শিরোনাম

এবার রেলের জমিতে কর্মকর্তাদের থাবা

এবার রেলের জমিতে কর্মকর্তাদের থাবা

শিপন হাবীব :

এবার রেলওয়ের কর্মকর্তারাই রেলওয়ের জমি দখলের চেষ্টা করছেন। ‘রেলওয়ে অফিসার্স কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেড’ নামে এ থাবা ফেলা হচ্ছে।

রাজধানীর মগবাজার ও খিলগাঁও এলাকায় রেলওয়ের তিন একরের বেশি জমি প্রতীকী মূল্যে হাউজিং সোসাইটির অনুকূলে বন্দোবস্ত নেয়ার জন্য রেলপথমন্ত্রীর বরাবর আবেদন করা হয়েছে। নিয়ম অনুযায়ী রেলওয়ের কোনো কর্মকর্তা বা তাদের সংগঠন রেলের জমি বন্দোবস্ত পেতে পারে না।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রেলপথমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন বুধবার যুগান্তরকে জানান, রেলওয়ের জমি কারও নামে কিংবা সংগঠনের নামে বন্দোবস্ত দেয়ার কোনো নিয়ম নেই। এমন কোনো আবেদন যদি আসে, আমরা ভালোভাবে বিশ্লেষণ করে দেখব। অনিয়মের মাধ্যমে কাউকে রেলের কোনো জমি দেয়া হবে না।

রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্তে জানা গেছে, ঢাকা মহানগরীর বড় মগবাজার মৌজার জেএল নং-২৮০, সিএস দাগ নং ৪১৭ এর অংশে ৩২ শতাংশ, ৪২০-এর অংশে ৬৯ শতাংশ, ৪২১-এর অংশে ২০ শতাংশ, ৪২২-এর পাশে ৭৯ শতাংশ, ৪২৬-এর অংশে ১০ শতাংশ এবং খিলগাঁও মৌজার জেএল নং ২৮৭-সিএস দাগ নং ৬৩৭-এর অংশে ৯৩ শতাংশসহ মোট ৩ একর ৩ শতাংশ রেলওয়ের জমি রয়েছে।

এ জমি প্রতীকী মূল্যে বন্দোবস্ত পেতে সংগঠনের কর্মকর্তারা উঠেপড়ে লেগেছেন। দীর্ঘদিন ধরে তারা এ জমি দখলের চেষ্টা করে আসছেন।

২০০৬ সালে ঢাকার জোয়ার-সাহারা মৌজায় বিমানবন্দর রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় ১২ একর ১৮ শতাংশ জমি বন্দোবস্তের জন্য সংগঠনটি আবেদন করে। তবে তা সফল হয়নি।

২০১০ সালের ১২ জানুয়ারি তেজগাঁও এলাকায় দুটি স্থানে ৭ একর ৫৮ শতাংশ জমি প্রতীকী মূল্যে পেতে তৎকালীন রেলপথমন্ত্রীর বরাবর সংগঠনটি আবেদন করে। তখনও তারা সফল হননি। তবে এবার যাতে ব্যর্থ না হতে হয় সেভাবে কৌশল অবলম্বন করে কাজ করছেন তারা।

এ বছরের ৩ সেপ্টেম্বর রেলের এক সভায় মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব, চট্টগ্রাম) এ সোসাইটির অনুকূলে জমি বরাদ্দের আবেদনে সুপারিশ করা হয়। এর আলোকে প্রতীকী মূল্যে মগবাজার ও খিলগাঁওয়ের উল্লিখিত জমি বরাদ্দের বিষয়ে তিন এডিজিআই মো. জহুরুল ইসলাম (অর্থ), মো. মিয়াজাহান (অপারেশন) ও খোন্দকার শহিদুল ইসলাম (আই) বিশেষ বৈঠক করেন।

সেই বৈঠকে বিষয়টি চূড়ান্ত করা হয়। ৬ অক্টোবর রেলওয়ে মহাপরিচালক (ডিজি) মো. শামছুজ্জামান স্বাক্ষরিত আবেদনপত্র রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন বরাবর পাঠানো হয়। সচিবের দফতর থেকে পরের সপ্তাহেই নথিটি রেলপথমন্ত্রীর দফতরে যায়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উল্লিখিত জায়গা খুবই মূল্যবান। খিলগাঁও ও মগবাজার এলাকায় এ জমির আর্থিকমূল্য কাঠাপ্রতি দেড় কোটি টাকারও বেশি। এতে জমির মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ২৭৬ কোটি টাকা। সোসাইটির পক্ষ থেকে ১৮৪ কাঠা জমির প্রতীকী মূল্য ৩৫ কোটি টাকা প্রস্তাব করা হয়েছে। এ হিসাবে কাঠাপ্রতি দাম পড়ে মাত্র ১৯ লাখ টাকা।

মন্ত্রণালয় থেকে প্রাপ্ত নথিপত্রে দেখা যায়, ১৯৯৫ সালে ‘রেলওয়ে অফিসার্স কো-অপারেটিভ হাউজিং সোসাইটি লিমিটেড’ গঠিত হয়। ২০০৭ সালের ১৫ এপ্রিল নিবন্ধিত হয়। সাবেক ও বর্তমান গুটিকয়েক ঊর্ধ্বতন রেল কর্মকর্তা এ সোসাইটি পরিচালনা করে আসছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের সাবেক এক মহাপরিচালক (ডিজি) জানান, সোসাইটিটি শুধু নামেই। আবার সোসাইটির সব সদস্য জমি বরাদ্দ নেয়ার পক্ষে নয়। বরং রেলওয়ের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কল্যাণে রেলের অব্যবহৃত জমি বরাদ্দ কিংবা ওইসব জমিতে ভবন নির্মাণ করে তাদের থাকতে দেয়া হলে প্রকৃত কাজটি হবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমানে রেলের প্রায় ৬ হাজার একর জমি বেদখলে রয়েছে। এর মধ্যে সরকারি প্রতিষ্ঠান প্রায় ১২০০ একর জমি অবৈধভাবে দখলে রেখেছে। এমন অবস্থায় রেলওয়ে সোসাইটির অনুকূলে জমি বরাদ্দ দেয়া হলে সম্প্রতি চালানো উচ্ছেদ অভিযান প্রশ্নের মুখে পড়বে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলওয়ের অপর এক কর্মকর্তা জানান, রেলওয়ের বর্তমান এবং সাবেক ঊধ্বর্তন কর্মকর্তাদের নামে-বেনামে বহু সম্পদ রয়েছে। বেশির ভাগ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বাড়ি-গাড়িও আছে। ফলে তাদের সমন্বয়ে গঠিত সোসাইটির অনুকূলে রেলওয়ের জমি বরাদ্দ দেয়া হলে পরবর্তী সময় রেলওয়ের দ্বিতীয়-তৃতীয়, তৃতীয়-চর্তুথ শ্রেণির সমন্বয়ে গঠিত অন্যসব সংগঠন-সোসাইটির পক্ষেও রেলওয়ের জমি বরাদ্দের সুযোগ পাকাপোক্ত হয়ে যাবে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯২ সালের দিকে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিক্রয়লব্ধ অর্থ’ প্রায় ১০৯ কোটি টাকা একটি ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে। ওই টাকা দিয়ে রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বহুতল ভবন নির্মাণ, রানিং স্টাফরুম করার নির্দেশনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট ঊধ্বর্তন কর্মকর্তারা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না।

সর্বশেষ চলতি বছরের ৩০ মে তৎকালীন রেলওয়ে মহাপরিচালক কাজী মো. রফিকুল আলম স্বাক্ষরিত পত্রে বলা হয়- গচ্ছিত টাকা দিয়ে যেন রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য দুটি ও রানিং স্টাফদের জন্য একটি বহুতল ভবন নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। কিন্তু রেলওয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ওই উদ্যোগ বাস্তবায়নের দিকে না গিয়ে নিজেদের গড়া সোসাইটির অনুকূলে জমি বরাদ্দ নিয়ে বহুতল ভবন নির্মাণ করতে মরিয়া।

এ বিষয়ে রেলওয়ে মহাপরিচালক (ডিজি) মো. শামছুজ্জামান যুগান্তরকে জানান, বহু বছর ধরে রেলওয়ের জমি অনুকূলে বরাদ্দ পেতে সোসাইটি চেষ্টা চালিয়ে আসছে। রেলওয়ের জমি পেতে আগের এক রেলওয়ে মহাপরিচালক (অবসরপ্রাপ্ত), সাবেক ও বর্তমান একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা চেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন।

হাউজিংয়ের জন্য সোসাইটি রেলের অব্যবহৃত জমি পেতেই পারে। এ জন্য রেলের কাছে ৩.০৩ একর জমি প্রতীকীমূল্যে বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। রেলওয়ে নীতিমালার ২০০৬ এর অনুচ্ছেদ ৯ ধারা অনুযায়ী এ জমি বরাদ্দ দেয়ার ক্ষমতা রাখেন শুধু রেলপথমন্ত্রী।

জানতে চাইলে রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন যুগান্তরকে বলেন, রেলওয়ে কর্মকর্তা অথবা তাদের কোনো সংগঠনের অনুকূলে রেলের জমি বন্দোবস্তের ব্যাপারে কিছুই জানি না। রেলের জমি রেল কর্মকর্তাদের কিংবা তাদের সংগঠনের অনুকূলে দেয়ার কোনো নিয়ম নেই। বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজখবর নেয়া হবে। নিয়মের বাইরে কোনো কিছুই করা যাবে না।

সুত্র:যুগান্তর, ৩১ অক্টোবর ২০১৯


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।