শিরোনাম

মাত্র চার ট্রেনের জন্য ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা!

মাত্র চার ট্রেনের জন্য ব্যয় ৪০ হাজার কোটি টাকা!

ইসমাইল আলী: পদ্মা সেতু উদ্বোধন করা হয়েছে গত ২৫ জুন। তবে রেলপথ নির্মাণ শেষ না হওয়ায় শুধু সড়ক অংশটি উদ্বোধন করা হয়েছে। আগামী বছর মার্চ থেকে জুনের মধ্যে পদ্মা সেতুতে ট্রেন চলাচল শুরু হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এজন্য নির্মাণ করা হচ্ছে ঢাকা থেকে মাওয়া, ভাঙ্গা, নড়াইল হয়ে যশোর পর্যন্ত ২১৫ দশমিক ২২ কিলোমিটার রেলপথ, যা পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প নামে পরিচিত।

প্রকল্পটি বাস্তবায়নে এখন পর্যন্ত ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। তবে এ ব্যয় আরও বাড়বে। কারণ এরই মধ্যে প্রকল্পটি পরামর্শক নিয়োগ ও জমি অধিগ্রহণ ব্যয় বেড়ে গেছে। এতে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে ৪১ হাজার কোটি টাকায় ঠেকেছে। যদিও এ রেলপথে চলবে মাত্র চারটি ট্রেন। তাই মাত্র চার ট্রেনের জন্য এ প্রকল্পের বিনিয়োগ খুবই ঝুঁকিপূর্ণ মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তথ্যমতে, রেলের উন্নয়নকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে বর্তমান সরকার। এজন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি এ খাতে একের পর এক নেয়া হচ্ছে উন্নয়ন প্রকল্প। এর মধ্যে অন্যতম পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পটি। তবে এ রেলপথটি দিয়ে চলবে তিনটি অভ্যন্তরীণ ট্রেন। এগুলো হলো সুন্দরবন এক্সপ্রেস, চিত্রা এক্সপ্রেস ও বেনাপোল এক্সপ্রেস। এছাড়া ঢাকা-কলকাতা রুটে চলাচলকারী মৈত্রী এক্সপ্রেসও এ রুটে চলার সম্ভাবনা রয়েছে।

যদিও এগুলো নতুন কোনো ট্রেন নয়। বর্তমানে এ ট্রেনগুলো বঙ্গবন্ধু সেতু, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ হয়ে অনেকটা ঘুরে ঢাকা থেকে খুলনা ও বেনাপোল রুটে চলাচল করে। ঢাকা-নড়াইল-যশোর রেলপথ চালু হলে ট্রেনগুলো নতুন রুটে চলতে পারবে। এতে রুট ডায়ভার্ট হবে, ফলে দূরত্ব কমবে। এছাড়া পদ্মা রেল সংযোগপথ চালু হলে ঢাকা থেকে ফরিদপুর বা গোপালগঞ্জ রুটে নতুন ট্রেন চালু করা হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতে ট্রেনের সংখ্যা বেড়ে পাঁচটি বা ছয়টি হবে। তবে তা ১০-এর নিচেই থাকবে।

এ অবস্থায় প্রকল্পটিকে বাংলাদেশ সরকারের জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ তথা ‘সাদা হাতি’ বলে সম্প্রতি আখ্যায়িত করেছেন একাধিক বিশেষজ্ঞ। এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি ড. মইনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে গত এক দশকে অনেক মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে, যেগুলোর কয়েকটিকে স্বল্প প্রয়োজনীয় অথবা অপ্রয়োজনীয় আখ্যা দেয়া চলে। চলমান প্রকল্পের মধ্যে এমনই একটি ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প।

তিনি বলেন, পদ্মা সেতুর সড়কপথ চালু হওয়ার পর ওই সেতুর মাধ্যমে ঢাকা-যশোর-পায়রা পর্যন্ত নির্মীয়মাণ রেলপথের অর্থনৈতিক ‘ফিজিবিলিটি’ (উপযোগিতা) ভবিষ্যতে খুব বেশি আকর্ষণীয় হওয়ার তেমন সুযোগ থাকবে না। কারণ রেলপথটি পণ্য পরিবহনের তুলনামূলক খরচের বিবেচনায় সড়কপথের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক বিবেচিত হবে না। ফলে ভবিষ্যতেও রেলপথটি ‘আন্ডার-ইউটিলাইজড’ থেকে যাবে। অতএব, ওই প্রকল্পের সম্ভাব্য আয় দিয়ে চীনা ঋণের অর্থে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির সুদাসলে কিস্তি পরিশোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। এমনকি ভারতকে এ রেলপথ ব্যবহার করতে দিলেও অদূর ভবিষ্যতে প্রকল্পটি ‘সাদা হাতি’ প্রকল্পই থেকে যাবে।

এর পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পটি কেন গ্রহণ করা হয়েছিল এ বিষয়ে জানতে রেলওয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক, রেলসচিব ও রেলমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে শেয়ার বিজ। তবে তারা কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি। পরে বর্তমান মহাপরিচালকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের নির্দেশে রেলওয়ে এ প্রকল্পটি নিয়েছিল।

তিনি আরও বলেন, ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেললাইন চালু হলে পদ্মা রেল সংযোগের ঢাকা-ভাঙ্গা পর্যন্ত অংশে ট্রেন চলাচল বাড়বে। এছাড়া রেলওয়ে মাস্টারপ্ল্যানে ২০৪১ সালের মধ্যে ৬৩ জেলাকে (ভোলা বাদে) রেল সংযোগের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। সে জন্যও এ প্রকল্পটি কাজ করবে। আর অর্থনৈতিকভাবে এ রেলপথ লাভজনক না হলেও জনগণের চলাচলের জন্য খুবই উপকারী হবে। বর্তমান সময়ের অর্ধেকের কমে খুলনা বা কলকাতা যাতায়াত করা যাবে।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের এক কর্মকর্তা এ প্রসঙ্গে আরও বলেন, প্রকল্পটি সম্পন্ন হলে ভারতের সঙ্গে রেল ট্রানজিট চালুর সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে পণ্যবাহী ট্রেন ঢাকা পর্যন্ত আসার সুযোগ নেই। তবে পদ্মা সেতু দিয়ে কলকাতা থেকে ঢাকা পর্যন্ত পণ্যবাহী ট্রেন চলতে পারবে। আর আখাউড়া-সিলেট ডুয়েলগেজ লাইন হয়ে গেলে তা শাহাবাজপুর হয়ে করিমগঞ্জ দিয়ে আসাম যেতে পারবে।

এদিকে ঢাকা-নড়াইল-যশোর রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পটির কিলোমিটারপ্রতি ব্যয় চলমান অন্যান্য প্রকল্পের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। রেলওয়ের এক বিশ্লেষণেই এ তথ্য উঠে আসে। এ প্রকল্পে ঠিকাদার হিসেবে কাজ করছে চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশন (সিআরইসি)। জিটুজি ভিত্তিতে বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পে ঋণ দিচ্ছে চীনের এক্সিম ব্যাংক।

সূত্র জানায়, বাংলাদেশকে এ প্রকল্পে নিতে হয়েছে কঠিন শর্তের ঋণ (বায়ার্স ক্রেডিট) তথা চীনের প্রিফারেনশিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (অবশ্যই পরিশোধ করতে হবে)। এ ঋণের সুদহার ২ শতাংশ। তবে এর সঙ্গে শূন্য দশমিক ২৫ শতাংশ হারে দিতে হবে প্রতিশ্রুতি ও ব্যবস্থাপনা ফি (দুটি মিলে ০.৫ শতাংশ)। ঋণ পরিশোধ করতে হবে ২০ বছরের মধ্যে। এর মধ্যে রেয়াতকাল ৬ বছর। অর্থাৎ আগামী বছর থেকে এ ঋণের সুদসহ কিস্তি পরিশোধ শুরু করতে হবে।

উল্লেখ্য, ২০১৮ সালে পদ্মা রেল সংযোগ প্রকল্পের নির্মাণ ব্যয় এক দফা বাড়ানো হয়েছে। এতে ঢাকা-মাওয়া-যশোর রেলপথ নির্মাণ ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ২৪৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ২১ হাজার ৩৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা ঋণ দেবে চীন। বাকি ১৮ হাজার ২১০ কোটি ১১ লাখ টাকা সরকারের তহবিল থেকে সরবরাহ করা হবে।

যদিও প্রকল্পটির ব্যয় আরেক দফা ব্যয় বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলছে। এক্ষেত্রে ১ হাজার ১৯৪ কোটি টাকা ব্যয় হবে অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণসহ সংশ্লিষ্ট কয়েকটি খাতে। এছাড়া প্রকল্পটির পরামর্শক নিয়োগ ব্যয়ও ৪৬৬ কোটি ৫০ লাখ টাকা বাড়ানো হচ্ছে। এতে প্রকল্প ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৪০ হাজার ৮৬২ কোটি টাকা। এর বাইরে নির্মাণব্যয়ও বাড়তে পারে।

সূত্র:শেয়ার বিজ


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।