অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই ইঞ্জিন সংখ্যার

অবকাঠামো উন্নয়নের সঙ্গে সামঞ্জস্য নেই ইঞ্জিন সংখ্যার

সুজিত সাহা :

রেলওয়ের উন্নয়নে লক্ষাধিক কোটি টাকার প্রকল্প নিয়েছে সরকার। রেলের অবকাঠামোতে এসেছে উন্নয়নের ছোঁয়া। টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে সারা দেশকে রেল নেটওয়ার্কের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। কিন্তু রেলের উন্নয়নে ইঞ্জিনের মতো অত্যাবশ্যক অনুষঙ্গ যথাযথ গুরুত্ব পায়নি। খুব শিগগিরই বহরে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত না হলে চরম সংকটে পড়বে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্থানে রেলের ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটছে। এতে বাড়ছে ভ্রমণ সময়, হচ্ছে শিডিউল বিপর্যয়। রেলের আয়েও পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব। বিদ্যমান অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রায় দ্বিগুণ ট্রেন পরিচালনার সুযোগ থাকলেও কোচ ও ইঞ্জিন সংকটের কারণে তা পারছে না রেলওয়ে। দুই বছরের মধ্যে ট্রেন সংখ্যা কমিয়ে আনা ছাড়া উপায় থাকবে না বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছে রেলের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো।

ফেব্রুয়ারির প্রথম ২৬ দিনে পূর্বাঞ্চল রেলে ৩১টি ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটে। সর্বশেষ গত সোমবার পাহাড়তলী ওয়াশপিট থেকে ট্রেন নিয়ে যাওয়ার সময় ২২১১ নম্বর শান্টিং ট্রেনের ক্র্যাংকেজ কভার ভেঙে যায়। এর ফলে ঢাকামুখী সোনার বাংলা এক্সপ্রেস প্রায় ৪০ মিনিট বিলম্বিত হয়। এর আগে ২০ ফেব্রুয়ারি ৩৭ নম্বর আপ (মেইল) ট্রেনটির ২৭০১ নম্বর ইঞ্জিন বিকল হয় কিশোরগঞ্জ স্টেশনে। রিলিফ ইঞ্জিন পাঠিয়ে ট্রেনটি উদ্ধার ও নষ্ট হওয়া ইঞ্জিন মেরামতে সময় লাগে ৭ ঘণ্টা ২০ মিনিট।

পূর্বাঞ্চল রেলের প্রকৌশল শাখার তথ্যানুসারে, রেলের ইঞ্জিন নষ্ট হওয়ার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। ২০১৬ সালের জুলাইয়ে ২৫টি ইঞ্জিন বিকল হয়। এছাড়া আগস্টে ১৮টি, সেপ্টেম্বরে ১৭টি, অক্টোবরে ১৮টি, নভেম্বরে ২১টি ও ডিসেম্বরে ১৯টি ইঞ্জিন বিকল হয়। অন্যদিকে ২০১৭ সালের জুলাইয়ে ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ২৬টি, আগস্টে ২২টি, সেপ্টেম্বরে ১৬টি, অক্টোবরে ৩১টি, নভেম্বরে ৩২টি ও ডিসেম্বরে ২১টি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ২১টি ও ফেব্রুয়ারিতে (২৬ তারিখ পর্যন্ত) ৩১টি ইঞ্জিন বিকল হয়।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিং স্টক) মো. শামসুজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, রেলের ইঞ্জিন সংকটের বিষয়টি কারো অজানা নয়। আমরা ইঞ্জিন আমদানির বিষয়ে কিছু পরিকল্পনা নিয়েছি। তবে এর একটিও চূড়ান্ত হয়নি। এডিবির ঋণের বিষয়ে এখনো চুক্তি হয়নি। ফলে কবে নাগাদ রেলের বহরে নতুন ইঞ্জিন যুক্ত হবে, সে বিষয়ে কোনো ধারণা দেয়া সম্ভব নয়

বলে তিনি জানান।

তথ্যমতে, আমদানির পর ২০ বছর পর্যন্ত রেল ইঞ্জিনের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল থাকে। প্রতিটি ইঞ্জিনকে একবার চালানোর পর ন্যূনতম ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম দিতে বা থামিয়ে রাখতে হয়। তবে চাহিদার তুলনায় ইঞ্জিন কম থাকায় গন্তব্যে পৌঁছানোর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সেটিকে ফিরতি ট্রেনে যুক্ত করা হয়। পর্যাপ্ত বিশ্রামের অভাবে দ্রুত ক্ষয়ে যাচ্ছে ইঞ্জিনগুলোর আয়ুষ্কাল। এতে করে মেরামতের পরও ফের ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটছে।

রেলের পাওয়ার সেকশনের নথি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, পূর্বাঞ্চল রেলের ১৫০টি ইঞ্জিনের মধ্যে প্রতিদিন ১১১টির চাহিদা রয়েছে। কিন্তু নিয়মিত পাওয়া যায় ১০০ থেকে ১০৩টি ইঞ্জিন। প্রতিদিন প্রায় ১০টি ইঞ্জিন ঘাটতি রেখে ট্রেনের শিডিউল ব্যবস্থাপনার চেষ্টা করতে হয় রেলওয়েকে। ১৫০টির মধ্যে মাত্র ৩১ শতাংশ বা ৪৭টি ইঞ্জিন অর্থনৈতিক আয়ুষ্কালের মধ্যে রয়েছে। এছাড়া ২১ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে ৩৪টি এবং ৩০ বছরের অধিক বয়সী ইঞ্জিন রয়েছে ৬৯টি। অর্থাৎ পূর্বাঞ্চল রেলের ইঞ্জিনের ১০৩টিই মেয়াদোত্তীর্ণ। এসব ইঞ্জিনের সাহায্যে যাত্রীবাহী ট্রেনের শিডিউল কোনোরকম ঠিক রাখা হলেও রেলের জন্য লাভজনক মালবাহী ট্রেনগুলো বসিয়ে রাখতে হয়। রেলওয়ে পশ্চিমাঞ্চলে ইঞ্জিন ১২৪টি। এর মধ্যে নিয়মিত সর্বোচ্চ ১০০টি ইঞ্জিন পাওয়া যায়। পশ্চিমাঞ্চলের প্রায় ৭০ শতাংশ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় বিভিন্ন সময়ে পথিমধ্যে ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা বাড়ছে বলে স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা।

পূর্বাঞ্চলে রেলের বহরে সর্বশেষ ইঞ্জিন যুক্ত হয় ২০১১ সালে। ওই বছর দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানিকৃত ১১টি ইঞ্জিন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলে যুক্ত করা হয়। ২০১৩ সালে একই দেশ থেকে আমদানিকৃত ৩৯টি ইঞ্জিন পশ্চিমাঞ্চলে যুক্ত করা হয়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরোলেও রেলের জন্য কোনো ইঞ্জিন আমদানি হয়নি। এ কারণে চাহিদা বাড়লেও লাভজনক রুটে ট্রেন বৃদ্ধি করতে পারছে না রেলওয়ে।

রেলওয়ে সূত্র জানিয়েছে, ট্রেন পরিচালনায় দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য ২০১১ সালে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের জন্য ৭০টি মিটারগেজ ইঞ্জিন ক্রয়ে একটি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। বিডার্স ফিন্যান্সের মাধ্যমে (সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের ঋণ) ইঞ্জিনগুলো ক্রয়ের ক্ষেত্রে শর্ত জটিলতার কারণে এখনো আলোর মুখ দেখেনি প্রকল্পটি। এরপর একাধিকবার ইঞ্জিন ক্রয়ে প্রকল্প নেয়া হলেও অজানা কারণে এখনো প্রকল্পগুলো সম্পন্ন হয়নি। সর্বশেষ গত মাসে রেলওয়ের রোলিং স্টক অপারেশনস ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় ইঞ্জিন, কোচ ও যন্ত্রপাতি ক্রয়ে ৩৬ কোটি ডলার ঋণ অনুমোদন করে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি)। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সর্বশেষ সময় ধরা হয়েছে ২০২২ সালের জুন মাস। অর্থাৎ চলমান প্রকল্পগুলোর আওতায় রেলের ইঞ্জিন আমদানি করা হলে সেগুলো দেশে পৌঁছতে ৩ থেকে ৫ বছর পর্যন্ত সময় লাগবে। কিন্তু সংকটাপন্ন রেলওয়েতে আগামী এক বছরের মধ্যে ইঞ্জিন সরবরাহ না বাড়লে চলমান সেবার মান আশঙ্কাজনক হারে কমে যাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

রেলের ঊর্ধ্বতন এক লোকো প্রকৌশলী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, রেলের ইঞ্জিন স্বল্পতার সমস্যা দীর্ঘদিনের। রেলের অবকাঠামোগত উন্নয়নে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও ইঞ্জিন আমদানিতে অজানা কারণে ধীরগতিতে চলছে কর্তৃপক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে রেলের বহরে প্রায় ২৭০টি কোচ যুক্ত হলেও ইঞ্জিন আমদানি না করায় ট্রেন সার্ভিস বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ভালো ইঞ্জিনের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ায় আগামী এক বছরের মধ্যে রেলওয়ের পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কম ইঞ্জিন থাকায় মেরামতে থাকা ইঞ্জিনগুলোতে যেকোনো উপায়ে দ্রুত সারিয়ে তোলা হয়। এসব ইঞ্জিন আবারো বড় ধরনের দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এ অবস্থা চলতে থাকলে রেলওয়ের সেবার অবনতি হবে বলে জানান তিনি।

সুত্র:বণিক বার্তা

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।