রেললাইনে বেশির ভাগ মৃত্যু অসচেতনতায়

রেললাইনে বেশির ভাগ মৃত্যু অসচেতনতায়

জহিরুল ইসলাম:

ট্রেন আসার মাত্র কয়েক সেকেন্ড বাকি। গেটম্যান দুইদিকে ব্যারিকেড দিয়ে রাস্তা বন্ধ করে দিয়েছেন। বাজাচ্ছেন হাতে থাকা সতর্কীকরণ বাঁশি। হাত নাড়িয়েও অপেক্ষা করতে অনুরোধ করা হচ্ছে। এর পরও লোহার বার তুলে নিচ দিয়ে ঢুকে পড়ছে পথচারীসহ সাইকেল ও মোটরসাইকেলের চালকরা। এ যেন বাধা পেরিয়ে রেললাইন পার হওয়ার প্রতিযোগিতা। আবার পার হতে ব্যর্থ হয়ে ধাবমান ট্রেনের দু-তিন ফুটের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়েছে কেউ কেউ। সঙ্গে আছে শিশুও। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে এমন নিয়ম না মানার প্রতিযোগিতা দেখা গেল রাজধানীর সায়েদাবাদ লেভেলক্রসিংয়ে।

রেললাইন পার হতে ব্যর্থ হয়ে চলন্ত ট্রেনের কাছে শিশু ফাহমিদাকে (৭) নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন বাবা সুলাইমান মিয়া। কেন এমন উতলা হয়ে পার হতে চাইলেন—এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘মেয়েকে স্কুল থেকে ওয়ারীতে বাসায় নিয়ে যাচ্ছিলাম। আসলে দোকান খোলা রেখে আসছি। তাই একটু আগে পার হতে চেয়েছিলাম।’

প্রতিবছর রেললাইনে দুর্ঘটনায় পাঁচ শর বেশি অপমৃত্যুর মামলা হয়; যার বেশির ভাগই ঘটে রাজধানী ঢাকার আশপাশে। গত ১৬ ফেব্রুয়ারি এক শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর ট্রেন দুর্ঘটনায় মৃত্যুর বিষয়টি বেশি করে আলোচনায় আসে। কুড়িল রেললাইনে সেলফি তুলতে গিয়ে প্রাণ যায় ইমরান হোসেনের (১৬)। আহত হয় তার সহপাঠী আল রাফি (১৬)। আর সর্বশেষ গত শুক্রবার রাজধানীর উত্তরায় রেললাইন পার হওয়ার সময় চলন্ত ট্রেনের ধাক্কায় প্রাণ যায় তৌহিদুল ইসলামের (২৪)। তাঁর গ্রামের বাড়ি খুলনার খালিশপুর উপজেলার গোয়ালপাড়া। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে দয়াগঞ্জ এলাকায় ব্রিজের নিচের রেললাইনে ট্রেনের ধাক্কায় এক যুবক নিহত হয়। চোখের সামনে এমন অনেক দুর্ঘটনা ঘটলেও বাড়ছে না সচেতনতা।

ঢাকা রেলওয়ে থানা এলাকার রেললাইনে ১০ বছরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা গেছে ২০১৪ সালে, ৩১৮ জন। চলতি বছরে ফেব্রুয়ারির ২৮ তারিখ পর্যন্ত মারা গেছে ২১ জন। অন্যান্য বছরের মধ্যে ২০১০ সালে ২০৩ জন, ২০১১ সালে ২১৫ জন, ২০১২ সালে ৩০৬ জন, ২০১৩ সালে ৩০৫ জন, ২০১৫ সালে ২৮৫ জন, ২০১৬ সালে ২৯৬ জন, ২০১৭ সালে ২৮০ জন, ২০১৮ সালে ২০৫ জন, ২০১৯ সালে ১৯৮ জন মানুষ ট্রেন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায়। এই হিসাবে গত ১০ বছরে শুধু রাজধানী ও এর আশপাশে ট্রেন দুর্ঘটনায় মারা গেছে দুই হাজার ৬৩১ জন।

বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের ডিআইজি মো. শামসুদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সতর্কতামূলক প্রচার চালাচ্ছি। মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি না হলে কিছুরই পরিবর্তন হবে না। উঠতি বয়সী ছেলে-মেয়েরা, মোটরসাইকেল ব্যারিকেডের নিচ দিয়ে চলে যায়। লিফলেট বিতরণ, মাইকিং, স্টেশনের টিভি স্ক্রিনে বিজ্ঞাপন, সভাসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছি। সামনের সময়ে সব বিষয়ে আরো কঠিন ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, রেলপথের দুই পাশে ১০ ফুট এলাকায় চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ওই সীমানার ভেতর কেউ প্রবেশ করলে তাকে গ্রেপ্তারের বিধান পর্যন্ত রয়েছে। কর্তৃপক্ষ চাইলে বিনা পরোয়ানায় দায়ী ব্যক্তিকে গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অবৈধ সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু আইনের প্রয়োগ খুব একটা নজরে আসে না। বরং রেললাইনের পাশে দেখা যায় বিভিন্ন অবৈধ ব্যবসাসহ স্থাপনা। রেলওয়ে পুলিশকেও এলাকার নেতাদের দাপটে চুপসে থাকতে হয়।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সায়েদাবাদ থেকে কমলাপুর, মালিবাগ এবং মগবাজারের পাশে রেললাইন ঘেঁষে ছিন্নমূল মানুষের অবস্থান। চলছে ইট, পাথরসহ বিভিন্ন রকমের পণ্যের ব্যবসা। গোপীবাগ লেভেলক্রসিংয়ে বার বা কোনো গেটম্যান নেই। যেখানে আছে তাঁরা বাধা দিতে গিয়ে মার খাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। গেটম্যানরা জানান, লেভেলক্রসিংয়ে  রিকশা-গাড়ি থামানো গেলেও মোটরসাইকেল ও পথচারীদের থামানো কঠিন। অনেক সময় মার খেতে হয়। সায়েদাবাদ লেভেলক্রসিংয়ে দায়িত্বরত গেটম্যান হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ট্রেন আসার সংকেত দিয়া রাস্তা বন্ধ করে দিলেও থামে না। চিৎকার করি, বাঁশি বাজাই, হাতে ধইরা টাইনা আনি। এর পরও মানুষ ঠিক হয় না। উল্টা অনেক সময় মাইর খাইছি।’ মালিবাগ লেভেলক্রসিংয়ে গিয়ে দেখা যায় প্রায় একই চিত্র। ট্রেন একেবারে কাছে চলে আসার পরও মানুষ পার হচ্ছে। রেললাইনের ওপর রিকশাচালকরা যাত্রীর জন্য অপেক্ষা করছে; কিন্তু কেউ বাধা দিচ্ছে না। এমন অবস্থা রাজধানীর শেওড়া বাজার, আশকোনা, মগবাজার, এফডিসি মোড়, তেজগাঁও, মহাখালী, বনানী লেভেলক্রসিংয়েও।

ঢাকা রেলওয়ে থানার (কমলাপুর) ওসি রকিব কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মাদকাসক্ত, মানসিক প্রতিবন্ধীরা বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন।’

জানা যায়, রাজধানীসহ আশপাশের ৩৫ কিলোমিটার রেলপথে ৫৮টি লেভেলক্রসিংয়ের মধ্যে ২৩টি অনুমোদনহীন ও অরক্ষিত। অনেক জায়গায় স্থানীয় লোকজন নিজেরাই সহজ চলাচলের জন্য রেললাইনের ওপর অর্ধশত ক্রসিং বানিয়েছে। রেললাইনে দুর্ঘটনার এটি অন্যতম একটি কারণ। রেলওয়ে পুলিশের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, ‘রেললাইনের পাশে বস্তি, বাজার, ইটের ব্যবসাসহ আরো কত কি চলছে। এগুলো সরানোর নাম নেই। ব্যবস্থাপনা যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী না করতে পারি, তবে কিছুই বদল হবে না। তাই এসব বিষয়ে নজরদারি বাড়াতে হবে।’

মৃত্যুর কারণ : রেললাইনে দুর্ঘটনার জন্য বেশ কিছু কারণের কথা বলছে কর্তৃপক্ষ। এসবের মধ্যে রয়েছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা দিয়ে ট্রেন চলাচলের সময় ট্রেনের হুইসেল শুনতে না পাওয়া, দ্রুত লেভেলক্রসিং পার হওয়ার চেষ্টা, রেললাইনে বসে থাকা ও চলাচল, রেললাইনে ছবি তুলতে চাওয়া, মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন দিয়ে হাঁটা, হেডফোনে গান শুনতে শুনতে চলা, মাদক সেবন করে রেললাইনে চলা, ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ, আঁকাবাঁকা পথে ট্রেন দেখতে না পাওয়া, অসতর্কতাবশত হাঁটতে গিয়ে স্লিপারে পা পিছলে পড়া ইত্যাদি। ২০১৭ সাল পর্যন্ত ঢাকার রেললাইনে মোট মৃত্যুর ৫ শতাংশ আত্মহত্যা বলে রেলওয়ে পুলিশের তদন্তে প্রমাণিত হয়। আরো ১০ শতাংশ অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যায়। আর ৮০ শতাংশ মৃত্যু মূলত অসতর্কতার কারণেই ঘটে। বাকি ৫ শতাংশ হত্যা ও অন্যান্য কারণে। গত ২২ মার্চ টাঙ্গাইল সদর উপজেলার হাতিলা মধ্যপাড়ায় মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন দিয়ে হাঁটছিলেন জেসমিন নাহার আছমা (২৭)। ট্রেন আসার শব্দ ও কম্পনও তাঁকে মোবাইল ফোনে মগ্নতা থেকে নিবৃত্ত করতে পারেনি। মারা যান তিনি।

বাংলাদেশ মোবাইল ফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দীন আহমদ বলেন, ‘মোবাইল অপারেটররা একসময় এমন সব বিজ্ঞাপন প্রকাশ করে যে তাতে গ্রাহকদের মধ্যে বিপজ্জনক জায়গায় সেলফি তোলার প্রবণতা বাড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এর বিরুদ্ধে আমরা প্রতিবাদ জানিয়েছিলাম। মোবাইল ফোন ব্যবহার করার সময় কারো মৃত্যু হলে তার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট মোবাইল ফোন অপারেটরদেরই নেওয়া উচিত। গ্রাহকদের মধ্যে এ বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির দায়িত্ব তারা অস্বীকার করতে পারে না। এ ছাড়া অপারেটরদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিটিআরসি যে সামাজিক দায়বদ্ধতা তহবিল গঠন করেছে, সে তহবিলের টাকাও গ্রাহক সচেতনতা বাড়ানোর কাজে ব্যয় করা যেতে পারে।’

সুত্র:কালের কন্ঠ, ২ মার্চ, ২০২০

About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।