সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয়ে অনিয়ম রোধে কর্তৃপক্ষের অনুরোধপত্র!

সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয়ে অনিয়ম রোধে কর্তৃপক্ষের অনুরোধপত্র!

সুজিত সাহা :

নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হলে ২৫ মার্চ থেকে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল গত দুই মাসেরও বেশি। যদিও ওই সময়ে পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ছিল। মাঠ পর্যায়ে কর্মরত কর্মীদের জন্য রেলের বিভিন্ন বিভাগ থেকে কেনা হয়েছে বিভিন্ন ধরনের সুরক্ষাসামগ্রী। রেলের কেনা এসব সুরক্ষাসামগ্রীর মান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে প্রথম থেকেই। নিম্নমানের পাশাপাশি নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ রোধে কেনা সামগ্রীগুলো অস্বাভাবিক দামে ক্রয়ে অনিয়মেরও অভিযোগ উঠেছে। এ অবস্থায় ক্রয় ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও অনিয়ম রোধে রেলের সব বিভাগীয় প্রধানকে অনুরোধ জানিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ।

১০ জুন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের কার্যালয় থেকে দেয়া ওই অতীব জরুরি পত্রে দেখা গেছে, রেলের বিভিন্ন বিভাগে করোনাকালীন স্বাস্থ্য সুরক্ষাসামগ্রী ক্রয়ের অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে মানসম্মত সামগ্রী প্রদান ও যৌক্তিক দাম নির্ধারণের অনুরোধ করা হয়। রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের সব বিভাগীয় প্রধানকে উদ্দেশ করে এ চিঠি দেয়া হয়। চিঠির অনুলিপি দেয়া হয় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক, প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস-পাহাড়তলী), বিভাগীয় রেলওয়ে ম্যানেজারকে (ডিআরএম-ঢাকা, চট্টগ্রাম)।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক (সিসিএস) রুহুল কাদের আজাদ নিরাপত্তাসামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে কোনো অনিয়ম নেই বলে দাবি করেন। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী কেনা হচ্ছে। যদিও সম্প্রতি রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের দপ্তর থেকে সব বিভাগীয় প্রধানকে এ বিষয়ে চিঠি ইস্যু করা হয়েছে। আমরা চিঠির পরিপ্রেক্ষিতে সুরক্ষা সামগ্রী কেনাকাটায় স্বচ্ছতা আনতে কাজ করছি।

অভিযোগ রয়েছে, মার্চে নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের ১১টি দপ্তর কয়েক দফায় সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় শুরু করে। পাশাপাশি সিসিএস দপ্তরও বিভিন্ন দপ্তরের অনুরোধে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় প্রক্রিয়া শুরু করে। এর মধ্যে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বৈদ্যুতিক বিভাগ, ভূসম্পত্তি বিভাগ, প্রকৌশল বিভাগের সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সম্প্রতি বাণিজ্যিক দপ্তরের সুপারিশে সিসিএস কার্যালয় বিভিন্ন স্টেশনে সুরক্ষা যন্ত্রপাতি বসানোর উদ্যোগ নেয়। কিন্তু দরপত্র তৈরি না হওয়ার আগেই নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এরই মধ্যে এসব সামগ্রী বিভিন্ন স্টেশনে বসানো হয়েছে। এসব সামগ্রী ক্রয়ে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন রেলের বিভিন্ন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও। দরপত্র ঘোষণার আগেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সুরক্ষা সামগ্রী প্রদানের বিষয়টি এড়িয়ে যান রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রকও।

গত ১০ জুন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টকে (সিওপিএস) দেয়া ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নিম্নমানের সামগ্রী সংগ্রহ এবং এসব সুরক্ষা সামগ্রী বাজার দরের চেয়েও অতিরিক্ত মূল্যে সংগ্রহ করা হচ্ছে। সম্প্রতি এ বিষয়ে বেশকিছু অভিযোগ পাওয়া গেছে। কভিড-১৯ প্রতিরোধকল্পে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সম্মানিত যাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে নিম্নমানের সুরক্ষা সামগ্রী সংগ্রহ বা বাজার দরের চেয়ে অধিক মূল্যে ক্রয়ের কোনো সুযোগ নেই। এক্ষেত্রে রেলের ক্রয় নীতিমালার প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করে মানসম্মত সুরক্ষা সামগ্রী বাজার দরের ভিত্তিতে যৌক্তিক মূল্যে ক্রয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করতে অনুরোধ জানান রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক সরদার সাহাদাত আলী।

রেলওয়ের মাঠ পর্যায়ের একাধিক কর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকে এপ্রিলের শুরু থেকেই কয়েক দফায় ভাইরাস প্রতিরোধে বিভিন্ন সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় শুরু হয়। এর মধ্যে রয়েছে পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই), হ্যান্ড স্যানিটাইজার, মাস্ক, গ্লাভস, গগলস, রেলওয়ে হাসপাতালগুলোর জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ্য সরঞ্জাম, হ্যান্ড থার্মাল স্ক্যানার ইত্যাদি। দ্রুত ক্রয়ের স্বার্থে এসব সামগ্রীর অধিকাংশ সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে ক্রয় করা হচ্ছে। কিন্তু বাজার যাচাই ছাড়াই দরপত্র মূল্যায়নের আগেই এসব সামগ্রী পছন্দের প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে সরবরাহ করানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রেলের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো থেকে চাহিদাপত্র আসার আগেই একাধিক সুরক্ষা পণ্য সরবরাহের বিষয়টি জানেন না রেলের সিসিএম দপ্তরও। সম্প্রতি রেলের কয়েকটি দপ্তরের কর্মীরা নিম্নমানের সুরক্ষা সামগ্রী প্রদানের বিরুদ্ধে বিক্ষোভও করেছে।

সিসিএস দপ্তরের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বণিক বার্তাকে বলেন, রেলের বিভিন্ন দপ্তর থেকে কভিড-১৯ প্রতিরোধে সুরক্ষা সামগ্রী কেনার জন্য চাহিদাপত্র দেয়া হয়েছে। আমরা তালিকাভুক্ত একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করে বাজারদর যাচাই করেছি। এরপর সীমিত দরপত্র পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠানগুলোর আবেদন মূল্যায়ন করছি। কিন্তু দরপত্র মূল্যায়ন শেষে কার্যাদেশ প্রদানের আগেই সুরক্ষা পণ্য সরবরাহের বিষয়টি আমরাও শুনেছি। কীভাবে এসব ক্রয় হয়েছে সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধারণা নেই বলে দাবি করেন তিনি।

রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নভেল করোনাভাইরাস প্রতিরোধে স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী নিয়মিত বিরতিতে ক্রয় করা হচ্ছে। কিন্তু অনেক বিভাগই কাপড়ের মাস্ক, নিম্নমানের হ্যান্ড স্যানিটাইজার ও গগলস ক্রয় করায় কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। দ্রুত সময়ে ক্রয়ের কারণে অনেক বিভাগই কেনাকাটায় সরকারি নীতিমালা অনুসরণ করছে না। মাঠ পর্যায়ের কর্মীদের দেয়া সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়ের অনিয়মের বিরুদ্ধে রেলের একাধিক বৈঠকে নির্দেশনা দেয়া হলেও সেটি মানা হচ্ছে না। এ কারণে বাধ্য হয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের দপ্তর চিঠির মাধ্যমে সব বিভাগীয় প্রধানকে অনুরোধ জানাতে বাধ্য হয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয় ও সরবরাহের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত দাম ও মান যাচাই করা না হলে রেলের কর্মরত ২৬ হাজার কর্মীর নভেল করোনাভাইরাসের ঝুঁকি আরো বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন তিনি।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ে শ্রমিক নেতা মো. সাজ্জাদ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, রেলওয়ে একটি বিশেষায়িত প্রতিষ্ঠান হওয়ায় রেলের উচ্চ পর্যায় থেকে মাঠ পর্যায়ের কর্মীরাও দুর্যোগকালীন সময়ে কাজ করছে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও রেলওয়ে কর্মীদের দেয়া হচ্ছে নিম্নমানের সুরক্ষা সামগ্রী। এরই মধ্যে সারা দেশে বিপুল পরিমাণ রেলওয়ে কর্মী বা কর্মকর্তা নভেল করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। সুরক্ষা সামগ্রী ক্রয়ের ক্ষেত্রে অনিয়ম দূর করা না হলে নভেল করোনাভাইরাসের মতো মহামারীতে রেলওয়ের সব শ্রেণীর কর্মীরা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বেন বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

সূত্র:বণিক বার্তা, জুন ২৬, ২০২০

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।