লোকোমোটিভ কমিশনিং

কোরীয় ১০ ইঞ্জিন বহরে যুক্ত করতে উদ্যোগ রেলওয়ের

সুজিত সাহা দক্ষিণ কোরিয়া থেকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে দেশে পৌঁছে ১০টি মিটার গেজ লোকোমোটিভ। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী না হওয়ায় এসব লোকোমোটিভ কমিশনিং না করে ফেলে রাখা হয়। সরবরাহকারী ও প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সৃষ্ট জটিলতা নিরসনের মাধ্যমে রেলওয়ে এসব ইঞ্জিন গ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমদানির প্রথম সপ্তাহে পরীক্ষামূলক চালানোর (ট্রায়াল রান) আট মাস পর দ্বিতীয় দফায় ইঞ্জিনগুলোর ট্রায়াল রান আবার শুরু করেছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। জানা গেছে, আমদানি হওয়া লোকোমোটিভের ৩০০১ নম্বর ইঞ্জিনটি পরীক্ষামূলকভাবে ৬০১ নং ট্রেন অর্থাৎ চট্টগ্রাম বন্দরের সিজিপিওয়াই ইয়ার্ড থেকে কনটেইনার নিয়ে কমলাপুর আইসিডিতে গেছে। ধারাবাহিকভাবে নয়টি ইঞ্জিনও কনটেইনারবাহী ট্রেনে ট্রায়াল রান সম্পন্ন করবে রেলওয়ে। এ পরীক্ষায় চালক ও গার্ড প্রধানত সাতটি সুনির্দিষ্ট ত্রুটি-বিচ্যুতি কিংবা এর বাইরে অন্য কোনো সমস্যা পাওয়া গেলে তা শনাক্ত করবেন। তবে কোনো ত্রুটি পাওয়া না গেলে রিপোর্ট অনুযায়ী গভর্নমেন্ট ইন্সপেকশন অব বাংলাদেশ রেলওয়ের (জিআইবিআর) মাধ্যমে কমিশনিং শেষে রেলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের কাছে এসব ইঞ্জিন সরবরাহ করা হবে। আমদানির পর ৩ সেপ্টেম্বর থেকে এসব ইঞ্জিনের ট্রায়াল রান হয়ে যায়। ওই ট্রায়ালগুলো সন্তোষজনক হলেও অল্টারনেটরে সামান্য বিচ্যুতি পাওয়া যায়। কিন্তু বিড ডকুমেন্ট অনুযায়ী ২২০০ হর্স পাওয়ারের অল্টারনেটর সরবরাহ না করায় এসব ইঞ্জিন গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন রেলওয়ের নিযুক্ত তত্কালীন প্রকল্প পরিচালক মো. নূর আহম্মদ। এ কারণে গত ১ এপ্রিল নূর আহম্মদকে বদলি করে প্রকল্প পরিচালক নিয়োগ দেয়া হয় মো. হাসান মনসুরকে। নতুন পিডি নিয়োগের পর প্রায় আট মাস বসিয়ে রাখা ইঞ্জিনগুলো রেলের বহরে যুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ করে রেলওয়ে। ২০২০ সালের ৮ ডিসেম্বর প্রজেক্ট ইমপ্লিমেন্টেশন কমিটির (পিআইসি) তৃতীয় সভায় কোরিয়া থেকে আমদানি হওয়া ইঞ্জিনগুলোর বিষয়ে বিশদ আলোচনা হয়। ওই বৈঠকে ইঞ্জিনগুলো বিড ডকুমেন্ট অনুযায়ী হয়নি বলে দাবি করেন তত্কালীন পিডি নূর আহম্মদ। বৈঠকে পিডি উল্লেখ করেন, ‘আমদানি হওয়া ইঞ্জিনগুলো মিটার গেজ থেকে ব্রড গেজে রূপান্তরযোগ্য। যার কারণে ইঞ্জিন, অল্টারনেটর ও ট্রাকশন মোটর মিটার গেজ অপেক্ষা শক্তিশালী। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান লোকোমোটিভের অল্টারনেটর চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহ করেননি এবং এটা বড় ধরনের কোনো সমস্যা না হলেও ইঞ্জিন হর্স পাওয়ার ২০০০ এবং অল্টারনেটরও ২০০০ হর্স পাওয়ার দেয়া হয়েছে। বিড ডকুমেন্ট অনুযায়ী ২০ শতাংশ এক্সট্রা জেনারেটর পাওয়ার সম্পন্ন অল্টারনেটরের কথা উল্লেখ রয়েছে। এটি থাকলে লোকোমোটিভ দ্রুত স্পিডআপ হয়। কভিড-১৯ পরিস্থিতির কারণে ইঞ্জিন উৎপাদনের সময় রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট অফিসাররা কোরিয়ায় ট্রেনিং ও স্টাডি ট্যুরে যেতে না পারায় চুক্তির শর্ত অনুযায়ী উৎপাদন না হওয়া সত্ত্বেও এসব ইঞ্জিন সরবরাহ হয়েছে বলে জানান প্রকল্প পরিচালক। এ কারণে আমদানি হওয়া ইঞ্জিনে দেয়া যন্ত্রাংশ চুক্তি অনুযায়ী না হওয়ায় ইঞ্জিনগুলো গ্রহণ ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বকেয়া পেমেন্ট দিতে পারছে না বলে দাবি করেন তিনি। একই বছরের ১৩ অক্টোবর মাসিক উন্নয়ন সভায় বিষয়টি সমাধানের জন্য রেলপথমন্ত্রী একটি কমিটি গঠন করেন। যদিও কমিটির প্রতিবেদন প্রদানের পর রেলওয়ে চুক্তি অনুযায়ী সরবরাহকৃত ইঞ্জিনের দায়দায়িত্ব নির্ধারণ সাপেক্ষে ট্রায়াল রান ও কমিশনিংয়ের উদ্যোগ নিয়েছে রেলওয়ে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হুন্দাই রোটেম শর্ত অনুযায়ী সরবরাহ না করার পরিপ্রেক্ষিতে আমদানির পর প্রায় আট মাস বসিয়ে রাখা হয় ১০টি ইঞ্জিন। বর্তমানে শর্ত অনুযায়ী সরবরাহ না করায় রেলের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে সে অনুযায়ী উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানকে পেমেন্ট দেবে রেলওয়ে। প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, ২০১৮ সালের ১৭ মে ১০টি মিটার গেজ লোকোমোটিভ সরবরাহে দক্ষিণ কোরিয়ার হুন্দাই রোটেম কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি করে রেলপথ মন্ত্রণালয়। এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ২৯৭ কোটি ৬৩ লাখ ৩০ হাজার ৫৬০ টাকা ব্যয়ে ক্রয় করা ইঞ্জিনগুলো চুক্তির ২৪ মাসের মধ্যে সরবরাহ করার কথা ছিল। তবে বিশ্বব্যাপী চলমান কভিড-১৯-এর কারণে নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছুটা বেশি সময় লাগে বাংলাদেশে পৌঁছাতে। দক্ষিণ কোরিয়ার একই প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেনা নয়টি ইঞ্জিন ২০১১ সালে রেলের বহরে যুক্ত হয়। ২১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ক্রয় করা ইঞ্জিনের প্রথম চারটির চালান বাংলাদেশে আসে ২০১১ সালের ২ আগস্ট। এরপর একই বছরের অক্টোবরে বাকি পাঁচটি ইঞ্জিন বাংলাদেশে আসে। জানতে চাইলে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান শর্ত অনুযায়ী সরবরাহ করেনি বলে মাসের পর মাস আমদানি হওয়া ইঞ্জিন বসিয়ে রাখা রেলের ক্ষতি সবচেয়ে বেশি। শর্ত ভঙ্গ করলে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে হিসাব করে পেমেন্ট কর্তন করা হবে। এজন্য নতুন করে ট্রায়াল রান করিয়ে ইঞ্জিনগুলো রেলের বহরে যুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। আশা করি শিগগিরই এসব ইঞ্জিন রেলের যান্ত্রিক প্রকৌশল বিভাগের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হবে। সূত্র:বণিক বার্তা, মে ০১, ২০২১