কনটেইনার

আইসিডির অভাবে গতি পাচ্ছে না কার্যক্রম

সুজিত সাহা : রেলপথে ভারত থেকে কনটেইনারের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন কার্যক্রম শুরু হয় গত বছরের জুলাইয়ে। শুরুতে স্লাইডিং ডোর (পার্শ্ব-দরজাবিশিষ্ট) কনটেইনারে পণ্য পরিবহনের অনুমতি নিয়ে জটিলতায় পড়তে হয় ব্যবসায়ী ও রেলওয়ে কর্তৃপক্ষকে। পরবর্তী সময়ে করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেলওয়েকে স্লাইডিং ডোর সুবিধা দেয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। কনটেইনারে পণ্য পরিবহনে অবকাঠামোগত সুবিধা তৈরিতে সিরাজগঞ্জে ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো (আইসিডি) নির্মাণের পরিকল্পনা নেয়া হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। যদিও সীমান্তবর্তী শুল্ক স্টেশনে পণ্য আনলোডিংয়ের কারণে বাড়তি বিড়ম্বনায় কাঙ্ক্ষিত গতি পাচ্ছে না রেলপথে ভারত-বাংলাদেশ কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল কার্যক্রম। রেলওয়ে সূত্র জানায়, গত জুলাইয়ে কার্যক্রম শুরুর পর প্রতি মাসে গড়ে চার-পাঁচটি কনটেইনারবাহী ট্রেন ভারত থেকে বাংলাদেশে পণ্য পরিবহন করে। স্লাইডিং ডোর সুবিধা সংবলিত এসব কনটেইনারে গার্মেন্টস সামগ্রী, কেমিক্যাল, সুতা, চাল, পোলট্রি ফিড, ধানবীজসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি হয়। তবে চাহিদা সত্ত্বেও সরাসরি ঢাকায় পণ্য পরিবহনের সুযোগ না থাকায় এ কার্যক্রম এখনো সীমিত আকারেই পরিচালিত হচ্ছে। তবে আইসিডি সুবিধা দেয়া হলে প্রতি মাসেই গড়ে ২৫ থেকে ৩০টি কনটেইনার ট্রেন সার্ভিস চালানো সম্ভব বলে মনে করছে সংস্থাটি। বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে ২০০৭ সালে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে কনটেইনার ট্রেন পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ২০১৮ সালের ৭-৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় অনুষ্ঠিত বাণিজ্য সচিব পর্যায়ে সভার অনুচ্ছেদ-১১ (৩) এ বেনাপোল/দর্শনা সেকশনে রেলযোগে কনটেইনার ট্রেন পরিচালনার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২০ সালের জুলাইয়ে ভারত থেকে কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল কার্যক্রম শুরু হয়। তবে পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধার অভাবে কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচল জনপ্রিয় হচ্ছে না ব্যবসায়ীদের কাছে। রেলওয়ে প্রতিদিন গড়ে একটি করে কনটেইনারবাহী ট্রেন পরিচালনার পরিকল্পনা করলেও বর্তমানে সেটি চার-পাঁচটিতে সীমাবদ্ধ রয়েছে। তাছাড়া করোনাকালে বিশেষ ব্যবস্থায় স্লাইডিং ডোর সুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে কনটেইনারে পণ্য আমদানি কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ারও শঙ্কা রয়েছে। রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, কার্যক্রম চালুর পর ব্যবসায়ীদের আগ্রহ ছিল কনটেইনারে পণ্য পরিবহন করে ঢাকাস্থ কমলাপুর আইসিডিতে পণ্য নিয়ে আসা। কিন্তু যমুনা সেতু দিয়ে কনটেইনারবাহী ট্রেন চলাচলে ভারতীয় রেলের আপত্তি থাকায় সেটি সম্ভব হচ্ছে না। আইসিডি সুবিধা না থাকায় বেনাপোল স্থলবন্দরেই পণ্যের কায়িক পরীক্ষা সম্পন্ন করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। যার কারণে ভারত থেকে কনটেইনারে পণ্য পরিবহনে নতুন জটিলতায় পড়তে হয় সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের। কার্যক্রম শুরুর পর ব্যবসায়ীদের শতভাগ সেবা প্রদান ও বাড়তি বিড়ম্বনা এড়াতে সিরাজগঞ্জে একটি আইসিডি নির্মাণের পরিকল্পনাও হাতে নেয় রেলওয়ে। তবে পরিকল্পনাটি প্রকল্প উন্নয়ন প্রস্তাবনা (ডিপিপি) তৈরির পর্যায়ে থাকায় ভারতের সঙ্গে কনটেইনারে পণ্য পরিবহন কার্যক্রম বৃদ্ধি সময়সাপেক্ষ বলে মনে করছে রেলওয়ে। জানতে চাইলে বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) সরদার শাহাদাত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, কনটেইনারবাহী ট্রেনের জন্য ভারত-বাংলাদেশ উভয় দেশের ব্যবসায়ীদের চাহিদা রয়েছে। তবে অবকাঠামোগত জটিলতায় এখনো সক্ষমতার শতভাগ কার্যক্রম শুরু করা যায়নি। তবে ভারতের আর্থিক সহায়তায় সিরাজগঞ্জ বাজারে একটি আইসিডি নির্মাণের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এটি বাস্তবায়ন হলে যাত্রীবাহী ট্রেনের মতো ভারত-বাংলাদেশ রেলপথে পণ্য পরিবহন কার্যক্রম আরো বেশি বেগবান হবে। রেলওয়ে সূত্রে জানা যায়, করোনাকালে সড়কপথে পণ্য পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০২০ সালের ৪ মে ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে রেলপথে পণ্য আনা-নেয়ার বিষয়ে বাংলাদেশস্থ ভারতীয় দূতাবাস, এনবিআর, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়েকে নিয়ে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে একটি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সব ধরনের পণ্য আপাতত রেলপথে আমদানির অনুরোধ জানানো হয়। এরপর রেলপথে পণ্য পরিবহনের জন্য গত বছরের ২০ মে রেলওয়ে এনবিআরকে একটি চিঠি দেয়। পরবর্তী সময়ে এনবিআর শর্তসাপেক্ষে স্লাইডিং ডোর কনটেইনারের মাধ্যমে শুধু কভিড-১৯ পরিস্থিতিতে কনটেইনারে পণ্য পরিবহনের অনুমতি দেয় ২০২০ সালের ৪ জুন। বর্তমানে আগের তুলনায় কনটেইনারে পণ্য পরিবহনের হার বাড়লেও সেটি পর্যাপ্ত নয় বলে মনে করছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (সিসিসিআই) সভাপতি মাহবুব আলম বণিক বার্তাকে বলেন, যেকোনো নতুন কার্যক্রম শুরু হলে শুরুতে বিভিন্ন জটিলতা থাকে। ভারত থেকে কনটেইনারে পণ্য পরিবহনের বিষয়টি এখনো নতুন। ব্যবসায়ীরা বেশ কিছুটা জটিলতায় পড়েছেন। বিষয়টি বাংলাদেশ রেলওয়েসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে অবহিত করা হয়েছে। কনটেইনারে পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে ল্যান্ডিং অবকাঠামোগত জটিলতা নিরসন করা গেলে পণ্য পরিবহনের সময়, ব্যয় উভয়ই কমে আসবে, যা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য যুগান্তকারী হবে বলে আশা করছেন তিনি। সূত্রমতে, নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হলে ভারতীয় বাংলাদেশস্থ দূতাবাসের সঙ্গে বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর বৈঠকে রেলপথে পণ্য পরিবহনের জন্য পর্যালোচনা সাপেক্ষে সুপারিশ প্রণয়নের জন্য বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) বেগম শরিফা খানকে সভাপতি করে বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সাত সদস্যের টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ২০২০ সালের ১৭ মে একটি প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারত-বাংলাদেশের মধ্যে এক সময় আটটি ইন্টারচেঞ্জ (ক্রস বর্ডার) থাকলেও বর্তমানে বেনাপোল-পেট্রাপোল, দর্শনা-গেদে, রহনপুর-সিঙ্গাবাদ ও বিরল-রাধিকাপুর দিয়ে আন্তঃদেশীয় মালামাল পরিবহন ও যাত্রী চলাচল হয়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড শুধু কভিড-১৯ কালে সাইডিং ডোর সুবিধার মাধ্যমে কনটেইনারে পণ্য পরিবহনের সুপারিশ করেছে। ফলে কভিড-১৯ প্যানডেমিক শেষে সাইডিং ডোর সুবিধা বন্ধ হয়ে গেলে রেলপথে কনটেইনারে পণ্য পরিবহন সুবিধা আরো সীমিত হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। রেলওয়ের পরিবহন বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলছেন, ভারত থেকে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা নানান বিড়ম্বনার শিকার হন। রেলপথে কনটেইনারের মাধ্যমে পণ্য আমদানি করলে খরচ কম হওয়ার পাশাপাশি দ্রুত সময়ে পণ্য সংগ্রহ করা যায়। সাইডিং ডোর সুবিধায় কনটেইনারে পণ্য আমদানির অনুমতি না থাকায় ভারত থেকে রেলপথে কনটেইনার ট্রেন চলাচল শুরু হয়নি। কভিডের কারণে বর্তমানে শুরু হলেও বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে পণ্য সংগ্রহ করে ব্যবসায়ীদের তা সারা দেশে নিয়ে যেতে হয়। এতে বাংলাদেশে পণ্য আসার পর ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন বিড়ম্বনা। ফলে দ্রুত সময়ের মধ্যে সিরাজগঞ্জ বাজার এলাকায় প্রস্তাবিত আইসিডি নির্মাণকাজ শুরু হলে ভারত-বাংলাদেশ আন্তঃদেশীয় কনটেইনার ট্রেন চলাচল কার্যক্রম গতি পাবে বলে মনে করছেন তিনি সূত্র:বণিক বার্তা, ফেব্রুয়ারি ০১, ২০২১