ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ

ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ

ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, অনিরাপদ ও দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রায়শ ট্রেনের ছাদ হইতে পড়িয়া গিয়া যাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। কখনো কখনো ট্রেনের ছাদে ভ্রমণকারীরা ছিনতাইয়ের শিকার হয়। ছিনতাইকারীরা ছুরিকাঘাত করিয়া যাত্রীদের নিচে ফেলিয়া দেয়—এমন দৃষ্টান্তও আছে। অনেক সময় কোনো গাছ-গাছালির সঙ্গে বা ব্রিজের সঙ্গে ধাক্কা খাইয়াও অনেকে হতাহত হন। বিশেষ করিয়া ট্রেনের ছাদে চড়িয়া ভ্রমণের সময় রেল স্টেশনের নিচু ওভারব্রিজের সঙ্গে ধাক্কা লাগিয়া পড়িয়া গিয়া অনেকে নিহত হন। কারণ কোথাও কোথাও ওভারব্রিজের উচ্চতা রেললাইন হইতে ১৫ ফুট ৩ ইঞ্চি, আর ঐ লাইনে যাতায়াতকারী ট্রেনের উচ্চতা রেললাইন হইতে ১৩ ফুট ৬ ইঞ্চি। ফলে ট্রেনের ছাদ ও ওভারব্রিজের উচ্চতায় সামান্য ফাঁক থাকায় অসতর্কতার কারণে এইরূপ দুর্ঘটনা ঘটে। অনেক সময় রেললাইন উঁচুকরণের কাজ করা হইলেও রেল ওভারব্রিজগুলি সেই অনুযায়ী উঁচু করা হয় না। ইহার কারণেও এই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকিয়াই যায়।

ট্রেনের ছাদে বিপজ্জনক যাত্রা আসলে আমাদের এক নির্মম বাস্তবতা। এইসব যাত্রীর অধিকাংশই হতদরিদ্র বা প্রান্তিক শ্রমজীবী মানুষ। ঈদ-পার্বণের সময় যখন ট্রেন যাতায়াতে অত্যধিক চাপ থাকে, তখন এই প্রবণতা বেশি দেখা দেয়। কিন্তু নিরাপত্তার স্বার্থে ইহাকেও নিরুত্সাহিত করা প্রয়োজন। আশার খবর হইল, আজ ১ সেপ্টেম্বর হইতে ট্রেনের ছাদে উঠিয়া ভ্রমণ করা পুরাপুরি নিষিদ্ধ ঘোষিত হইয়াছে। রেলওয়ে মন্ত্রণালয় সম্প্রতি এক বিজ্ঞপ্তিতে জানাইয়াছে যে, কেহ এভাবে ভ্রমণ করিলে তাহাকে জরিমানাসহ এক বত্সর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেওয়া হইবে। রেলওয়ে মন্ত্রণালয়ের মতে, এইভাবে ছাদে ভ্রমণের কারণে দুর্ঘটনা ছাড়াও ট্রেন চলাচল বিলম্বিত হইয়া স্বাচ্ছন্দ্য বিঘ্নিত হয় এবং সরকারি মূল্যবান সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিজ্ঞপ্তিতে ছাদে ভ্রমণকারী এবং ভ্রমণে উত্সাহ ও সহযোগিতা প্রদানকারীকেও সমান অপরাধী হিসাবে উল্লেখ করা হইয়াছে। কিন্তু এই উত্সাহ প্রদানকারীদের ব্যাপারে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হইবে তাহা অবশ্য স্পষ্ট করা হয় নাই। আমরা দেখি, যাত্রীদের প্রচণ্ড চাপ থাকিলে অনেকে মই আনিয়া টাকার বিনিময়ে মানুষকে ছাদে উঠাইবার ব্যবস্থা করেন। এই ‘মই’ বাণিজ্য রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নাকের ডগায় চলে। শুধু তাহাই নহে, একশ্রেণির ট্রেনের চালক ও কর্মচারী মাথাপিছু দুই হইতে ১০ টাকা লইয়া গরিব মানুষদের ট্রেনের ছাদে ও ইঞ্জিনে যাতায়াত করিবার বন্দোবস্ত করিয়া দেয়। এই চালক ও কর্মচারীরাও সমান অপরাধী হইবার কথা। কিন্তু এইজন্য অতীতে তাহাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হইয়াছে বলিয়া আমাদের জানা নাই। অনেক সময় দেখা যায়, ট্রেনের ছাদে চড়িয়া অনেক শিশু-কিশোর দৌড়াদৌড়ির কসরত করে। এই অ্যাডভেঞ্চারও বন্ধ করা দরকার।

১৮৯০ সালের রেলওয়ে আইনের ১২৯ নম্বর ধারায় বলা হইয়াছে, ‘যদি কোনো ব্যক্তি বিপজ্জনক বা বেপরোয়া কার্যের দ্বারা অথবা অবহেলা করিয়া কোনো যাত্রীর জীবন বিপন্ন করে, তবে তাহার এক বত্সর কারাদণ্ড অথবা জরিমানা কিংবা উভয় প্রকার দণ্ডে দণ্ডিত হইতে পারে’। দেখা যাইতেছে, আইন ঠিকই আছে, কিন্তু এতকাল ধরিয়া তাহার প্রয়োগ ছিল না। সুতরাং রেলওয়ে মন্ত্রণালয় বিলম্বে হইলেও যেই উদ্যোগটি নিয়াছে তাহা মহত্ ও সুন্দর। ১৭ কোটির মধ্যে প্রায় চার লক্ষ মানুষ রেলপথে প্রতিদিন চলাচল করিয়া থাকেন। তাহাদের জীবনের নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ নিষিদ্ধই নহে, যাত্রীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে প্রতিটি স্টেশনের প্রবেশ ও বহির্গমন পথে বডি ও লাগেজ স্ক্যানার বসানো প্রয়োজন। বাড়ানো প্রয়োজন রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য সংখ্যাও।

সুত্র:ইত্তেফাক, ০১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।