দোহাজারী-রামু

মেয়াদের মধ্যে শেষ হচ্ছে না নির্মাণকাজ

নিউজ ডেস্ক: চট্টগ্রামের দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার ও রামু থেকে মিয়ানমারের কাছে ঘুমধুম পর্যন্ত নতুন রেলপথ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পটির মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। আগামী বছরের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ। তবে গত এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন অগ্রগতি ৫৯ শতাংশ। এক বছরের মধ্যে অবশিষ্ট ৪১ শতাংশ কাজ শেষ করা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। চলমান করোনা মহামারী ও বর্ষার কারণে মেয়াদের মধ্যে বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্পের কর্মকর্তারা। এদিকে নির্মাণকাজের অগ্রগতি অর্ধেকের বেশি হলেও এখনো প্রকল্পের জন্য অধিগ্রহণ করা জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কাজটি শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন। এজন্য কিছু জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিরা ঠিকাদারকে ভৌতকাজে বাধা দিচ্ছে বলে জানিয়েছে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ। গতকাল রেল ভবনে অনুষ্ঠিত প্রকল্পটির ওপর ‘প্রজেক্ট স্টিয়ারিং কমিটি’র সভায় বিষয়টি তুলে ধরা হয়। বিষয়টিকে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেছেন প্রকল্পের কর্মকর্তারা। সরকারের ফার্স্ট ট্র্যাকভুক্ত অন্যতম প্রকল্প দোহাজারী-রামু-কক্সবাজার ও রামু-ঘুমধুম রেলপথ নির্মাণ। ২০১৮ সালের জুলাইয়ে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপ (সিআরইসি), চায়না সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন করপোরেশন (সিসিইসিসি), বাংলাদেশের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড এবং ম্যাক্স ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। বর্তমানে দোহাজারী থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত রেলপথটির কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। কাজটি করা হচ্ছে দুটি লটে। একটি লটে পড়েছে দোহাজারী-চকরিয়া অংশ, অন্যটিতে রয়েছে চকরিয়া-কক্সবাজার অংশ। গতকালের সভায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে বেশকিছু চ্যালেঞ্জের বিষয় তুলে ধরা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কারণে সৃষ্ট জটিলতার পাশাপাশি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি), বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (বিআরইবি) উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিদ্যুতের পোল/টাওয়ার এখনো অপসারণ না হওয়া, প্রকল্প এলাকায় থাকা বিভিন্ন স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার জমি হস্তান্তরে দেরি হওয়ায় নির্মাণকাজ বিঘ্নিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে কর্মকর্তারা। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, প্রকল্পের অ্যালাইনমেন্টে বিদ্যুতের খুঁটি থাকার কারণে কাজের গতি বিঘ্নিত হচ্ছে, ধারাবাহিকতা বজায় রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ছে। প্রকল্প কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রথম পর্যায়ে দোহাজারী থেকে রামু পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি লুপ ও সাইডিং লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে ৩৯ কিলোমিটার। ৩৯টি মেজর ব্রিজ, ২২৩টি মাইনর ব্রিজ ও কালভার্ট, ৯৬টি লেভেল ক্রসিং, হাতি চলাচলের জন্য আন্ডারপাস ও ওভারপাস এবং নয়টি স্টেশন নির্মাণ করা হচ্ছে। অন্যদিকে দ্বিতীয় ধাপে নির্মাণ করা হবে রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত আরো ২৯ কিলোমিটার রেলপথ। চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত প্রকল্পের প্রথম পর্যায়ের সার্বিক কাজের অগ্রগতি হয়েছে ৫৯ শতাংশ। আগামী বছরের জুনে প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হবে। এ হিসেবে মেয়াদের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে হলে মাত্র এক বছরের মধ্যে সব কাজ শেষ করতে হবে, যা বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের কারণে এরই মধ্যে কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। নির্ধারিত মেয়াদের মধ্যে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথ নির্মাণের কাজ সম্ভব হবে কিনা, এমন প্রশ্নে প্রকল্পটির প্রকল্প পরিচালক মফিজুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, রেলপথটির নির্মাণকাজ শুরু করার জন্য আমাদের জমি বুঝিয়ে দেয়া হয় ২০১৯ সালের দিকে। কাজ শুরু করতে না করতেই পরের বছর চলে আসে করোনা মহামারী। করোনার কারণে গত বছরের ২৬ মার্চের পর থেকে দীর্ঘ সময় নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল। বর্তমানে সব রকম স্বাস্থ্যবিধি মেনে কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। তবে সামনে বর্ষাকাল নিয়ে আমরা কিছুটা চিন্তিত। বর্ষার কারণে হয়তো কাজের গতি কমে আসবে। তবে ২০২২ সালের জুনে না হলেও ডিসেম্বরের মধ্যেই রেলপথটি ট্রেন চলাচলের উপযোগী করে গড়ে তোলা সম্ভব হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। প্রসঙ্গত, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে নির্মাণ করা হচ্ছে ডুয়াল গেজ সিঙ্গেল লাইনের এ রেলপথ। ব্যয় হচ্ছে ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে এডিবির ঋণ ১৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। বাকি ৪ হাজার ৯১৯ কোটি টাকা জোগান দিচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পটির অন্যতম উদ্দেশ্য ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে করিডোরের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ স্থাপন। পাশাপাশি পর্যটন শহর কক্সবাজারকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কে আনা, পর্যটক ও স্থানীয় জনগণের জন্য নিরাপদ, আরামদায়ক, সাশ্রয়ী ও পরিবেশবান্ধব যোগাযোগ ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং সহজে ও কম খরচে মাছ, লবণ, রাবারের কাঁচামাল এবং বনজ ও কৃষিজ দ্রব্যাদি পরিবহন দোহাজারী থেকে কক্সবাজার ও রামু থেকে ঘুমধুম পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন রেলওয়ে কর্মকর্তারা। সূত্র:বণিক বার্তা, ৩ জুন ২০২১