রেল লাইনে অস্থায়ী বাজার বাড়ছে দুর্ঘটনা

রেল লাইনে অস্থায়ী বাজার বাড়ছে দুর্ঘটনা

হাসান মাহমুদ রিপন :

রাজধানীর কারওয়ান বাজার। ক্রেতা আর বিক্রেতার হাক ডাকে মুখর এই মাছের বাজার, রেল লাইনের ওপর। লাইনের ওপরই সাজানো সারি সারি মাছের হাড়ি। ক্রেতা-বিক্রেতা সবাই দাঁড়িয়ে লাইনের ওপর। চার লেনের এই রেল পথের দু’ধারই মুখর থাকে প্রতিদিন। ট্রেন আসলেই শুরু হয় দৌড় ঝাঁপ, এদিক সেদিক ছুটাছুটি। ফলে মাঝে-মধ্যেই ঘটছে প্রাণহানির মতো ঘটনা।

রেল লাইন দখল করে রাজধানীতে একের পর এক গড়ে উঠছে অস্থায়ী সব বাজার। এসব বাজারে অবাধ চলাফেরা আর ক্রেতা-বিক্রেতার সমাগমের ফলে হর হামেশায় ঘটছে দুর্ঘটনা। লাইনের ওপর অবাধ চলাফেরার কারণে প্রতি বছর মারা যাচ্ছে অন্তত ৪শ’ মানুষ। মাঝে মধ্যে অবৈধ এসব বাজার উচ্ছেদে অভিযান পরিচালনা হলেও হচ্ছে না পরিস্থিতির বদল। পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ঈদের আগে রেল লাইনের ওপর গড়ে ওঠা এসব বাজার উচ্ছেদ করা না হলে বাড়তে পারে দুর্ঘটনা। অপরদিকে এ ব্যাপারে কার্যকরী উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস রেলমন্ত্রীর।

রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলেন, অনেকেই নিজ দায়িত্বে রেল লাইনের পাশে অস্থায়ী বাজার বসায়। এটা আইনে নেই এবং ঠিক নয়। যারা আইন মানে না তাদের আমরা উচ্ছেদ করছি, করে যাব। তিনি বলেন, এসব বাজারের সঙ্গে প্রভাবশালী ব্যক্তিরা জড়িত বলে স্থায়ী উচ্ছেদ সম্ভব হচ্ছে না। তবে কার্যকর উদ্যোগ নেয়ার আশ্বাস দেন রেলমন্ত্রী।

কারওয়ান বাজারের বেশ কয়েক মাছ ব্যবসায়ী জানান, একটু ভেতরে (লাইনের বাইরে) মাছ বিক্রি করতে হলে ডালা প্রতি ৩শ’ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত দিতে হয় লাইনম্যানদের। আর এখানে (লাইনের ওপর) মাছ বিক্রি করলে তেমন দিতে হয় না। ডালা প্রতি মাত্র ১শ’ টাকা দিলে চলে।
রেজাউল নামের এক মাছ ব্যবসায়ী জানান, তারা প্রতিদিন ২শ’ টাকার বিনিময়ে দু’জন টোকাই রেখেছেন। ট্রেন এলে দু’জন টোকাই দু’প্রান্ত থেকে ‘ট্রেন আহে, ট্রেন আহে’ বলে জোরে ডাক দেয়। আর ডাক শুনে আমরা মাছের ঝুড়ি নিয়ে সরে যাই।

কারওয়ান বাজারের একই রকম চিত্র জুরাইনের রেললাইনেও। সরু রেল লাইনের দু’ পাশেই গড়ে উঠেছে সবজি বাজার। লাইনের ওপরই বসেছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দোকান। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জমজমাট থাকে এই বাজার।

রাজধানীতে রেললাইনের ওপর গড়ে ওঠা ঝুঁকিপূর্ণ বাজারগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে কারওয়ান বাজার রেলক্রসিং, মালিবাগ, মগবাজার, তেজগাঁও, নাখালপাড়া, ক্ষিলখেত, জুড়াইন, গেণ্ডারিয়া, মহাখালী। সূত্র: রেলওয়ে পুলিশ।

রেলওয়ে ঢাকা বিভাগীয় প্রধান ভূসম্পদ কর্মকর্তা এসএম রেজাউল করিম জানান, তাদের দফতরে লাইন পাহারা দেয়ার কোনো লোক নেই। লাইনের ওপর মাছ বাজারসহ কারওয়ান বাজার রেললাইন ঘেঁষা অবৈধ স্থাপনা বহুবার উচ্ছেদ করা হয়েছে। কিন্তু উচ্ছেদ করার পর পরই এক শ্রেণির দালাল, স্থানীয় ক্ষমতাসীন লোকজন আবার অবৈধ স্থাপনাসহ রেললাইনের ওপর মাছ বাজার বসিয়ে দেয়। তিনি জানান, কারওয়ান বাজারের মাছ বাজারটির অধিকাংশই রেললাইনের জায়গায়। অবৈধ এ স্থাপনা উচ্ছেদে আবারো অভিযান চালানো হবে।

রেলওয়ে পুলিশ বলছে, কমলাপুর থানা এলাকায় এমন বাজার আছে প্রায় অর্ধশত যার মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ অন্তত পনেরটি। তারা বলছে, বাজারকে কেন্দ্র করে লাইনের ওপর অবাধ যাতায়াত, আতঙ্কিত অবস্থায় পার হতে গিয়ে ও লাইনের ওপর উন্মুক্ত চলাচলের কারণে গত পাঁচ বছরে মারা গেছেন প্রায় দুই হাজার মানুষ।

রেললাইনের ওপর অবাধ চলাচলের কারণে ঘটছে ব্যাপক প্রাণহানি। এর মধ্যে ২০১৩ সালে ৪১১ জন, ২০১৪ সালে ৩৯১ জন, ২০১৫ সালে ৪৪৯ জন, ২০১৬ সালে ৩৬৩ জন, ২০১৭ সালে ৩৭০ জন অর্থাৎ সর্বমোট ১৯৭৬ জন নিহত হয়েছেন। সূত্র: রেলওয়ে পুলিশ।

এদিকে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ঈদকে কেন্দ্র করে আরো জমজমাট হয়ে ওঠে এসব বাজার। ফলে বেড়ে যায় দুর্ঘটনার আশঙ্কা, তাই রেলপথে ঈদ যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে অবৈধ এসব বাজার উচ্ছেদে এখন থেকেই কার্যক্রম শুরুর পরামর্শ তাদের।

বুয়েটের দুর্ঘটনা কেন্দ্রের সহকারী অধ্যাপক কাজী সাইফুন নেওয়াজ বলেন, ঈদের সময় সাধারণত বাজার বৃদ্ধি পায়। এই বাজারগুলো রেল লাইনের কাছে হলে দুর্ঘটনার পরিমাণ বেড়ে যায়। এখন থেকেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সতর্ক হতে হবে এবং বাজারগুলোকে সরাতে হবে।জানা যায়, ভাসমান বলা হলেও রেললাইনের ওপরে গড়ে ওঠা এসব বাজারে সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত টানা বেচাকেনা চলে। মূল বাজারের চেয়ে দামে সস্তা বলে এসব দোকানে ক্রেতাদেরও ভিড় বেশি।

রেললাইনের কাছে ঝুঁকি নিয়ে বসেছেন কেন? এমন প্রশ্নে ক্ষিলখেত এলাকার দীন ইসলাম নামের এক বিক্রেতা বলেন, অন্য কোথাও বসার জায়গা নেই। এখানে পণ্য বিক্রি করে যা আয় রোজগার হয় তা দিয়েই কোনো মতে চলে যায় তার অভাবের সংসার। তবে ট্রেন আসার আভাস পেলে তারা ক্রেতাদের সতর্ক করে দূরে সরিয়ে দেন। অন্যদিকে একাধিক ক্রেতার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূল বাজারের চেয়ে অনেক সস্তায় জিনিসপত্র পাওয়া যায় বলে তারা এসব দোকান থেকে কাঁচা সামগ্রী কেনেন।

সুত্র:মানব কন্ঠ, 3/05/2018

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।