার কথা এক হাজার ২২৫ জন। এর মধ্যে পয়েন্টম্যান পদে ৭৫০ জনের বিপরীতে খালি আছে ২৯৩, গেটম্যান পদে ২৪২ জনের বিপরীতে ২১৫ ও সান্টিংম্যান পদে ১১৬ জনের বিপরীতে ৯৯টি পদ। পূর্বাঞ্চলের মতো রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের চিত্রও প্রায় এক। সার্বিক বিষয় সম্পর্কে রেলপথমন্ত্রী নূরুল ইসলাম সুজন বলেন, রেলওয়ের অপচয় ও অব্যবস্থাপনা রোধ করে রেলওয়েকে জনবান্ধব সেবা প্রদানের জন্য সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। তবে মামলাজনিত কারণে রেলের লোকবল নিয়োগ করা সম্ভব হচ্ছে না। শিগগিরই এর সমাধান করে বিভিন্ন পদে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। তিনি বলেন, আগামীতে নিয়োগ প্রক্রিয়া যথাযথ ও স্বচ্ছ রাখার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয়ভাবে নিয়োগ কমিটি গঠন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব মোফাজ্জেল হোসেন বলেন, রেলের জনবল সংকট নিরসনের জন্য আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে ২০০৮-০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার লোকবল নিয়োগ করা হয়েছে। এখনও চার হাজার নিয়োগের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। আশা করছি, আগামী দু-এক মাসের মধ্যে আরও দুই হাজার লোকবল নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে।

সচিব বলেন, সিনিয়র পর্যায়ের যেসব কর্মকর্তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, অভিজ্ঞতার দিক থেকে এখনও তারা জুনিয়র। সে ক্ষেত্রে একটা সংকট থেকে যায়। পিএসসি দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করলে অফিসার সংকট থাকবে না। তবে রেলের ডেলিভারি পর্যায়ে লোকবলে সংকট মারাত্মক পর্যায়ে রয়েছে। রেলের যে অর্গানোগ্রাম আছে, সেখানে ৪৭ হাজার জনবল নিয়োগ হওয়ার কথা রয়েছে। কিন্তু এখনও প্রায় ১৫ হাজার শূন্য পদ রয়েছে। তবে নিয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।

সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভায় রেলওয়ের জনবল সংকট সমাধান নিয়ে আলোচনা ও সুপারিশ করা হয়। সভায় বলা হয়, লোকবলের অভাবে কোনো বগি ত্রুটি থাকলে বগি সংযুক্ত করা কিংবা নতুন বগি সংযুক্ত করা সম্ভব হয় না। এসব পদে লোকবল না থাকায় ট্রেন পরিচালনায় ব্যাহত হচ্ছে। জনবল সংকটের বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সভায় ব্যাখ্যাও তুলে ধরেন রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. মিয়া জাহান। তিনি বলেন, ক্যাডার কর্মকর্তা ছাড়া ১৯৮৬ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ২০ বছর রেলে লোকবল নিয়োগ বন্ধ ছিল। জনবল সংকট থাকায় কিছু সংখ্যক রেল বেসরকারি খাতে চার বছরের জন্য লিজ দেওয়া হয়। আগামী দু-তিন বছরের মধ্যে অধিকাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী অবসরে চলে যাবেন। এতে বিরাট শূন্যতা সৃষ্টি হবে।

তার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে রেল মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সদস্য আসাদুজ্জামান নূর বলেন, ২০১৫ সালে জনবল নিয়োগ পরীক্ষা এখনও শেষ হয়নি। তাই রেলকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চালানোর জন্য সব প্রতিবন্ধকতা, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা দূর করে নিয়োগ প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

জনবল সংকট ছাড়াও ক্রয়ে নানা ত্রুটি থাকায় কঠোর সমালোচনা করেন কমিটির আরেক সদস্য মো. সাইফুজ্জামান। তিনি বলেন, বর্তমানে ট্রেনের টয়লেটের দরজাগুলো ভেতরের দিকে থাকায় যাত্রীদের চরম অসুবিধায় পড়তে হয়। ডেমু ট্রেনগুলো চলাচলের উপযোগী নয়। সে ক্ষেত্রে আগামীতে বগি আমদানির ক্ষেত্রে এ দেশের আবহাওয়া, প্রয়োজনীয়তা ও যাত্রীদের সুযোগ-সুবিধা বিবেচনা করতে হবে।

রেলওয়ের মহাপরিচলক কাজী মো. রফিকুল আলম বলেন, লোকবল সংকট থাকার পরও রেলওয়ে লাভজনক রয়েছে। লিজকৃত ৭৬টি ট্রেন থেকে বছরে আট কোটি ৭০ লাখ টাকা আয় হয়। আর নিজ ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত সোনার বাংলা এক্সপ্রেস ট্রেনের আয় ২১ কোটি ৪২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৪ টাকা এবং ব্যয় ছয় কোটি ৭৩ লাখ ৯১ হাজার ১২২ টাকা। মেইল ট্রেন থেকে আয় ৭৫ কোটি ৯২ লাখ ৭৪ হাজার ৬২৮ টাকা। ব্যয় বাদ দিলে এ খাতে লাভ হচ্ছে ২৮ কোটি ৯৩ লাখ ৫৮ হাজার ১৬৪ টাকা। একইভাবে কার্গো ট্রেন থেকে আয় ৮০ কোটি। ব্যয় বাদে লাভ ৬৬ কোটি ৪২ লাখ ৩৫ হাজার ১১৪ টাকা।

সুত্র:সমকাল,২১ মে ২০১৯


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।