রেলওয়ের হাসপাতাল

৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে ইউনাইটেড গ্রুপ

সুজিত সাহা : পতিত ও অব্যবহৃত জমি বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবহারের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এর অংশ হিসেবে চট্টগ্রামে রেলের জমিতে বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণ করবে সংস্থাটি। সরকারি বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) এ প্রকল্পে প্রায় ৪০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে ইউনাইটেড গ্রুপের প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ কোম্পানি লিমিটেড। এরই মধ্যে অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রকল্পটি অনুমোদন পেয়েছে। শিগগিরই চুক্তি সম্পাদন শেষে হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। ২০১২ সালের দিকে অব্যবহৃত নিজস্ব জমিতে হাসপাতালসহ বাণিজ্যিক কার্যক্রমে বিনিয়োগের পরিকল্পনা করে রেলওয়ে। এর পর পরই রেলের জমিতে ৫০০ শয্যার হাসপাতাল ও ১০০ সিটের মেডিকেল কলেজ নির্মাণে বেসরকারি অংশীদার নির্বাচনের কার্যক্রম হাতে নেয়া হয়। ২০১৩ সালের ১৪ আগস্ট অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির (সিসিইএ) সভায় প্রকল্পটি পিপিপিতে বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে রেলের প্রস্তাবে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান থেকে ‘এস্টাবলিশমেন্ট অব আ ৫০০ বেড মাল্টিস্পেশালিটি হসপিটাল অ্যান্ড আ ১০০ সিট মেডিকেল কলেজ অন বাংলাদেশ রেলওয়ে সিট অ্যাট চিটাগং’ শিরোনামে দরপত্র দলিল প্রস্তুত করা হয়। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এ প্রকল্প নির্মাণের সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৯৮ দশমিক ৩৮ কোটি টাকা। প্রকল্পের অধীনে ২০১৭ সালের ২০ ডিসেম্বর রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) এক ধাপ পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে। নির্ধারিত সময়ে ৩২টি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পের ডাটারুমে রেজিস্ট্রেশন করে। দরপত্র খোলার তারিখ ছিল ১৫ মে ২০১৮। তবে দরপত্র দাখিলের শেষ সময়সীমার মধ্যে তিনটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র দাখিল করে। দুটি প্রতিষ্ঠান দরপত্র দলিলের শর্ত পরিপালন করতে না পারায় নন-রেসপনসিভ বিবেচিত হয়। অন্য দরদাতা প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড দরপত্রের সব কারিগরি শর্ত পরিপালন করায় রেসপনসিভ বিবেচিত হয়। দরপত্রের ফিন্যান্সিয়াল বিড উন্মুক্ত করা হয় ২০১৮ সালের ১৭ জুলাই, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির অনুমোদন পাওয়া যায় একই বছরের ১৪ আগস্ট। এরপর ২০১৮ সালের ১০ ডিসেম্বর খসড়া চুক্তিপত্র অনুমোদন করে আইন মন্ত্রণালয়। ২০১৯ সালের ২৪ জুলাই সিসিইএর বৈঠকে পিপিপি প্রকল্পটি পুনরায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি পিপিপি চুক্তিপত্র সিসিইএ কমিটিতে দ্বিতীয়বারের মতো পাঠানো হয়। গত ২৮ জানুয়ারি সিসিইএ কমিটির বৈঠকের পর ১৩ ফেব্রুয়ারি পিপিপি প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়, যা সর্বশেষ ২৩ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী চূড়ান্ত অনুমোদন দেন। রেলওয়ের প্রকৌশল দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা গেছে, প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ১২ বছর (নিয়োগের তারিখ থেকে)। চুক্তির সময়কাল ধরা হয়েছে ৫০ বছর (নির্মাণকালসহ)। চুক্তি অনুযায়ী, বেসরকারি অংশীদার বা ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ চুক্তির সময়কালে অবকাঠামোর ডিজাইন, নির্মাণ, অর্থায়ন ও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। চুক্তির মেয়াদ শেষে পূর্ণাঙ্গ চালু ও ভালো অবস্থায় সামগ্রিক অবকাঠামো সরকারি অংশীদার বা বাংলাদেশ রেলওয়েকে হস্তান্তর করবে। আর্থিক চুক্তি অনুযায়ী প্রাইভেট পার্টনার প্রজেক্ট ডেভেলপমেন্ট ফি হিসেবে পিপিপি কর্তৃপক্ষকে সাড়ে ৩ কোটি টাকা প্রদান করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পূর্বশর্ত হিসেবে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ বাংলাদেশ রেলওয়েকে ৫ কোটি টাকা প্রিমিয়াম হিসেবে প্রদান করবে। চুক্তি স্বাক্ষরের তিন বছর পূর্তিতে প্রথম বার্ষিক ফি হিসেবে ৭৫ লাখ টাকা, চতুর্থ বছর পূর্তিতে দ্বিতীয় বার্ষিক চুক্তি ফি ৭৫ লাখ টাকা, পঞ্চম বছর পূর্তিতে চুক্তি ফি দেড় কোটি টাকা বাংলাদেশ রেলওয়েকে প্রদান করবে। ষষ্ঠ বছরও একই পরিমাণ ফি প্রদান করবে। তবে এর পর থেকে প্রতি তিন বছর অন্তর চুক্তির মেয়াদকাল পর্যন্ত ১০ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাবে। প্রকল্পের নথি সূত্রে জানা গেছে, নির্মাণকালে প্রথম পর্যায়ের তিন বছরে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ কমপক্ষে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল নির্মাণ করবে। দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো ২৫০ শয্যার হাসপাতাল কার্যক্রম চালু করবে পরবর্তী অন্তত ২৪ মাসের মধ্যে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের ১০ বছরের মধ্যে বেসরকারি অংশীদার ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ ৫০ আসনের মেডিকেল কলেজ এবং চুক্তির নির্ধারিত ১২ বছরের মধ্যে আরো ৫০ আসনের মেডিকেল কলেজের কার্যক্রম শুরু করতে হবে। প্রকল্পের ছয় একর জমির মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ২ দশমিক ৪২ একর এবং দ্বিতীয় ধাপে ৩ দশমিক ৫৮ একর জমি ব্যবহার করবে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ। প্রকল্প পরিচালক ও রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (সেতু) মো. আহসান জাবির বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পিপিপি প্রকল্পের আওতায় রেলওয়ে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজের সঙ্গে সিআরবি এলাকায় একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থাপন করতে যাচ্ছে। এটি স্থাপন হলে রেল কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাড়াও এ অঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা খাত অনেক বেশি উন্নত হবে। প্রকল্পটি অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে অনুমোদন শেষে প্রধানমন্ত্রীও ইতিবাচক অনুমোদন দিয়েছেন। রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে এ বিষয়ে চিঠি এলেই ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজকে এ বিষয়ে জানিয়ে দেয়া হবে। এরপর বিভিন্ন শর্ত পালন সাপেক্ষে বেসরকারি অংশীদারী প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর হবে।’ জানা গেছে, প্রকল্প এলাকাসংশ্লিষ্ট রেলওয়ের একটি বক্ষব্যাধি হাসপাতাল রয়েছে। এ হাসপাতালে রেল কর্মীরা চিকিৎসাসেবা পেয়ে থাকেন। পিপিপি প্রকল্পের আওতায় চিকিৎসা খাতে নতুন বিনিয়োগ হলেও রেলের পুরনো বক্ষব্যাধি হাসপাতালটি চালু রাখা হবে। বরং রেলকর্মীদের তাত্ক্ষণিক চিকিৎসাসেবা কার্যক্রমের গতি বাড়াতে পুরনো এই হাসপাতালের কার্যক্রম আরো সম্প্রসারণ করা হবে। তবে সিআরবির নতুন এ হাসপাতালে রেলওয়ে কর্মীরা বিশেষ ছাড়ে চিকিৎসা সুবিধা নিতে পারবেন। পাশাপাশি মেডিকেল কলেজেও রেলওয়ে কর্মীদের সন্তানরা বিশেষ সুবিধায় পড়াশোনার সুযোগ পাবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে উপকারভোগী হিসেবে রেলওয়ে বিভিন্ন দিক বিবেচনায় এনেছে। অন্যান্য বাণিজ্যিক বিনিয়োগের চেয়েও চিকিৎসাসেবা খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ হওয়ায় রেলওয়ে বিশেষ আগ্রহ দেখিয়েছে এ প্রকল্পে। ৫০ বছর পর সম্পূর্ণ অবকাঠামোই রেলের অধীন হয়ে যাবে। এ সময়ের মধ্যে প্রকল্প নির্মাণ ব্যয়, ৫০ বছর ধরে মেরামত সংরক্ষণ ও পরিচালন ব্যয় হবে প্রায় ৯৮৪ দশমিক ৪২ কোটি টাকা। যা রেলের নিজস্ব তহবিল থেকে বাস্তবায়নের সুযোগ নেই। একটি বিশেষায়িত মানসম্মত হাসপাতাল নির্মাণ-পরবর্তী পরিচালন ব্যয়, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য ব্যয় বহন করা রেলের পক্ষে সম্ভব নয়। তাছাড়া রেলের এসব জমি বেদখলের পাশাপাশি নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে পরিবেশগত বিপর্যয়ও ডেকে আনা হচ্ছে। পিপিপি পদ্ধতিতে চিকিৎসাসেবা খাতে বিনিয়োগের ফলে এ অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবা খাতে গুণগত পরিবর্তন আসবে বলে মনে করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। বাংলাদেশ রেলওয়ের সারা দেশে মোট জমির পরিমাণ ৬১ হাজার ৮৬০ একর। এর মধ্যে প্রায় ৭ হাজার একর জমি বেদখলে রয়েছে। এছাড়া ১ হাজার ৮৪১ একর জমির হদিসই নেই রেলের কাছে। গত এক দশকে রেলের ১ হাজার ১৮৫ একর জমি উদ্ধার করা হলেও সেগুলো ফের বেদখলে চলে যায়। সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা জমি উদ্ধার ও রক্ষণাবেক্ষণে হিমশিম খাওয়া রেলওয়ে কয়েক বছর ধরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রমে উদ্যোগী হয়েছে। ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদে লিজ প্রদানের পরিবর্তে পিপিপি ভিত্তিতে বিনিয়োগের মাধ্যমে রাজস্ব আয় বাড়ানো ছাড়াও বেদখল ভূমি রক্ষার চেষ্টা করছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ অ্যান্ড কোম্পানির মহাব্যবস্থাপক কায়েস খলিল খান (করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পিপিপিতে রেলকে সঙ্গে নিয়ে নির্মিতব্য হাসপাতালটি হবে টারশিয়ারি লেভেল হাসপাতাল। বিশ্বের স্বনামধন্য হাসপাতালগুলো এই লেভেলে নির্মাণ ও পরিচালনাধীন। চট্টগ্রামের মানুষ হূদরোগের এনজিওগ্রাম করতে যেখানে বিদেশমুখী, সেখানে নতুন এ হাসপাতাল মানুষকে চট্টগ্রামেই বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা দেবে।’ অংশীদার হিসেবে রেলওয়ের কর্মীরা ২০ শতাংশ কম অর্থ ব্যয় করে চিকিৎসাসেবা নিতে পারবেন। পিপিপি প্রকল্পের এ উদ্যোগ দেশের বিনিয়োগে নতুন যুগের সূচনা করবে বলে আশা করছেন তিনি। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট রেলের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বণিক বার্তাকে বলেন, এতদিন রেলওয়ে লিজ ছাড়াও দ্বিপক্ষীয় কিংবা ত্রিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে রেলের জমি রক্ষা ও রাজস্ব আয় বাড়াতে চেয়েছে। তবে অতীতের নানা জটিলতার কারণে পিপিপির মাধ্যমে বেসরকারি বিনিয়োগে যেতে চাইছে রেলওয়ে। একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সিআরবি এলাকায় হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ নির্মাণের চুক্তির দ্বারপ্রান্তে এসেছে রেলওয়ে। আর্থিক লাভ ছাড়াও পরিবেশ ও আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় পিপিপির মাধ্যমে বিনিয়োগে রেলওয়ের নতুন প্রকল্পটি একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। তবে চুক্তিতে রেলওয়ে ও সাধারণ মানুষের সেবা প্রদানের বিভিন্ন শর্ত সুনির্দিষ্টভাবে পরিপালন না হলে আর্থিকভাবে লাভবান হলেও হাসপাতাল নির্মাণ প্রকল্পটি প্রশ্নের মুখে পড়বে বলে মনে করছেন তারা। রেলের প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে অনুমোদন এলেও রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে চিঠি প্রাপ্তির পর বেসরকারি অংশীদার কোম্পানিকে লেটার অব অ্যাওয়ার্ড (এলওএ) দেয়া হবে। এরপর শর্ত অনুযায়ী অর্থ জমা দেয়ার পর দুই পক্ষের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হবে। চুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রকল্প এলাকার জমি বুঝিয়ে দেয়া হলে ইউনাইটেড এন্টারপ্রাইজ প্রকল্পের কাজ শুরু করতে পারবে। চলতি বছরের মধ্যেই হাসপাতাল নির্মাণের প্রথম পর্যায়ের কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন তারা। সুত্র:বণিক বার্তা, মার্চ ০২, ২০২০