রেলগেটে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা

রেলগেটে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে ঘটছে প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা

শামীম রাহমান : ঘটনাটি গত ১৩ আগস্টের। ২৬ টন এলপিজি বহন করা একটি ট্রাকের ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যায় গাজীপুরের পুবাইল রেলগেট বা রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংয়ে। কাছাকাছি এলাকায় সে সময় কোনো ট্রেন না চলায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যায় ট্রাকটি। এলপিজিবাহী ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষ হলে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হতে পারত ট্রেনেরও। সম্প্রতি রেল ভবনে অনুষ্ঠিত ট্রেন দুর্ঘটনা প্রতিরোধকল্পে গৃহীত ব্যবস্থাসংক্রান্ত সভায় এ ঘটনা উল্লেখ করেন গভর্নমেন্ট রেলওয়ে পুলিশের (জিআরপি) ঢাকার পুলিশ সুপার। তিনি বলেন, সেদিন বড় কোনো দুর্ঘটনা না হলেও সড়কে বাংলাদেশ রেলওয়ের লেভেল ক্রসিংগুলোর উচ্চতা বেশি হওয়ার কারণে প্রায়ই প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের গত সাত বছরের দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানেও একই ধরনের চিত্র উঠে এসেছে। রেলওয়ের হিসাবে ২০১৪ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২১ সালের জুলাই পর্যন্ত ১ হাজার ১৫৮টি দুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় ১৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ১৪৫ জনেরই মৃত্যু হয়েছে রেলগেটে সংঘটিত দুর্ঘটনায়। রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পারাপার হওয়ার সময় রেলগেটের ওপর গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে বেশকিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে এ সাত বছরে। এজন্য তারা দায় দিয়েছেন সড়কের ওপর দিয়ে যাওয়া রেললাইনের বাড়তি উচ্চতাকে।

নিয়ম অনুযায়ী, কোনো সড়কের ওপর দিয়ে রেলপথ গেলে সেই রেলপথের উচ্চতা সড়কের সমান রাখতে হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, নিয়ম থাকলেও এটা আমাদের দেশে মানার প্রবণতা একেবারেই কম। কোনো ধরনের আদর্শ নকশা না করে ও কোনো ধরনের পরিকল্পনা ছাড়াই বেশির ভাগ লেভেল ক্রসিং তৈরি করা হয়েছে। স্বভাবতই ভুল নকশা আর ভুল পরিকল্পনায় নির্মাণ করা এসব লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনাও ঘটছে বেশি।

সড়কের চেয়ে সড়কের ওপর দিয়ে যাওয়া রেলপথের উচ্চতা বেশি হলে তা কীভাবে দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি করে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সমস্যাটি বেশি হয় ভারী যানবাহন লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার সময়। ভারী গাড়ির ভর বেশি থাকায় সেগুলো উঁচু লেভেল ক্রসিং পারাপারের সময় প্রচণ্ড ঝাঁকুনি খায়। এ ঝাঁকুনির কারণে গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আবার আশপাশে কোনো ট্রেন থাকলে গাড়িচালকের মানসিকতায়ও একটা বিরূপ প্রভাব ফেলে। তখন বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে চলাচল করা ভারী যানবাহনগুলো ঠিকমতো রক্ষণাবেক্ষণ না হওয়াও এ ধরনের দুর্ঘটনার একটি বড় কারণ। সামগ্রিকভাবে লেভেল ক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা এড়াতে সড়কের উচ্চতার সঙ্গে রেলপথের উচ্চতা সমান করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিটি লেভেল ক্রসিং নির্মাণের আগে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে এবং সঠিক পরিকল্পনা ও নকশায় সেগুলো নির্মাণ করতে হবে। লেভেল ক্রসিং এলাকায় সড়কের পিচ ঢালাইয়ে বিটুমিনের বদলে কংক্রিট ব্যবহার করা উচিত।

শুধু লেভেল ক্রসিংয়ের বাড়তি উচ্চতাই নয়, বিপুলসংখ্যক রেল ক্রসিং অবৈধভাবে গড়ে তোলার ফলেও দুর্ঘটনা বেশি হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বাংলাদেশ রেলওয়ের দুই জোনে (পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চল) বৈধ লেভেল ক্রসিং আছে ১ হাজার ৪১২টি। এর মধ্যে গেটকিপার আছে মাত্র ৪৪৮টিতে। বাকিগুলোয় ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছে যানবাহন। বৈধ, কিন্তু গেটকিপার নেই এমন লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা পশ্চিমাঞ্চল (রাজশাহী) রেলওয়েতে বেশি। ৯৭৮টি বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে পশ্চিমাঞ্চলে গেটকিপার আছে মাত্র ২২১টিতে। অন্যদিকে পূর্বাঞ্চলে (চট্টগ্রাম) ৪৩৪টির মধ্যে গেটকিপার আছে ২৪৫টি লেভেল ক্রসিংয়ে।

প্রায় দেড় হাজার বৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের পাশাপাশি সারা দেশে অবৈধ লেভেল ক্রসিংয়ের সংখ্যা ১ হাজার ৮৫। এর কোনোটিতেই গেটকিপারের বন্দোবস্ত নেই। শুধু পারাপারের পথে ঝুঁকিপূর্ণ লেভেল ক্রসিং লেখা সাইনবোর্ড দিয়ে দায় সেরেছে রেলওয়ে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ভূসম্পত্তি শাখার তথ্য বলছে, রেলপথে সবচেয়ে বেশি অবৈধ লেভেল ক্রসিং বানিয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। সারা দেশে ৪৫২টি অবৈধ লেভেল ক্রসিং আছে তাদের। অর্থাৎ এসব লেভেল ক্রসিং বাংলাদেশ রেলওয়ে অনুমোদিত নয়। একইভাবে ইউনিয়ন পরিষদের ৩৬৩, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের ১১, পৌরসভার ৭৯, সিটি করপোরেশনের ৩৪, জেলা পরিষদের ১৩, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের তিন, বেনাপোল স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের এক, জয়পুরহাট চিনিকলের এক, ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠানের তিন ও অন্যান্য রয়েছে ৯২টি। এছাড়া ৩৩টি লেভেল ক্রসিং রয়েছে যেগুলোর মালিকানাই জানতে পারেনি রেলওয়ে। অবৈধ লেভেল ক্রসিংগুলোর সিংগভাগই গড়ে উঠেছে পূর্বাঞ্চলে। এ অঞ্চলে অবৈধ ক্রসিংয়ের সংখ্যা ৮১১।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, লেভেল ক্রসিংগুলোর বাড়তি উচ্চতা, বিপুলসংখ্যক অবৈধ লেভেল ক্রসিং গড়ে তোলা ও এগুলো পরিচালনায় পর্যাপ্ত জনবলের অভাবে রেলগেটে দুর্ঘটনা ঘটছে বেশি।

বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে সারা দেশে লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে অন্য যানবাহনের দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৩১টি। এসব দুর্ঘটনায় ১৪৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর বাইরে একই সময়ে সিগন্যাল অমান্যের জন্য দুর্ঘটনা ঘটেছে ৪০টি, যেগুলোতে মৃত্যু হয়েছে ১৬ জনের। সবচেয়ে বেশি ঘটেছে লাইনচ্যুতির ঘটনা। সাত বছরে ৮৫৬টি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে। এসব দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে নয়জনের। সব মিলিয়ে এ সময়ে ট্রেন দুর্ঘটনায় ১৭৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।

তবে রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজনের দাবি, ট্রেন দুর্ঘটনা আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। ভবিষ্যতে ট্রেন দুর্ঘটনা শূন্যে নামিয়ে আনতে পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য রেলওয়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানান তিনি।

অন্যদিকে বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে ভিন্ন কথা। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে শুধু ২০২০ সালেই ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে ১৪২টি। মৃত্যু হয়েছে ১৫৮ জনের। এর মধ্যে ট্রেনের ধাক্কায় মারা গেছে ১১৮ পথচারী। অন্য যানবাহনের সঙ্গে ঘটা ২০টি সংঘর্ষে ৩৮ জনের মৃত্যু হয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ট্রেন দুর্ঘটনা আগের চেয়ে বাড়ছে বলেও জানিয়েছে এ ইনস্টিটিউট।

ট্রেন দুর্ঘটনার বিষয়ে সামগ্রিকভাবে রেলপথমন্ত্রী জানিয়েছেন, ট্রেন দুর্ঘটনার দায়দায়িত্ব নির্ধারণ, রেলের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ, প্রদেয় ক্ষতিপূরণ, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। এসবের পাশাপাশি দুর্ঘটনা রোধে ট্রেন পরিচালনার দায়িত্বে থাকা কর্মীদের সর্বোচ্চ সচেতনতা অবলম্বনের পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

সূত্র:বণিক বার্তা, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২১


About the Author

RailNewsBD
রেল নিউজ বিডি (Rail News BD) বাংলাদেশের রেলের উপর একটি তথ্য ও সংবাদ ভিত্তিক ওয়েব পোর্টাল।